নারায়ণগঞ্জ
রাজনীতির নতুন মোড়: সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ গড়ার অঙ্গীকার
NewsView

সামিতুল হাসান নিরাক
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান, সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জের মানুষকে স্বস্তি দেয়। একটি নিরাপদ নারায়ণগঞ্জের আশায় বুক বেঁধে আছেন তারা, যেখানে রাজনীতির নামে হানাহানি থাকবে না; কথায় কথায় কেউ কারও ওপর চড়াও হবে না; রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু থাকবে না একে অপরের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ। দল-মতে পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা থাকবে, থাকবে রাজনৈতিক সহাবস্থান।
নারায়ণগঞ্জবাসীর এমন ভাবনা নিয়ে- নিউজ ভিউ মুখোমুখি হয়েছে স্থানীয় বিভিন্ন দলের রাজনীতিকের। নেতারা প্রত্যাশা করছেন, নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিগত সময়ের মতো আর হবে না, হওয়ার সুযোগও নেই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের যে শিক্ষা বা আদর্শ, সেটা ধারণ করেই তারা সহনশীল রাজনৈতিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে চান। আগামী সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় যে দলই আসুক, সব দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তারা বৈষম্যমুক্ত ও সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, চব্বিশ কেন সৃষ্টি হলো? চব্বিশ সৃষ্টি হয়েছে একদলীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সম্প্রীতির রাজনীতি সৃষ্টি করা। তো আমরা ওই সম্প্রীতির রাজনীতিটা চাই। একদলীয় এবং এক পরিবারের রাজনীতির বিপরীতে আমরা চাই একটি সম্প্রীতির রাজনীতি, সহানুভূতির রাজনীতি, উন্নয়নের রাজনীতি, অধিকারের রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের রাজনীতি। এটাই আমার প্রত্যাশা করি এবং আমি এমন নারায়ণগঞ্জই দেখতে চাই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ মহানগর আমির ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল জব্বার বলেন, ৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, প্রথম পরিবর্তনটা হলো, বাংলাদেশের মানুষ আর কোনো স্বৈরশাসক চায় না। সামনে নির্বাচন হবে এবং নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের যে প্রত্যাশা, যারা আগামী দিনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়ে আসবেন, তাদের মধ্যেও কেউ স্বৈরাচারী হবেন না। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের প্রেক্ষাপটে এখানে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, চাঁদাবাজি, দলের অভ্যন্তরে রাহাজানি, খুনোখুনি, প্রতিপক্ষের প্রতি যে আক্রমণ, অন্যের রাজনৈতিক মতকে সহ্য না করা-- এই যে অসুন্দর রাজনীতি, এই জায়গা থেকে আমাদের সবাইকে সরে আসা দরকার। এই দিক থেকে আমরা জামায়াতে ইসলামী বলছি যে ধর্ম, চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, অন্যের প্রতি সম্মান রেখে সবাই যার যার রাজনীতিটা করবে।
তিনি বলেন, নিয়মতান্ত্রিকভাবে কেউ আপনাকে নেতা বানালে তো আমার আপত্তি থাকার কথা না, আবার আমাকে কেউ নেতা বানালে তো আপনার আপত্তি থাকার কথা না। অর্থাৎ পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকাটা খুবই জরুরি। জুলুমবাজি, সন্ত্রাসী, উগ্র চিন্তাভাবনা অতীতে যেটা ছিল, আমার মাসল (পেশি) আছে, আমার ক্যাডার আছে, এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে আগামীর বাংলাদেশ ভালো হবে, নারায়ণগঞ্জও ভালো হবে; ভালোর পক্ষে একটা জোয়ার তৈরি হবে এবং আমরা সবাই মিলে স্বস্তির, নিরাপত্তার নতুন বাংলাদেশ পাব ইনশাল্লাহ।
অন্য সবার মতো সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত এবং বৈষম্যমুক্ত নারায়ণগঞ্জ দেখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ মহানগর সভাপতি মুফতি মাসুম বিল্লাহ। তিনি বলেন, অতীতে নারায়ণগঞ্জের যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথা আমরা জানি, ধর্ম-বর্ণ, দল-মতের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমরা চাই সেই ঐতিহ্য ফিরে আসুক। যেখানে থাকবে না কোনো অন্যায়-অবিচার। ইনসাফভিত্তিক একটি ন্যায়পরায়ন নারায়ণগঞ্জের প্রত্যাশা করি আমরা। একটি সবুজ-পরিচ্ছন্ন সুন্দর নারায়ণগঞ্জ গড়ে তুলতে হলে আমাদের রাজনীতিবিদদের সুন্দর, পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
চব্বিশের যে আকাঙ্ক্ষা অগুনিত ছাত্র-জনতা তাদের রক্ত দিয়ে দেখিয়ে গেছেন, সেই আকাঙ্ক্ষার কিছুটা স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক আহমেদুর রহমান তনু। তার ভাষ্য, একাত্তরে যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, এর ধারাবাহিকতা যদি থাকতো, তাহলে চব্বিশের প্রয়োজন হতো না। আজকে চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেই জায়গা থেকে নারায়ণগঞ্জের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটা যদি বলি, তা আসলে কোনো ধরনের আশা জাগায় না। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফ্যাসিস্টরা সবাই চলে গেছে। কিন্তু তার ছায়া এখনো কিছুটা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে সবাই একটা সংকটময় মুহূর্ত (ক্রাইসিস মোমেন্ট) কাটিয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে-- সব দিক থেকেই তারা জেল-জুলুম খেটেছে, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমরা ভেবেছিলাম, নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি-- চাঁদাবাজি থাকবে না, দখলদারি থাকবে না, জুলুম থাকবে না, একজন আরেকজনের সঙ্গে সম্প্রীতি-সহাবস্থান বজায় রাখবে-- গত এক-দেড় বছরে এমনটা কিন্তু আমরা পাইনি। অনেকটা স্বপ্নভঙ্গের মতো ঘটনা ঘটেছে। তারপরেও আমরা আশাবাদী। সবকিছু হয়তো একদিনে পরিবর্তন হবে না। সেটা আশা করাও যায় না। সামনে নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটবে। শুধু টাকাওয়ালাদের নয়, মানুষ সত্যিকারের সৎ, আদর্শবান রাজনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধি বেছে নেবে।
গণসংহতি আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার সমন্বয়কারী তরিকুল সুজন বলেন, চব্বিশ সালের আগ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ একটা গুম-খুনের জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানকার নাগরিকদের নিরাপত্তা বলতে কিছু ছিল না। ৫ আগস্টের পর হাসিনার সঙ্গে সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারও পালিয়ে যায়। তার পরে আমরা ভেবেছিলাম, এই নারায়ণগঞ্জ সকলের হবে। চব্বিশের আন্দোলনের যে বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষা, সেখান থেকে নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই নাগরিক হিসেবে তাদের নিরাপত্তা এবং সমান মর্যাদার অধিকারী হবেন। আরও একটু সুনির্দিষ্ট করে যদি বলি, বিগত সময়ে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে যে দুরবস্থা চলছিল, আমরা আশা করেছিলাম, অন্তত প্রশাসনের দিক থেকে বিশেষ করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটা গুণগত পরিবর্তন আসবে। গুরুত্বপূর্ণ এই স্বাস্থ্য খাতে গত আমলের ব্যবস্থাই বহাল আছে। চব্বিশ পরবর্তী আমার দলের পক্ষ থেকে আমরা বলেছিলাম, ‘শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নতি, নিরাপদে বাস; সুযোগের সমান অধিকার মর্যাদায় কাজ’। এটা ছিল চব্বিশ পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জে আমাদের আকাঙ্ক্ষা। সুতরাং আমরা চাই, নারায়ণগঞ্জটাকে এইভাবে গড়ে তুলতে। যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, সবাই তার সমান মর্যাদা নিয়ে এই শহরে বসবাস করবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি শীবনাথ চক্রবর্তী বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে এদেশের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছে চব্বিশের জুলাইয়ে, সেটা অনেক আশা নিয়েই করেছে, অনেক রক্ত ঝরেছে। অনেকে আত্মহুতি দিয়েছে, কিন্তু তাদের সেই আশা-আকাঙ্ক্ষার মর্যাদা এই মুহূর্তে রাখতে পারছি বলে আমার মনে হচ্ছে না। নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে আমাদের জাতির জীবনে; সাংস্কৃতিক জীবনেও সংকট দেখা দিয়েছে। গান-বাজনার ওপর আক্রমণ হচ্ছে, বাউল শিল্পীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা কাম্য ছিল না। অবশ্যই এর পরিবর্তন হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে নারায়ণগঞ্জে একটি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে বহু বছর আমরা রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলাম। ত্বকী হত্যা থেকে শুরু করে, চঞ্চল-মিঠু-ভুলু হত্যা--এগুলোর বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করেছি। আগামী দিনে চাই না, আর এমন ঘটনা ঘটুক। সাম্প্রতিককালে আমরা দেখছি, অনেকগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রশাসন খুব সতর্কতার সঙ্গে বা গভীরভাবে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে আমাদের মনে হয় না। এই অবস্থাটা বিরাজমান, মানুষ খুবই শঙ্কিত। নারায়ণগঞ্জের মানুষ শান্তিপ্রিয়। ভবিষ্যতে আমরা একটি শান্তির নারায়ণগঞ্জ দেখতে চাই। আর একটা খুনোখুনিও দেখতে চাই না। এটাই আমার প্রত্যাশা।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান, সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জের মানুষকে স্বস্তি দেয়। একটি নিরাপদ নারায়ণগঞ্জের আশায় বুক বেঁধে আছেন তারা, যেখানে রাজনীতির নামে হানাহানি থাকবে না; কথায় কথায় কেউ কারও ওপর চড়াও হবে না; রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু থাকবে না একে অপরের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ। দল-মতে পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা থাকবে, থাকবে রাজনৈতিক সহাবস্থান।
নারায়ণগঞ্জবাসীর এমন ভাবনা নিয়ে- নিউজ ভিউ মুখোমুখি হয়েছে স্থানীয় বিভিন্ন দলের রাজনীতিকের। নেতারা প্রত্যাশা করছেন, নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিগত সময়ের মতো আর হবে না, হওয়ার সুযোগও নেই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের যে শিক্ষা বা আদর্শ, সেটা ধারণ করেই তারা সহনশীল রাজনৈতিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে চান। আগামী সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় যে দলই আসুক, সব দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তারা বৈষম্যমুক্ত ও সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, চব্বিশ কেন সৃষ্টি হলো? চব্বিশ সৃষ্টি হয়েছে একদলীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সম্প্রীতির রাজনীতি সৃষ্টি করা। তো আমরা ওই সম্প্রীতির রাজনীতিটা চাই। একদলীয় এবং এক পরিবারের রাজনীতির বিপরীতে আমরা চাই একটি সম্প্রীতির রাজনীতি, সহানুভূতির রাজনীতি, উন্নয়নের রাজনীতি, অধিকারের রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের রাজনীতি। এটাই আমার প্রত্যাশা করি এবং আমি এমন নারায়ণগঞ্জই দেখতে চাই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ মহানগর আমির ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল জব্বার বলেন, ৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, প্রথম পরিবর্তনটা হলো, বাংলাদেশের মানুষ আর কোনো স্বৈরশাসক চায় না। সামনে নির্বাচন হবে এবং নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের যে প্রত্যাশা, যারা আগামী দিনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়ে আসবেন, তাদের মধ্যেও কেউ স্বৈরাচারী হবেন না। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের প্রেক্ষাপটে এখানে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, চাঁদাবাজি, দলের অভ্যন্তরে রাহাজানি, খুনোখুনি, প্রতিপক্ষের প্রতি যে আক্রমণ, অন্যের রাজনৈতিক মতকে সহ্য না করা-- এই যে অসুন্দর রাজনীতি, এই জায়গা থেকে আমাদের সবাইকে সরে আসা দরকার। এই দিক থেকে আমরা জামায়াতে ইসলামী বলছি যে ধর্ম, চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, অন্যের প্রতি সম্মান রেখে সবাই যার যার রাজনীতিটা করবে।
তিনি বলেন, নিয়মতান্ত্রিকভাবে কেউ আপনাকে নেতা বানালে তো আমার আপত্তি থাকার কথা না, আবার আমাকে কেউ নেতা বানালে তো আপনার আপত্তি থাকার কথা না। অর্থাৎ পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকাটা খুবই জরুরি। জুলুমবাজি, সন্ত্রাসী, উগ্র চিন্তাভাবনা অতীতে যেটা ছিল, আমার মাসল (পেশি) আছে, আমার ক্যাডার আছে, এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে আগামীর বাংলাদেশ ভালো হবে, নারায়ণগঞ্জও ভালো হবে; ভালোর পক্ষে একটা জোয়ার তৈরি হবে এবং আমরা সবাই মিলে স্বস্তির, নিরাপত্তার নতুন বাংলাদেশ পাব ইনশাল্লাহ।
অন্য সবার মতো সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত এবং বৈষম্যমুক্ত নারায়ণগঞ্জ দেখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ মহানগর সভাপতি মুফতি মাসুম বিল্লাহ। তিনি বলেন, অতীতে নারায়ণগঞ্জের যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথা আমরা জানি, ধর্ম-বর্ণ, দল-মতের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমরা চাই সেই ঐতিহ্য ফিরে আসুক। যেখানে থাকবে না কোনো অন্যায়-অবিচার। ইনসাফভিত্তিক একটি ন্যায়পরায়ন নারায়ণগঞ্জের প্রত্যাশা করি আমরা। একটি সবুজ-পরিচ্ছন্ন সুন্দর নারায়ণগঞ্জ গড়ে তুলতে হলে আমাদের রাজনীতিবিদদের সুন্দর, পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
চব্বিশের যে আকাঙ্ক্ষা অগুনিত ছাত্র-জনতা তাদের রক্ত দিয়ে দেখিয়ে গেছেন, সেই আকাঙ্ক্ষার কিছুটা স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক আহমেদুর রহমান তনু। তার ভাষ্য, একাত্তরে যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, এর ধারাবাহিকতা যদি থাকতো, তাহলে চব্বিশের প্রয়োজন হতো না। আজকে চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেই জায়গা থেকে নারায়ণগঞ্জের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটা যদি বলি, তা আসলে কোনো ধরনের আশা জাগায় না। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফ্যাসিস্টরা সবাই চলে গেছে। কিন্তু তার ছায়া এখনো কিছুটা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে সবাই একটা সংকটময় মুহূর্ত (ক্রাইসিস মোমেন্ট) কাটিয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে-- সব দিক থেকেই তারা জেল-জুলুম খেটেছে, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমরা ভেবেছিলাম, নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি-- চাঁদাবাজি থাকবে না, দখলদারি থাকবে না, জুলুম থাকবে না, একজন আরেকজনের সঙ্গে সম্প্রীতি-সহাবস্থান বজায় রাখবে-- গত এক-দেড় বছরে এমনটা কিন্তু আমরা পাইনি। অনেকটা স্বপ্নভঙ্গের মতো ঘটনা ঘটেছে। তারপরেও আমরা আশাবাদী। সবকিছু হয়তো একদিনে পরিবর্তন হবে না। সেটা আশা করাও যায় না। সামনে নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটবে। শুধু টাকাওয়ালাদের নয়, মানুষ সত্যিকারের সৎ, আদর্শবান রাজনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধি বেছে নেবে।
গণসংহতি আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার সমন্বয়কারী তরিকুল সুজন বলেন, চব্বিশ সালের আগ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ একটা গুম-খুনের জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানকার নাগরিকদের নিরাপত্তা বলতে কিছু ছিল না। ৫ আগস্টের পর হাসিনার সঙ্গে সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারও পালিয়ে যায়। তার পরে আমরা ভেবেছিলাম, এই নারায়ণগঞ্জ সকলের হবে। চব্বিশের আন্দোলনের যে বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষা, সেখান থেকে নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই নাগরিক হিসেবে তাদের নিরাপত্তা এবং সমান মর্যাদার অধিকারী হবেন। আরও একটু সুনির্দিষ্ট করে যদি বলি, বিগত সময়ে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে যে দুরবস্থা চলছিল, আমরা আশা করেছিলাম, অন্তত প্রশাসনের দিক থেকে বিশেষ করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটা গুণগত পরিবর্তন আসবে। গুরুত্বপূর্ণ এই স্বাস্থ্য খাতে গত আমলের ব্যবস্থাই বহাল আছে। চব্বিশ পরবর্তী আমার দলের পক্ষ থেকে আমরা বলেছিলাম, ‘শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নতি, নিরাপদে বাস; সুযোগের সমান অধিকার মর্যাদায় কাজ’। এটা ছিল চব্বিশ পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জে আমাদের আকাঙ্ক্ষা। সুতরাং আমরা চাই, নারায়ণগঞ্জটাকে এইভাবে গড়ে তুলতে। যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, সবাই তার সমান মর্যাদা নিয়ে এই শহরে বসবাস করবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি শীবনাথ চক্রবর্তী বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে এদেশের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছে চব্বিশের জুলাইয়ে, সেটা অনেক আশা নিয়েই করেছে, অনেক রক্ত ঝরেছে। অনেকে আত্মহুতি দিয়েছে, কিন্তু তাদের সেই আশা-আকাঙ্ক্ষার মর্যাদা এই মুহূর্তে রাখতে পারছি বলে আমার মনে হচ্ছে না। নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে আমাদের জাতির জীবনে; সাংস্কৃতিক জীবনেও সংকট দেখা দিয়েছে। গান-বাজনার ওপর আক্রমণ হচ্ছে, বাউল শিল্পীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা কাম্য ছিল না। অবশ্যই এর পরিবর্তন হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে নারায়ণগঞ্জে একটি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে বহু বছর আমরা রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলাম। ত্বকী হত্যা থেকে শুরু করে, চঞ্চল-মিঠু-ভুলু হত্যা--এগুলোর বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করেছি। আগামী দিনে চাই না, আর এমন ঘটনা ঘটুক। সাম্প্রতিককালে আমরা দেখছি, অনেকগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রশাসন খুব সতর্কতার সঙ্গে বা গভীরভাবে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে আমাদের মনে হয় না। এই অবস্থাটা বিরাজমান, মানুষ খুবই শঙ্কিত। নারায়ণগঞ্জের মানুষ শান্তিপ্রিয়। ভবিষ্যতে আমরা একটি শান্তির নারায়ণগঞ্জ দেখতে চাই। আর একটা খুনোখুনিও দেখতে চাই না। এটাই আমার প্রত্যাশা।
লোড হচ্ছে...