জাতীয়
দেশে দেশে নানান রঙের উৎসব
NewsView

আলম আলোক
উৎসব— শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আনন্দ, রঙিলা আয়োজন, নাচ-গান আর মানুষের মিলনমেলা। হাজার হাজার বছর আগে কৃষিনির্ভর সমাজে ফসল তোলা, ঋতুর পরিবর্তন কিংবা দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শুরু হয়েছিল উৎসবের প্রচলন। সময় গড়িয়েছে তার সঙ্গে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা উপলক্ষ যুক্ত হয়েছে। পৃথিবীর একেক প্রান্তে একেক রকম উৎসব সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে কিছু উৎসব এতটাই ব্যতিক্রমী- সেগুলো দেখলে অবাক হতে হয়।
আজকের প্রতিবেদন— বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে বিচিত্র আয়োজনের উৎসব নিয়ে।
কিউবা: সেন্ট লাজারুস শোভাযাত্রা
সেইন্ট লাজারুস প্রসেশন (Saint Lazarus Procession) বা সেন্ট লাজারুসের শোভাযাত্রা। এটি কিউবার অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে হাজার হাজার ভক্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান গির্জায়। কেউ খালি পায়ে হাঁটেন, কেউ মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যান। কারও শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়, তবুও থামে না যাত্রা। বিশ্বাস আর প্রার্থনার এই দৃশ্য যেন কষ্টের মধ্যেও আশার এক প্রতীক। এটি সেইন্ট লাজারুসকে সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, লাজারুস হচ্ছে বাইবেলে বর্ণিত সেই লাজারুস, যাকে যিশু খ্রিস্ট মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। পরে বিশ্বাস করা হয়, লাজারুস সাইপ্রাসে এসে বসবাস করেন এবং লারনাকার প্রথম বিশপ হন।

এই শোভাযাত্রা সাধারণত ইস্টারের আগে Lazarus Saturday তে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান শুরু হয় Church of Saint Lazarus–এ ধর্মীয় প্রার্থনার মাধ্যমে। এরপর সেন্ট লাজারুসের স্মারক, প্রতীক বা রেলিক শহরের রাস্তায় শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে ধর্মযাজক, স্থানীয় মানুষ, ব্যান্ড, স্কাউট দল এবং সরকারি প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং লারনাকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ এবং পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হিসেবে পরিচিত।
ফিনল্যান্ড: বউকে কাঁধে নিয়ে দৌাঁড়ানো
Wife Carrying World Championship (ফিনিশ ভাষায় Eukonkanto) হলো বিশ্বের অন্যতম অদ্ভুত ও মজার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, যেখানে একজন প্রতিযোগী তার সঙ্গীকে কাঁধে বা পিঠে বহন করে দুর্গম ট্র্যাক দ্রুততম সময়ে পার করার চেষ্টা করেন। এই বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ প্রতি বছর ফিনল্যান্ডের ছোট শহর Sonkajärvi তে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতাটি ১৯৯২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হচ্ছে।

এই প্রতিযোগিতার কোর্সটি প্রায় ২৫৩.৫ মিটার দীর্ঘ হয় এবং এতে থাকে বালুময় পথ, নানা রকম বাধা ও পানিভর্তি অংশ। প্রতিযোগীদের লক্ষ্য হলো সঙ্গীকে নিয়ে সবচেয়ে দ্রুত ফিনিশ লাইনে পৌঁছানো। জনপ্রিয় কৌশলগুলোর মধ্যে “Estonian carry” বিশেষভাবে পরিচিত, এতে বহনকারী ব্যক্তি সঙ্গীকে উল্টোভাবে কাঁধে ঝুলিয়ে দৌড়ান, ফলে ভারসাম্য ভালো থাকে।
নাম ওয়াইফ কেরিং চ্যাম্পিয়নশিপ হলেও বহন করার জন্য সঙ্গী কিন্তু যে কেউই হতে পারে।
এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে মজার দিক হলো এর পুরস্কার। বিজয়ী দল সাধারণত বহন করা সঙ্গীর ওজনের সমপরিমাণ বিয়ার পুরস্কার হিসেবে পায়।
এটি মূলত স্থানীয় ডাকাত নেতা “Robber Ronkainen”-এর কিংবদন্তি ও পুরোনো গ্রামীণ শক্তি-পরীক্ষার গল্প থেকে অনুপ্রাণিত। যদিও আজ এটি পুরোপুরি উৎসবধর্মী, খেলাধুলামূলক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
ইংল্যান্ড: পাহাড়ে গড়াগড়ি
নাম Cooper's Hill Cheese-Rolling and Wake । এটি ইংল্যান্ডের Gloucestershire অঞ্চলের Brockworth গ্রামের কাছে Cooper’s Hill পাহাড়ে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা একটি গড়ানো পনির (cheese) ধরতে পাহাড় বেয়ে নিচে দিকে দৌড়ে নামে আর সেই দৌড় প্রায়ই নিয়ন্ত্রণহীন গড়াগড়িতে পরিণত হয়! উৎসবটির লিখিত ইতিহাস অন্তত ১৮২৬ সাল পর্যন্ত পাওয়া যায়, যদিও অনেকে মনে করেন এর শিকড় আরও পুরোনো, সম্ভবত প্রাচীন কৃষিভিত্তিক বা লোকজ আচার থেকে এটি এসেছে।

এই প্রতিযোগিতায় প্রথমে প্রায় ৮/৯ পাউন্ড ওজনের একটি Double Gloucester cheese পাহাড়ের চূড়া থেকে গড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর প্রতিযোগীরা সেটির পেছনে দৌড়ায়। কিন্তু বাস্তবে পনিরটি এত দ্রুত গড়ায় যে কখনও তা প্রায় ঘণ্টায় ৭০ মাইল বেগেও ছুঁটতে পারে।ফলে এটিকে ধরা অসম্ভব, তাই যে ব্যক্তি সবার আগে পাহাড়ের নিচে পৌঁছায়, তাকেই বিজয়ী ধরা হয় এবং পুরস্কার হিসেবে সেই পনিরটি দেওয়া হয়।
পাহাড়টি অত্যন্ত খাড়া এবং প্রায় ১৮০ মিটার দীর্ঘ এর ঢাল। ফলে অংশগ্রহণকারীরা প্রায়ই পড়ে যায়, গড়াতে থাকে, আঘাত পায়, এমনকি চিকিৎসাকর্মীদের সহায়তাও লাগে। এ কারণেই এটিকে অনেকেই “বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক মজার উৎসব” বলে থাকেন। তবুও প্রতি বছর হাজারো দর্শক এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগী এতে অংশ নেয়।
অন্যদিকে ইতালির Battle of the Oranges উৎসবে দেখা যায় এক অভিনব যুদ্ধ। তবে অস্ত্র নয়—এখানে একে অপরের দিকে ছোড়া হয় কমলালেবু! এই উৎসবটি শুধু মজার ফলযুদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার প্রতীকী ইতিহাস। জনপ্রিয় লোককাহিনি অনুযায়ী, মধ্যযুগে এক অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে শহরবাসীর বিদ্রোহকে স্মরণ করতেই এই আয়োজন শুরু হয়। কাহিনিতে এক মিলারের মেয়ে অত্যাচারী শাসককে হত্যা করে বিদ্রোহের সূচনা করেন। সেই প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেই আজকের “কমলা যুদ্ধ” অনুষ্ঠিত হয়।
বাইরে থেকে দেখলে এটি খাবারের অপচয় মনে হলেও আয়োজকদের দাবি—ব্যবহৃত কমলাগুলো সাধারণত বাজারে বিক্রির অনুপযুক্ত বা নিম্নমানের ফল, এবং পরে সেগুলো কম্পোস্টে রূপান্তর করা হয়। এমনকি স্থানীয়ভাবে এটিকে “waste-free” উৎসব বলেও বর্ণনা করা হয়।
ফ্রান্স: হাজার হাজার ডিম দিয়ে তৈরি হয় বিশাল এক অমলেট
Giant Omelette Festival-এ স্থানীয়রা একত্র হয়ে প্রায় ১৫ হাজার ডিম রান্না করেন, পরে সবাই মিলে তা ভাগাভাগি করে খান। উৎসবটির উৎপত্তি নিয়ে একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি আছে। বলা হয়, Napoleon Bonaparte একবার এ অঞ্চলে ভ্রমণের সময় একটি অমলেট খেয়ে এতটাই পছন্দ করেন যে তিনি পুরো সেনাবাহিনীর জন্য বিশাল অমলেট বানানোর নির্দেশ দেন। যদিও অনেক গবেষক ও স্থানীয়রা এটিকে ঐতিহাসিক সত্যের চেয়ে লোককাহিনি হিসেবেই দেখেন। আধুনিক উৎসবটি ১৯৬৮–১৯৭৩ সালের মধ্যে স্থানীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনমেলার অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে।
মজার বিষয় হলো, ফ্রান্সের এই উৎসব পরে বিশ্বের আরও কয়েকটি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে—যেমন কানাডা, বেলজিয়াম, আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানাতেও “giant omelette” আয়োজন শুরু হয়।
স্পেন: টমেটোর ঝগড়া
La Tomatina—যেখানে রাস্তাজুড়ে শুরু হয় টমেটোর ঝগড়া! হাজার হাজার মানুষ একে অপরের দিকে টমেটো ছুড়ে উদযাপন করেন এই ব্যতিক্রমী উৎসব। এটি প্রতি বছর স্পেনের Buñol শহরে আগস্ট মাসের শেষ বুধবার অনুষ্ঠিত হয়। অনেকেই একে “বিশ্বের সবচেয়ে বড় food fight” বলে থাকেন। উৎসবটি মাত্র এক ঘণ্টা স্থায়ী হলেও পুরো শহর লাল টমেটোর রসে ভরে যায়।

এই উৎসবের শুরু নিয়ে বিভিন্ন গল্প আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় মত অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালে স্থানীয় এক শোভাযাত্রার সময় কিছু তরুণের ঝগড়া থেকে হঠাৎ টমেটো ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। পরে এটি প্রতি বছর অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়। একসময় সরকার উৎসবটি নিষিদ্ধও করেছিল, কিন্তু স্থানীয়দের প্রতিবাদের পর আবার চালু করা হয়। বর্তমানে অংশগ্রহণ সীমিত রাখা হয় এবং প্রায় ২০ হাজারের মতো মানুষ টিকিট কেটে এতে যোগ দেয়।
থাইল্যান্ড: বানরের ভোজ
Monkey Buffet Festival- এতে বানরদের জন্য আয়োজন করা হয় বিশাল ভোজ। উৎসবটি প্রতি বছর থাইল্যান্ডের Lopburi শহরে অনুষ্ঠিত হয়, সাধারণত নভেম্বরের শেষ রবিবারে। উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো শহরের বানরদের জন্য ফল, সবজি, মিষ্টি ও নানা খাবার দিয়ে বিশাল ভোজের আয়োজন।
এই উৎসবের কেন্দ্র হলো প্রাচীন খেমার ধাঁচের মন্দির Phra Prang Sam Yot, যেখানে শত শত দীর্ঘ-লেজওয়ালা macaque বানর বাস করে। উৎসবের দিনে লম্বা টেবিলে তরমুজ, আনারস, কলা, ভুট্টা, ফলের জুস ও নানা খাবার সাজিয়ে রাখা হয়, আর বানরেরা হুড়োহুড়ি করে খেতে আসে।

উৎসবটির শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। স্থানীয় ব্যবসায়ী Yong Opaswong পর্যটন বাড়াতে এবং শহরের বানরদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ধারণা থেকে এটি শুরু করেন। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বানরদের খাওয়ানো সৌভাগ্য বয়ে আনে এবং Lopburi শহরের পর্যটন পরিচয়ের সঙ্গে বানরদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তবে মজার পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক বাস্তবতাও আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে Lopburi-তে বানরের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, খাবার ছিনিয়ে নেওয়া, দোকান ও বাড়িতে ঢুকে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া: কাদা ছোড়াছুড়ি
দক্ষিণ কোরিয়ার Boryeong Mud Festival- হলো দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ও অদ্ভুত গ্রীষ্মকালীন উৎসবগুলোর একটি, যেখানে হাজার হাজার মানুষ কাদা মেখে, কাদা ছুড়ে এবং কাদা-ভিত্তিক নানা খেলায় অংশ নেয়। এটি প্রতি বছর জুলাই মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার Boryeong শহরের Daecheon Beach–এ অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবটি প্রথম শুরু হয় ১৯৯৮ সালে।

বিশাল mud pool, mud slide, mud wrestling, mud prison, obstacle course, এমনকি body painting–এর আয়োজনও থাকে। মানুষ মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাদায় মাখামাখি হয়ে আনন্দ করে, আর সৈকত পরিণত হয় বিশাল এক কাদা-পার্কে।
উৎসবটি আসলে শুরু হয়েছিল একটু ভিন্ন উদ্দেশ্যে। Boryeong অঞ্চলের কাদা বিশেষ করে bentonite ও germanium খনিজসমৃদ্ধ বলে ধারণা করা হয় এবং তা ত্বকের জন্য উপকারী—এই ধারণাকে জনপ্রিয় করতে স্থানীয় কাদা-ভিত্তিক cosmetics প্রচারের অংশ হিসেবে উৎসবটির জন্ম হয়েছিল। পরে এটি এত জনপ্রিয় হয় যে আন্তর্জাতিক পর্যটন উৎসবে পরিণত হয়।
অনেকে এটিকে “বিশ্বের সবচেয়ে নোংরা কিন্তু সবচেয়ে মজার উৎসব” বলেও বর্ণনা করেন। Reddit–এ ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বন্ধুদের বড় দল নিয়ে গেলে উৎসবটি অনেক বেশি উপভোগ্য হয়; কেউ কেউ আবার একে “একদিনের বিশাল কাদা-পার্টি” বলেও উল্লেখ করেন।
স্কটল্যান্ড: আগুনমিছিল
আর স্কটল্যান্ডের Up Helly Aa হলো স্কটল্যান্ডের শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে পালিত এক বিখ্যাত আগুনের উৎসব (fire festival), যা ভাইকিং ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে উদ্যাপন করা হয়। এটি সাধারণত জানুয়ারির শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হয় এবং শীতকালীন Yule উৎসবের সমাপ্তি চিহ্নিত করে। সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় শেটল্যান্ডের রাজধানী Lerwick শহরে, জানুয়ারির শেষ মঙ্গলবারে।

এই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো মশাল হাতে শোভাযাত্রা। শত শত অংশগ্রহণকারী ভাইকিং পোশাক পরে, ঢাল-তলোয়ার হাতে শহরের রাস্তায় মিছিল করে। তাদের নেতৃত্ব দেন “Guizer Jarl” নামে পরিচিত এক প্রতীকী ভাইকিং নেতা। শোভাযাত্রার শেষে একটি কাঠের ভাইকিং জাহাজের প্রতিরূপ (galley/longship) আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়—যা উৎসবের সবচেয়ে নাটকীয় ও চূড়ান্ত মুহূর্ত।
ইতিহাসের দিক থেকে, যদিও এটি দেখতে প্রাচীন ভাইকিং ঐতিহ্যের মতো লাগে, আধুনিক Up Helly Aa আসলে ১৮৭০–১৮৮০-এর দশকে গড়ে ওঠে। এর শিকড় ছিল শেটল্যান্ডের পুরোনো “tar-barrelling” নামের বিশৃঙ্খল আগুনের উৎসব, যেখানে লোকজন জ্বলন্ত টারভর্তি ব্যারেল টেনে শহরে ঘুরত। পরে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য সেই প্রথা বদলে সংগঠিত মশাল শোভাযাত্রা চালু হয় এবং ভাইকিং ইতিহাসের অনুপ্রেরণা যুক্ত হয়।
তামিলণাড়ু: ষাঁড়বধ
এবার চলে আসি ভারতে। ভারতের তামিলনাড়ুর একটি ঐতিহ্যবাহী ও বিতর্কিত ক্রীড়া-উৎসব হলো Jallikattu, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা উন্মত্ত, ছুটে চলা ষাঁড়কে ধরে রাখার বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। এটি সাধারণত জানুয়ারিতে পালিত Pongal উৎসবের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, বিশেষ করে তামিলনাড়ুর Madurai, Tiruchirappalli ও Pudukottai অঞ্চলে বেশি জনপ্রিয়।

এই খেলায় একটি শক্তিশালী ষাঁড়কে নির্দিষ্ট গেট দিয়ে মাঠে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রতিযোগীদের লক্ষ্য থাকে ষাঁড়ের কুঁজ ধরে কিছু দূর পর্যন্ত টিকে থাকা বা নির্দিষ্ট সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা। এখানে লক্ষ্য ষাঁড়কে হত্যা করা নয়; বরং তাকে বশে আনার দক্ষতা ও সাহস দেখানো।
ঐতিহাসিকভাবে, এর শিকড় প্রায় ২,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো বলে মনে করা হয় এবং এটি কৃষিনির্ভর সমাজে সাহস, শক্তি ও গবাদিপশুর মর্যাদার প্রতীক হিসেবে গড়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে ভালো প্রজননক্ষম ষাঁড় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই প্রথার ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়।
তবে এটি বিতর্কিতও। প্রাণী নির্যাতন ও মানব নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ভারতে একসময় এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরে ব্যাপক জনআন্দোলন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দাবির প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট নিয়ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে আবার চালু করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন আরও বহু উৎসব রয়েছে—কোথাও মুলা দিয়ে শিল্পকর্ম, কোথাও কল্পিত গিটার বাজানোর প্রতিযোগিতা, আবার কোথাও সৌভাগ্যের আশায় বরফঠান্ডা নদীতে ঝাঁপ!
উৎসব শুধু আনন্দ নয়—এ যেন মানুষের ইতিহাস, বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আয়োজন হলেও এক জায়গায় সবার মিল—মানুষকে একসঙ্গে আনা, আনন্দ ভাগাভাগি করা এবং জীবনের গল্পকে আরও রঙিন করে তোলা।
শীঘ্রই বাংলাদেশ সহ সারা মুসলিম বিশ্বে শুরু হতে যাচ্ছে ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ। আর আনন্দ করুন সবাইকে নিয়ে। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়- স্বজন, বন্ধু-বান্ধব; আনন্দ ভাগ করুন সবার সঙ্গে। একসঙ্গে বাচুন- অনাবিল আনন্দে।
আজকের প্রতিবেদন— বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে বিচিত্র আয়োজনের উৎসব নিয়ে।
কিউবা: সেন্ট লাজারুস শোভাযাত্রা
সেইন্ট লাজারুস প্রসেশন (Saint Lazarus Procession) বা সেন্ট লাজারুসের শোভাযাত্রা। এটি কিউবার অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে হাজার হাজার ভক্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান গির্জায়। কেউ খালি পায়ে হাঁটেন, কেউ মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যান। কারও শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়, তবুও থামে না যাত্রা। বিশ্বাস আর প্রার্থনার এই দৃশ্য যেন কষ্টের মধ্যেও আশার এক প্রতীক। এটি সেইন্ট লাজারুসকে সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, লাজারুস হচ্ছে বাইবেলে বর্ণিত সেই লাজারুস, যাকে যিশু খ্রিস্ট মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। পরে বিশ্বাস করা হয়, লাজারুস সাইপ্রাসে এসে বসবাস করেন এবং লারনাকার প্রথম বিশপ হন।

এই শোভাযাত্রা সাধারণত ইস্টারের আগে Lazarus Saturday তে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান শুরু হয় Church of Saint Lazarus–এ ধর্মীয় প্রার্থনার মাধ্যমে। এরপর সেন্ট লাজারুসের স্মারক, প্রতীক বা রেলিক শহরের রাস্তায় শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে ধর্মযাজক, স্থানীয় মানুষ, ব্যান্ড, স্কাউট দল এবং সরকারি প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং লারনাকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ এবং পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হিসেবে পরিচিত।
ফিনল্যান্ড: বউকে কাঁধে নিয়ে দৌাঁড়ানো
Wife Carrying World Championship (ফিনিশ ভাষায় Eukonkanto) হলো বিশ্বের অন্যতম অদ্ভুত ও মজার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, যেখানে একজন প্রতিযোগী তার সঙ্গীকে কাঁধে বা পিঠে বহন করে দুর্গম ট্র্যাক দ্রুততম সময়ে পার করার চেষ্টা করেন। এই বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ প্রতি বছর ফিনল্যান্ডের ছোট শহর Sonkajärvi তে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতাটি ১৯৯২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হচ্ছে।

এই প্রতিযোগিতার কোর্সটি প্রায় ২৫৩.৫ মিটার দীর্ঘ হয় এবং এতে থাকে বালুময় পথ, নানা রকম বাধা ও পানিভর্তি অংশ। প্রতিযোগীদের লক্ষ্য হলো সঙ্গীকে নিয়ে সবচেয়ে দ্রুত ফিনিশ লাইনে পৌঁছানো। জনপ্রিয় কৌশলগুলোর মধ্যে “Estonian carry” বিশেষভাবে পরিচিত, এতে বহনকারী ব্যক্তি সঙ্গীকে উল্টোভাবে কাঁধে ঝুলিয়ে দৌড়ান, ফলে ভারসাম্য ভালো থাকে।
নাম ওয়াইফ কেরিং চ্যাম্পিয়নশিপ হলেও বহন করার জন্য সঙ্গী কিন্তু যে কেউই হতে পারে।
এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে মজার দিক হলো এর পুরস্কার। বিজয়ী দল সাধারণত বহন করা সঙ্গীর ওজনের সমপরিমাণ বিয়ার পুরস্কার হিসেবে পায়।
এটি মূলত স্থানীয় ডাকাত নেতা “Robber Ronkainen”-এর কিংবদন্তি ও পুরোনো গ্রামীণ শক্তি-পরীক্ষার গল্প থেকে অনুপ্রাণিত। যদিও আজ এটি পুরোপুরি উৎসবধর্মী, খেলাধুলামূলক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
ইংল্যান্ড: পাহাড়ে গড়াগড়ি
নাম Cooper's Hill Cheese-Rolling and Wake । এটি ইংল্যান্ডের Gloucestershire অঞ্চলের Brockworth গ্রামের কাছে Cooper’s Hill পাহাড়ে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা একটি গড়ানো পনির (cheese) ধরতে পাহাড় বেয়ে নিচে দিকে দৌড়ে নামে আর সেই দৌড় প্রায়ই নিয়ন্ত্রণহীন গড়াগড়িতে পরিণত হয়! উৎসবটির লিখিত ইতিহাস অন্তত ১৮২৬ সাল পর্যন্ত পাওয়া যায়, যদিও অনেকে মনে করেন এর শিকড় আরও পুরোনো, সম্ভবত প্রাচীন কৃষিভিত্তিক বা লোকজ আচার থেকে এটি এসেছে।

এই প্রতিযোগিতায় প্রথমে প্রায় ৮/৯ পাউন্ড ওজনের একটি Double Gloucester cheese পাহাড়ের চূড়া থেকে গড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর প্রতিযোগীরা সেটির পেছনে দৌড়ায়। কিন্তু বাস্তবে পনিরটি এত দ্রুত গড়ায় যে কখনও তা প্রায় ঘণ্টায় ৭০ মাইল বেগেও ছুঁটতে পারে।ফলে এটিকে ধরা অসম্ভব, তাই যে ব্যক্তি সবার আগে পাহাড়ের নিচে পৌঁছায়, তাকেই বিজয়ী ধরা হয় এবং পুরস্কার হিসেবে সেই পনিরটি দেওয়া হয়।
পাহাড়টি অত্যন্ত খাড়া এবং প্রায় ১৮০ মিটার দীর্ঘ এর ঢাল। ফলে অংশগ্রহণকারীরা প্রায়ই পড়ে যায়, গড়াতে থাকে, আঘাত পায়, এমনকি চিকিৎসাকর্মীদের সহায়তাও লাগে। এ কারণেই এটিকে অনেকেই “বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক মজার উৎসব” বলে থাকেন। তবুও প্রতি বছর হাজারো দর্শক এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগী এতে অংশ নেয়।
অন্যদিকে ইতালির Battle of the Oranges উৎসবে দেখা যায় এক অভিনব যুদ্ধ। তবে অস্ত্র নয়—এখানে একে অপরের দিকে ছোড়া হয় কমলালেবু! এই উৎসবটি শুধু মজার ফলযুদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার প্রতীকী ইতিহাস। জনপ্রিয় লোককাহিনি অনুযায়ী, মধ্যযুগে এক অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে শহরবাসীর বিদ্রোহকে স্মরণ করতেই এই আয়োজন শুরু হয়। কাহিনিতে এক মিলারের মেয়ে অত্যাচারী শাসককে হত্যা করে বিদ্রোহের সূচনা করেন। সেই প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেই আজকের “কমলা যুদ্ধ” অনুষ্ঠিত হয়।
বাইরে থেকে দেখলে এটি খাবারের অপচয় মনে হলেও আয়োজকদের দাবি—ব্যবহৃত কমলাগুলো সাধারণত বাজারে বিক্রির অনুপযুক্ত বা নিম্নমানের ফল, এবং পরে সেগুলো কম্পোস্টে রূপান্তর করা হয়। এমনকি স্থানীয়ভাবে এটিকে “waste-free” উৎসব বলেও বর্ণনা করা হয়।
ফ্রান্স: হাজার হাজার ডিম দিয়ে তৈরি হয় বিশাল এক অমলেট
Giant Omelette Festival-এ স্থানীয়রা একত্র হয়ে প্রায় ১৫ হাজার ডিম রান্না করেন, পরে সবাই মিলে তা ভাগাভাগি করে খান। উৎসবটির উৎপত্তি নিয়ে একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি আছে। বলা হয়, Napoleon Bonaparte একবার এ অঞ্চলে ভ্রমণের সময় একটি অমলেট খেয়ে এতটাই পছন্দ করেন যে তিনি পুরো সেনাবাহিনীর জন্য বিশাল অমলেট বানানোর নির্দেশ দেন। যদিও অনেক গবেষক ও স্থানীয়রা এটিকে ঐতিহাসিক সত্যের চেয়ে লোককাহিনি হিসেবেই দেখেন। আধুনিক উৎসবটি ১৯৬৮–১৯৭৩ সালের মধ্যে স্থানীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনমেলার অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে।
মজার বিষয় হলো, ফ্রান্সের এই উৎসব পরে বিশ্বের আরও কয়েকটি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে—যেমন কানাডা, বেলজিয়াম, আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানাতেও “giant omelette” আয়োজন শুরু হয়।
স্পেন: টমেটোর ঝগড়া
La Tomatina—যেখানে রাস্তাজুড়ে শুরু হয় টমেটোর ঝগড়া! হাজার হাজার মানুষ একে অপরের দিকে টমেটো ছুড়ে উদযাপন করেন এই ব্যতিক্রমী উৎসব। এটি প্রতি বছর স্পেনের Buñol শহরে আগস্ট মাসের শেষ বুধবার অনুষ্ঠিত হয়। অনেকেই একে “বিশ্বের সবচেয়ে বড় food fight” বলে থাকেন। উৎসবটি মাত্র এক ঘণ্টা স্থায়ী হলেও পুরো শহর লাল টমেটোর রসে ভরে যায়।

এই উৎসবের শুরু নিয়ে বিভিন্ন গল্প আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় মত অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালে স্থানীয় এক শোভাযাত্রার সময় কিছু তরুণের ঝগড়া থেকে হঠাৎ টমেটো ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। পরে এটি প্রতি বছর অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়। একসময় সরকার উৎসবটি নিষিদ্ধও করেছিল, কিন্তু স্থানীয়দের প্রতিবাদের পর আবার চালু করা হয়। বর্তমানে অংশগ্রহণ সীমিত রাখা হয় এবং প্রায় ২০ হাজারের মতো মানুষ টিকিট কেটে এতে যোগ দেয়।
থাইল্যান্ড: বানরের ভোজ
Monkey Buffet Festival- এতে বানরদের জন্য আয়োজন করা হয় বিশাল ভোজ। উৎসবটি প্রতি বছর থাইল্যান্ডের Lopburi শহরে অনুষ্ঠিত হয়, সাধারণত নভেম্বরের শেষ রবিবারে। উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো শহরের বানরদের জন্য ফল, সবজি, মিষ্টি ও নানা খাবার দিয়ে বিশাল ভোজের আয়োজন।
এই উৎসবের কেন্দ্র হলো প্রাচীন খেমার ধাঁচের মন্দির Phra Prang Sam Yot, যেখানে শত শত দীর্ঘ-লেজওয়ালা macaque বানর বাস করে। উৎসবের দিনে লম্বা টেবিলে তরমুজ, আনারস, কলা, ভুট্টা, ফলের জুস ও নানা খাবার সাজিয়ে রাখা হয়, আর বানরেরা হুড়োহুড়ি করে খেতে আসে।

উৎসবটির শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। স্থানীয় ব্যবসায়ী Yong Opaswong পর্যটন বাড়াতে এবং শহরের বানরদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ধারণা থেকে এটি শুরু করেন। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বানরদের খাওয়ানো সৌভাগ্য বয়ে আনে এবং Lopburi শহরের পর্যটন পরিচয়ের সঙ্গে বানরদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তবে মজার পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক বাস্তবতাও আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে Lopburi-তে বানরের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, খাবার ছিনিয়ে নেওয়া, দোকান ও বাড়িতে ঢুকে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া: কাদা ছোড়াছুড়ি
দক্ষিণ কোরিয়ার Boryeong Mud Festival- হলো দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ও অদ্ভুত গ্রীষ্মকালীন উৎসবগুলোর একটি, যেখানে হাজার হাজার মানুষ কাদা মেখে, কাদা ছুড়ে এবং কাদা-ভিত্তিক নানা খেলায় অংশ নেয়। এটি প্রতি বছর জুলাই মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার Boryeong শহরের Daecheon Beach–এ অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবটি প্রথম শুরু হয় ১৯৯৮ সালে।

বিশাল mud pool, mud slide, mud wrestling, mud prison, obstacle course, এমনকি body painting–এর আয়োজনও থাকে। মানুষ মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাদায় মাখামাখি হয়ে আনন্দ করে, আর সৈকত পরিণত হয় বিশাল এক কাদা-পার্কে।
উৎসবটি আসলে শুরু হয়েছিল একটু ভিন্ন উদ্দেশ্যে। Boryeong অঞ্চলের কাদা বিশেষ করে bentonite ও germanium খনিজসমৃদ্ধ বলে ধারণা করা হয় এবং তা ত্বকের জন্য উপকারী—এই ধারণাকে জনপ্রিয় করতে স্থানীয় কাদা-ভিত্তিক cosmetics প্রচারের অংশ হিসেবে উৎসবটির জন্ম হয়েছিল। পরে এটি এত জনপ্রিয় হয় যে আন্তর্জাতিক পর্যটন উৎসবে পরিণত হয়।
অনেকে এটিকে “বিশ্বের সবচেয়ে নোংরা কিন্তু সবচেয়ে মজার উৎসব” বলেও বর্ণনা করেন। Reddit–এ ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বন্ধুদের বড় দল নিয়ে গেলে উৎসবটি অনেক বেশি উপভোগ্য হয়; কেউ কেউ আবার একে “একদিনের বিশাল কাদা-পার্টি” বলেও উল্লেখ করেন।
স্কটল্যান্ড: আগুনমিছিল
আর স্কটল্যান্ডের Up Helly Aa হলো স্কটল্যান্ডের শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে পালিত এক বিখ্যাত আগুনের উৎসব (fire festival), যা ভাইকিং ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে উদ্যাপন করা হয়। এটি সাধারণত জানুয়ারির শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হয় এবং শীতকালীন Yule উৎসবের সমাপ্তি চিহ্নিত করে। সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় শেটল্যান্ডের রাজধানী Lerwick শহরে, জানুয়ারির শেষ মঙ্গলবারে।

এই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো মশাল হাতে শোভাযাত্রা। শত শত অংশগ্রহণকারী ভাইকিং পোশাক পরে, ঢাল-তলোয়ার হাতে শহরের রাস্তায় মিছিল করে। তাদের নেতৃত্ব দেন “Guizer Jarl” নামে পরিচিত এক প্রতীকী ভাইকিং নেতা। শোভাযাত্রার শেষে একটি কাঠের ভাইকিং জাহাজের প্রতিরূপ (galley/longship) আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়—যা উৎসবের সবচেয়ে নাটকীয় ও চূড়ান্ত মুহূর্ত।
ইতিহাসের দিক থেকে, যদিও এটি দেখতে প্রাচীন ভাইকিং ঐতিহ্যের মতো লাগে, আধুনিক Up Helly Aa আসলে ১৮৭০–১৮৮০-এর দশকে গড়ে ওঠে। এর শিকড় ছিল শেটল্যান্ডের পুরোনো “tar-barrelling” নামের বিশৃঙ্খল আগুনের উৎসব, যেখানে লোকজন জ্বলন্ত টারভর্তি ব্যারেল টেনে শহরে ঘুরত। পরে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য সেই প্রথা বদলে সংগঠিত মশাল শোভাযাত্রা চালু হয় এবং ভাইকিং ইতিহাসের অনুপ্রেরণা যুক্ত হয়।
তামিলণাড়ু: ষাঁড়বধ
এবার চলে আসি ভারতে। ভারতের তামিলনাড়ুর একটি ঐতিহ্যবাহী ও বিতর্কিত ক্রীড়া-উৎসব হলো Jallikattu, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা উন্মত্ত, ছুটে চলা ষাঁড়কে ধরে রাখার বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। এটি সাধারণত জানুয়ারিতে পালিত Pongal উৎসবের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, বিশেষ করে তামিলনাড়ুর Madurai, Tiruchirappalli ও Pudukottai অঞ্চলে বেশি জনপ্রিয়।

এই খেলায় একটি শক্তিশালী ষাঁড়কে নির্দিষ্ট গেট দিয়ে মাঠে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রতিযোগীদের লক্ষ্য থাকে ষাঁড়ের কুঁজ ধরে কিছু দূর পর্যন্ত টিকে থাকা বা নির্দিষ্ট সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা। এখানে লক্ষ্য ষাঁড়কে হত্যা করা নয়; বরং তাকে বশে আনার দক্ষতা ও সাহস দেখানো।
ঐতিহাসিকভাবে, এর শিকড় প্রায় ২,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো বলে মনে করা হয় এবং এটি কৃষিনির্ভর সমাজে সাহস, শক্তি ও গবাদিপশুর মর্যাদার প্রতীক হিসেবে গড়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে ভালো প্রজননক্ষম ষাঁড় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই প্রথার ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়।
তবে এটি বিতর্কিতও। প্রাণী নির্যাতন ও মানব নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ভারতে একসময় এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরে ব্যাপক জনআন্দোলন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দাবির প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট নিয়ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে আবার চালু করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন আরও বহু উৎসব রয়েছে—কোথাও মুলা দিয়ে শিল্পকর্ম, কোথাও কল্পিত গিটার বাজানোর প্রতিযোগিতা, আবার কোথাও সৌভাগ্যের আশায় বরফঠান্ডা নদীতে ঝাঁপ!
উৎসব শুধু আনন্দ নয়—এ যেন মানুষের ইতিহাস, বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আয়োজন হলেও এক জায়গায় সবার মিল—মানুষকে একসঙ্গে আনা, আনন্দ ভাগাভাগি করা এবং জীবনের গল্পকে আরও রঙিন করে তোলা।
শীঘ্রই বাংলাদেশ সহ সারা মুসলিম বিশ্বে শুরু হতে যাচ্ছে ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ। আর আনন্দ করুন সবাইকে নিয়ে। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়- স্বজন, বন্ধু-বান্ধব; আনন্দ ভাগ করুন সবার সঙ্গে। একসঙ্গে বাচুন- অনাবিল আনন্দে।