জাতীয়
তবুও ভোট দেবেন সবাই
NewsView

নিউজভিউ বিশেষ
ভোট মানুষের অধিকার। এই অধিকার সংক্ষিত রাষ্ট্রের সংবিধানে। তার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়েই হয়তো বলা হয়- উৎসব মুখর ভোট, ভোট উৎসব ইত্যাদি। ভোটাররা ভোট দিয়ে প্রতিনিধি ঠিক করেন- সমস্যা, সংকট ও উত্তরণে পাশে পাওয়ার আশা নিয়ে। তাদের জীবন যাতে সহজ সুন্দর হয়। আর প্রার্থীরা ভোটারের আকাঙ্খা বাস্তবায়নে সহায়ক কাজ করবেন, রাষ্ট্র বা সরকারের হয়ে। তাই ভোট বুদ্ধি-বিবেচনা, নৈতিকতার পাশাপাশি দায়িত্ব নেওয়া এবং দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ও। এটি কেবল উৎসবে সীমাবদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট দিনেরও বিষয় নয়। কেন দায়িত্ব দেওয়া আর কেন দায়িত্ব নেওয়া- এই স্বচ্ছতা ভোটের হিসাবে জরুরি। নাহলে সীমিত সম্পদের এই দেশে ভোটের ব্যয়বহুল আয়োজন একশ্রেণির ক্ষমতা বদলের বন্দোবস্ত হলেও, সাধারণ মানুষ থেকে যাবেন উপেক্ষিত। গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় ভোটের বিকল্প নেই। ভোটের মধ্য দিয়ে যারা ক্ষমতায় আসবেন তারাই নির্ধারণ করবেন ভোট কতটা অর্থবহ। বিশেষ করে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর হতে যাওয়া চলমান নির্বাচন মানুষের মধ্যে অধিকার আদায়ের আকাঙক্ষা আরও জোরালো করেছে।
এই ভোটের মধ্য দিয়ে যদি সব মানুষের সমান সুযোগ, বিশেষ করে দরিদ্র, খেটেখাওয়া, প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের পতন ঠেকানো না যায় তা হলে ভোটের উৎসব সর্বজনীন হবে না। অতীতে এমনটিই দেখা গেছে। তারপর বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারায়, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ভোটের ইচ্ছা প্রবল হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী, প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত মানুষ অতীতের হতাশা-বঞ্চনার পরও চান ভোট দিতে।
শ্রমজীবী মানুষ নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতারা মনে করেন অধিকার আদায়ে সুষ্ঠু ভোটের বিকল্প নেই। তবে ভোটই গণতন্ত্র, এমনটি নয়। রাষ্ট্রে শ্রমজীবী মানুষের সুযোগ না থাকলে, উৎসব করে ভোট করাও অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে। তাই সামনে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদেরে উপরই নির্ভর করে ভোটের উৎসব সর্বজনীন হবে কি না।
এদিকে বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ব্যয় বাড়তে দেখা গেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের উৎস এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তীব্র হয়েছে।
চলমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী বাজেট ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের ব্যয় শুরুতে ধরা হয়েছিল ২,৪০৬ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত হয়ে ৪,৭৬৯ কোটি টাকা হয়েছে (সূত্র: বিএসএস)।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা মতে, অনেক প্রার্থী হলফনামায় দেওয়া সীমার ১০-১১ গুণ বেশি টাকা খরচ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রার্থীপ্রতি ২৫ লাখ টাকা সীমা থাকলেও বাস্তবে ক্ষেত্রভেদে কয়েক কোটি থেকে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
সীমিত সম্পদের একটি দেশে কেবল সরকারে প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে গিয়ে এত টাকা খরচের নির্বাচন কীভাবে দেখছেন সুবিধাবঞ্চিত বা খেটে খাওয়া মানুষ। এই প্রতিবেদন তারই ভাষ্য।
রহিমা খাতুন, নারায়ণগঞ্জের ফুটপাতে চুড়ি বেচেন। তিনি বলেন, ‘সরকারের সাহায্য আমরা কখনোই পাই না। ভোট দিয়া সরকার বানাইলে কী উপকার হইবো। ভোট তো আগেও দিছি।’
শহরের সিটি পার্ক লাগোয়া পথ ধরে রিকশা চালাচ্ছিলেন রশিদ মিয়া। অনুরোধে রিকশা থামান। ভোট বিষয়ে জানতে চাইলে জানান, সবচেয়ে বড় সমস্যা বাজার করে খাওয়া। যে টাকা আয় হয়, তাতে সংসারের অর্ধেক বাজারও হয় না। তিনি মনে করেন কোনো সরকারের সসময় তিনি মনভরে বাজার করতে পারেননি, টাকার অভাবে। বলেন ‘জান নিয়ে টানাটানির মধ্যে কারে ভোট দিব, চিন্তা করতে পারছি না। তবে দেশে ভালো ভোট হোক, চান তিনি।
অনার্স শেষ করা রিদওয়ান বলেন, শিক্ষা শেষে চাকরি পাচ্ছি না। চাকরির জন্য অফিসে অফিসে ঘুরতে হচ্ছে। আমাদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন নেই। ভোটে যে-ই জিতুক, সেই সরকার যেন বেকারদের চাকরির ব্যবস্থা করে। তিনি ভোট দিতে যাবেন বলেও জানান।
পোশাক শ্রমিক রিনা আক্তার বলেন, ভোট দিয়া আইসা তো আবার মেশিনেই বসা লাগবে। আমাগো ভাগ্য কি আর বদলাবে। তবুও ভোট হোক, দেশ থেকে অশান্তি দূর হোক। আমাগো জীবন তো টেনেটুনেই যাবে।
দীর্ঘ সময় শ্রমজীবী মানুষ নিয়ে কাজ করা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পাটি- সিপিবি নেতা বিমল কান্তি দাস বলেন, এ দেশে যারা ক্ষমতায় আসেন তারা শ্রমিকের স্বার্থ দেখন না। ভোট এলে পেশিশক্তি, কালোটাকার প্রভাব শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করে। তারপরও আমি আশাবাদী এবার শ্রমজীবী মানুষ তাদের মিত্র বেছে নেবেন এবং আমাদের প্রার্থীকে ভোট দেবেন।
টেনেটুনে জীবন চালানো এসব মানুষের কথা হয়তো এবারও ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠবে না। কারণ সারা দেশে এখন নির্বাচনী দামামা। ভোট-উৎসবের আমেজ। সুষ্ঠু ভোটই বড় কথা। সরকারের তরফে বলা হচ্ছে- উৎসবমুখর ভোট হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই ভোট রাষ্ট্রের অনেক পরিবর্তন আনবে।
তবে ভোটে যা-ই হোক, দেশের অর্থনীতির মূল ধারায় যদি খেটে খাওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্থান না হয়, ভোটের উৎসব হয়ে যেতে পারে একপেশে। এতে সমাজের একটি বড় অংশ হবে ভোটবিমুখ।
অন্য দিকে ভোট দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে যে, দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে- সেই দায় আরও ক্ষীণ হতে থাকবে। সব মানুষকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন থেকে যাবে অধরা।
লোড হচ্ছে...