নারায়ণগঞ্জ
সরলপ্রাণ সাহসী আব্দুর রহমান
NewsView

কাজল কানন
আবদুর রহমান: সরল সাহসের এক সুন্দর মানুষ
নারায়ণগঞ্জের মানুষের কাছে আবদুর রহমান ছিলেন এক পরিচিত মুখ, কিন্তু যারা তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন, তাদের কাছে তিনি ছিলেন তার চেয়েও বেশি কিছু—একজন নির্ভীক, সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ এবং গভীরভাবে মানবিক মানুষ। আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতি, রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য জীবনের কথাই মনে পড়ে।
রহমান ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল শুধুই সংগঠনের নয়, ছিল পরিবারের মতো আন্তরিক। প্রায় প্রতি রাতেই তাঁর বাসায় যাওয়া হতো। সেখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ভাবীর (রহমান ভাইয়ের স্ত্রী) সঙ্গে হাস্যরসপূর্ণ কথোপকথন। একদিন ভাবী বললেন, “কাজল, তোমার জন্য একটা মেয়ে দেখছি।” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন ভাবী?” উত্তরে তিনি বললেন, “তোমারে বিয়া করামু।” এরপর চলতে থাকে মজার সব সংলাপ— আমি বললাম, খাওয়াবে কে? ভাবী বললেন তার খাওয়া লাগবে না। জবাবে বললাম তাহলে তো গ্যাস্ট্রিক হবে, চিকিৎসা করাবে কে? এবার ভাবীর মোক্ষম কথা- তোমার মাথায় পানি ঢাইলো দিমু, তোমার বউয়ের গ্যাসস্ট্রিক সাইরা যাইবো। সেই ভাবীও এখন আর নেই। তার হাসি আলাপ সংলাপ রয়ে গেছে স্মৃতিতে। ভাবী জন্য থাকলো দোয়া।
রহমান ভাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। তাই রাতে রুটি আর সবজি ভাবী আমাদের কথাও মাথায় রাখতেন। আমি ও দাদা (রনজিত কুমার) নিয়মিত রহমান ভাইয়ের বাসায় গেলে আমাদের জন্য বাড়তি রুটি ও সবজি তৈরি থাকত। সারাদিন ঘুবেরানোর পর প্রায় মধ্যরাতে সেই খাবারও ছিলো আমাদের কাছে খুবই আরাধ্য। নিতাইগঞ্জে তাঁর পুরোনো বাসা থেকে শুরু করে বর্তমান বাড়িতে ওঠার নানা পর্যায়ের স্মৃতিও আজ মনে পড়ে।
আমার এবং রহমান ভাইয়ের বন্ধুত্ব ও কর্মসম্পর্কের সাক্ষী হয়ে আছে রূপালী ইন্স্যুরেন্সের একাধিক অফিস। আড্ডা, আলোচনা, পরিকল্পনা—সবকিছু চলতো। তার কথার প্রাণবন্ততা আর সব মানুষের প্রতি সম্মানবোধ তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
এক গভীর রাতে, মণ্ডলপাড়া পুলের কাছে দাঁড়িয়ে রনজিতদা বললেন, “চলো, তোমাকে একজন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।” রাত তখন প্রায় বারোটা। আমরা গেলাম রহমান ভাইয়ের বাসায়। সেই পরিচয় পরে এক যুগের সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল। সেদিন রাতেই, প্রায় দুইটার দিকে তাঁর বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল—আবদুর রহমান হবেন শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমির সভাপতি। এরপর শুরু হয়েছিল দীর্ঘ পথচলা।
দাদার মৃত্যুর পর এবং চাকরি ও সাংগঠনিক ব্যস্ততার কারণে আগের মতো নিয়মিত যাওয়া না হলেও যোগাযোগ কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মাঝেমধ্যে ফোনালাপ হতো, খোঁজখবর নেওয়া হতো।
একবার তাঁকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা বলেছিলাম। তিনি হেসে বলেছিলেন, “কাজল, তুমি জানো না, রাজ্জাক ভাই (বাকশাল ও আওয়ামী লীগনেতা) কইছে— ভোটে পাশ করলে অকাজই বেশি হয়।” কথাটি তিনি স্বভাবসুলভ রসিকতা বললেও বাস্তবে তিনি ছিলেন মানুষের মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর সঙ্গে রাস্তায় বের হলে দুই কদম হাঁটাও কঠিন ছিল। চারপাশ থেকে মানুষ এসে ডাকত- আরে রহমান ভাই কেমন, আছেন, কোথায় যান। একটু দাঁড়ান। সালাম দিত, খোঁজখবর নিত। মনে হতো, এই মানুষটির যেন কোনো শত্রু নেই।
কিন্তু তাঁর এই সহজ-সরল চেহারার আড়ালে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক সত্তা। হাসিমাখা মুখ দেখে বোঝার উপায় ছিল না, তিনি কতটা দৃঢ় নীতির মানুষ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান এবং সত্য উচ্চারণে তিনি ছিলেন নির্ভীক।
তাঁর সন্তান তানহা, তনু ও তপুকে ছোটবেলা থেকে বড় হতে দেখেছি। তাঁদের মধ্যে বাবার বিনয়, সৌজন্য ও মানবিকতার ছাপ স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে তানহা ও তনুর মুখে রহমান ভাইয়ের সেই চিরচেনা হাসি যেন এখনও হেঁটে বেড়ায়।
আবদুর রহমান ১৯৪৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার নয়াপাড়ায় জন্ম নেন। তাঁর বাবা শাহেদ আলী এবং মা আমেনা বেগম। ছাত্রজীবনেই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে বৃহত্তর ঢাকা জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে তিনি নারায়ণগঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তীতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মহিউদ্দিন আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে গঠিত বাকশালে যোগ দেন এবং নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন। আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণও করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। পাটকল শ্রমিক ও রিকশা শ্রমিকদের সংগঠিত করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। একইসঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক, পেশাজীবী ও ধর্মীয় নানা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৯২ সালে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পর রহমান ভাই অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। দেশের রাজনীতি তাকে নানাভাবে হতাশ করেছে। এর প্রায় ৮ বছর পর তিনি শ্রুতির মধ্য দিয়ে ফিরে আসেন কর্মযজ্ঞে।
এ সময় নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটে আব্দুর রহমান, শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমির হয়ে প্রতিনিধিতত্ব করেন। এপর নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম এবং সম্মিলিত ভূমি রক্ষা নাগরিক পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় ও শিক্ষাক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। জশনে জুলুস ঈদে মিলাদুন্নবী, সুন্নী ঐক্য পরিষদ, বাইতুল ইজ্জত জামে মসজিদ, দেওভোগ মাদ্রাসাসহ নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। পাশাপাশি চারুগঞ্জ একাডেমি অব ফাইন আর্টসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পালন করেছেন। অসুস্থ হয়ে ঘরবন্দি হওয়ার পরও তার সঙ্গে নতুন বাসায় কথা হতো।
বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জ মূলত বণিকের শহর। সেই শহরে আবদুর রহমান ছিলেন বিবেকের কণ্ঠস্বর। তিনি বুক চিতিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারতেন। ক্ষমতার কাছে নতজানু না হয়ে মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর যে সাহস, সেটিই তাঁকে আলাদা মর্যাদাবান করেছে।
আবদুর রহমান ছিলেন সরলপ্রাণ সাহসের এক সুন্দর মানুষ। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য কর্মস্মৃতি, সংগ্রামের গল্প এবং মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্য, ন্যায় ও আদর্শের পথে অবিচল থাকা এখনও সম্ভব।
১৫ জুন ২০২৪ সালে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহস, সততা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা নারায়ণগঞ্জের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
আবদুর রহমান: সরল সাহসের এক সুন্দর মানুষ
নারায়ণগঞ্জের মানুষের কাছে আবদুর রহমান ছিলেন এক পরিচিত মুখ, কিন্তু যারা তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন, তাদের কাছে তিনি ছিলেন তার চেয়েও বেশি কিছু—একজন নির্ভীক, সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ এবং গভীরভাবে মানবিক মানুষ। আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতি, রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য জীবনের কথাই মনে পড়ে।
রহমান ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল শুধুই সংগঠনের নয়, ছিল পরিবারের মতো আন্তরিক। প্রায় প্রতি রাতেই তাঁর বাসায় যাওয়া হতো। সেখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ভাবীর (রহমান ভাইয়ের স্ত্রী) সঙ্গে হাস্যরসপূর্ণ কথোপকথন। একদিন ভাবী বললেন, “কাজল, তোমার জন্য একটা মেয়ে দেখছি।” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন ভাবী?” উত্তরে তিনি বললেন, “তোমারে বিয়া করামু।” এরপর চলতে থাকে মজার সব সংলাপ— আমি বললাম, খাওয়াবে কে? ভাবী বললেন তার খাওয়া লাগবে না। জবাবে বললাম তাহলে তো গ্যাস্ট্রিক হবে, চিকিৎসা করাবে কে? এবার ভাবীর মোক্ষম কথা- তোমার মাথায় পানি ঢাইলো দিমু, তোমার বউয়ের গ্যাসস্ট্রিক সাইরা যাইবো। সেই ভাবীও এখন আর নেই। তার হাসি আলাপ সংলাপ রয়ে গেছে স্মৃতিতে। ভাবী জন্য থাকলো দোয়া।
রহমান ভাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। তাই রাতে রুটি আর সবজি ভাবী আমাদের কথাও মাথায় রাখতেন। আমি ও দাদা (রনজিত কুমার) নিয়মিত রহমান ভাইয়ের বাসায় গেলে আমাদের জন্য বাড়তি রুটি ও সবজি তৈরি থাকত। সারাদিন ঘুবেরানোর পর প্রায় মধ্যরাতে সেই খাবারও ছিলো আমাদের কাছে খুবই আরাধ্য। নিতাইগঞ্জে তাঁর পুরোনো বাসা থেকে শুরু করে বর্তমান বাড়িতে ওঠার নানা পর্যায়ের স্মৃতিও আজ মনে পড়ে।
আমার এবং রহমান ভাইয়ের বন্ধুত্ব ও কর্মসম্পর্কের সাক্ষী হয়ে আছে রূপালী ইন্স্যুরেন্সের একাধিক অফিস। আড্ডা, আলোচনা, পরিকল্পনা—সবকিছু চলতো। তার কথার প্রাণবন্ততা আর সব মানুষের প্রতি সম্মানবোধ তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
এক গভীর রাতে, মণ্ডলপাড়া পুলের কাছে দাঁড়িয়ে রনজিতদা বললেন, “চলো, তোমাকে একজন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।” রাত তখন প্রায় বারোটা। আমরা গেলাম রহমান ভাইয়ের বাসায়। সেই পরিচয় পরে এক যুগের সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল। সেদিন রাতেই, প্রায় দুইটার দিকে তাঁর বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল—আবদুর রহমান হবেন শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমির সভাপতি। এরপর শুরু হয়েছিল দীর্ঘ পথচলা।
দাদার মৃত্যুর পর এবং চাকরি ও সাংগঠনিক ব্যস্ততার কারণে আগের মতো নিয়মিত যাওয়া না হলেও যোগাযোগ কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মাঝেমধ্যে ফোনালাপ হতো, খোঁজখবর নেওয়া হতো।
একবার তাঁকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা বলেছিলাম। তিনি হেসে বলেছিলেন, “কাজল, তুমি জানো না, রাজ্জাক ভাই (বাকশাল ও আওয়ামী লীগনেতা) কইছে— ভোটে পাশ করলে অকাজই বেশি হয়।” কথাটি তিনি স্বভাবসুলভ রসিকতা বললেও বাস্তবে তিনি ছিলেন মানুষের মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর সঙ্গে রাস্তায় বের হলে দুই কদম হাঁটাও কঠিন ছিল। চারপাশ থেকে মানুষ এসে ডাকত- আরে রহমান ভাই কেমন, আছেন, কোথায় যান। একটু দাঁড়ান। সালাম দিত, খোঁজখবর নিত। মনে হতো, এই মানুষটির যেন কোনো শত্রু নেই।
কিন্তু তাঁর এই সহজ-সরল চেহারার আড়ালে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক সত্তা। হাসিমাখা মুখ দেখে বোঝার উপায় ছিল না, তিনি কতটা দৃঢ় নীতির মানুষ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান এবং সত্য উচ্চারণে তিনি ছিলেন নির্ভীক।
তাঁর সন্তান তানহা, তনু ও তপুকে ছোটবেলা থেকে বড় হতে দেখেছি। তাঁদের মধ্যে বাবার বিনয়, সৌজন্য ও মানবিকতার ছাপ স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে তানহা ও তনুর মুখে রহমান ভাইয়ের সেই চিরচেনা হাসি যেন এখনও হেঁটে বেড়ায়।
আবদুর রহমান ১৯৪৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার নয়াপাড়ায় জন্ম নেন। তাঁর বাবা শাহেদ আলী এবং মা আমেনা বেগম। ছাত্রজীবনেই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে বৃহত্তর ঢাকা জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে তিনি নারায়ণগঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তীতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মহিউদ্দিন আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে গঠিত বাকশালে যোগ দেন এবং নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন। আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণও করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। পাটকল শ্রমিক ও রিকশা শ্রমিকদের সংগঠিত করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। একইসঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক, পেশাজীবী ও ধর্মীয় নানা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৯২ সালে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পর রহমান ভাই অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। দেশের রাজনীতি তাকে নানাভাবে হতাশ করেছে। এর প্রায় ৮ বছর পর তিনি শ্রুতির মধ্য দিয়ে ফিরে আসেন কর্মযজ্ঞে।
এ সময় নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটে আব্দুর রহমান, শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমির হয়ে প্রতিনিধিতত্ব করেন। এপর নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম এবং সম্মিলিত ভূমি রক্ষা নাগরিক পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় ও শিক্ষাক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। জশনে জুলুস ঈদে মিলাদুন্নবী, সুন্নী ঐক্য পরিষদ, বাইতুল ইজ্জত জামে মসজিদ, দেওভোগ মাদ্রাসাসহ নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। পাশাপাশি চারুগঞ্জ একাডেমি অব ফাইন আর্টসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পালন করেছেন। অসুস্থ হয়ে ঘরবন্দি হওয়ার পরও তার সঙ্গে নতুন বাসায় কথা হতো।
বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জ মূলত বণিকের শহর। সেই শহরে আবদুর রহমান ছিলেন বিবেকের কণ্ঠস্বর। তিনি বুক চিতিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারতেন। ক্ষমতার কাছে নতজানু না হয়ে মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর যে সাহস, সেটিই তাঁকে আলাদা মর্যাদাবান করেছে।
আবদুর রহমান ছিলেন সরলপ্রাণ সাহসের এক সুন্দর মানুষ। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য কর্মস্মৃতি, সংগ্রামের গল্প এবং মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্য, ন্যায় ও আদর্শের পথে অবিচল থাকা এখনও সম্ভব।
১৫ জুন ২০২৪ সালে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহস, সততা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা নারায়ণগঞ্জের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
লোড হচ্ছে...