নারায়ণগঞ্জ
মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ
NewsView

রফিউর রাব্বি
একাত্তরে যুদ্ধকালীন গোটা নয় মাস নিরীহ মানুষের উপর পাক সেনারা চালায় বর্বরোচিত নির্মম নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ। সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও রয়েগেছে তাদের সে নির্যাতন ও বর্বরতার অসংখ্য চিহ্ন। নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত হয়েছে ১০৯টি গণহত্যা, রয়েছে ৩৩টি বধ্যভূমি ও গণকবর, রয়েছে ৪৬টি নির্যাতনকেন্দ্র। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরপরাধ নিরীহ মানুষদের নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তবে সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ও গৌরবের সে উপাখ্যান এখনো সংগ্রহ করা যায় নি, নেই কোন শহীদের তালিকা।
প্রথম প্রতিরোধ ও হত্যাযজ্ঞ
১৯৭১ এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ভাষণের পরদিন লন্ডনের ডেইলী টেলিগ্রাম পত্রিকায় ‘পুরাতন পাকিস্তানের ইতি’ শিরোনামে সাংবাদিক ডেভিড লুসাক একটি প্রতিবেদনে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার সুস্পষ্ট ভবিষ্যত বাণী করেন। তখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমই বিশ্ববাসীর কাছে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার সংবাদটি তুলে ধরছিল। এখানে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক ব্যর্থ হলে এদেশের মানুষ বুঝে নেয় যে, পশ্চিমাদের সাথে অনিবার্য এক যুদ্ধের মুখোমুখি এসে আমরা দাঁড়িয়েছি।
২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসকে সামনে রেখে দিনটি বিভিন্ন দল বিভিন্নভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকরে। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাাম পরিষদ প্রতিরোধ দিবস, ভাষানী ন্যাপ স্বাধীন পূর্ব বাংলা দিবস, জাতীয় লীগ স্বাধীন বাংলাদেশ দিবস, কৃষক শ্রমিক পার্টি লাহোর প্রস্তাব দিবস ইত্যাদি। ঐদিন ভোর ৫টায় বঙ্গবন্ধু নিজে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পাতাকা উত্তোলন করেন। ঐদিন এ দেশের বিভিন্ন ভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। এখানে অবস্থানরত বিভিন্ন দুতাবাসও ঐদিন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। টেলিভিসনে ঐদিন পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শিত হয় নাই। ঐ দিনটি সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের কুখ্যাত জেনারেল রাও ফরমান আলী বলেছেন, ‘২৩মার্চ ছিল শেখ মুজিবের আন্দোলনের সর্বোচ্চ পর্যায়। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক দিন। পাকিস্তান দিনটিকে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করতো। অথচ শেখ মুজিব দিনটিকে ‘লাহোর প্রস্তাব দিবস’ হিসেবে উদযাপন করেছিল।’ সে দিন থেকেই মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জে ২৫ মার্চ সকালে তৎকালীন ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একটি দল নারায়ণগঞ্জ কোর্টে অবস্থিত মালখানা থেকে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য যান। মালখানার বাঙালী কর্মকর্তারাও সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন। সে সময় কোর্টে কর্মরত নুরু মিয়া চৌধুরী বাচ্চু তাদের সহায়তা করেন। তারা ছাত্রদের বলেন, আমরা তোমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে পারবো না, তবে তোমরা লুট করে নিয়ে যাও আমরা বাধা দেব না। ছাত্ররা মালখানা ভেঙ্গে সেখান থেকে ১২১টি রাইফেল ও ৬ পেটি গুলি সংগ্রহ করেন। অস্ত্রগুলো প্রথমে ২নং রেল গেট সংলগ্ন রহমতুল্লাহ ক্লাবে জমা করা হয়, জায়গাটিকে নিরাপদ মনে না হলে পরে সেখান থেকে অস্ত্রগুলো দেওভোগ জনকল্যাণ সমিতিতে নিয়ে রাখা হয়। ঐদিন বিকেল থেকেই তাঁরা দেওভোগ নাগবাড়ি মাঠে অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ শুরু করেন। ছাত্রদের সাথে যোগ দেন সাধারণ জনতা।
২৫ মার্চ রাতেই ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। সে রাতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ পত্রিকা পরবর্তীতে প্রকাশ করে ‘শুধুমাত্র ২৫ মার্চ রাতেই বাংলাদেশে ১ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।, যা গণহত্যার ইতিহাসে এক জঘন্যতম ভয়াবহ ঘটনা।’ পাকিস্তান সরকার ‘পূর্ব পাকিস্তান সংকট’ শিরোনামে তাদের শ্বেতপত্রে পরবর্তীতে উল্লেখ করে ‘১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবন নাশ হয়েছে।’
২৬ মার্চ সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে- যেকোন সময় পাক হানাদার বাহিনী এখানে চলে আসবে এবং এখানেও তারা হত্যাযজ্ঞ চালাবে। ২৫ মার্চ দিন গত রাত থেকেই এখানে ব্যারিকেড স্থাপনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে আলীগঞ্জ, পাগলা, ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জের সমস্ত রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরী করা হয়। আলীগঞ্জ, পাগলা, ফতুল্লায় বড় বড় গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। রেল ষ্টেশন থেকে ওয়াগন এনে চাষাঢ়া ও ২নং রেল লাইনের উপরে রাখা হয়। তখন মন্ডলপাড়া ও সলিমুল্লাহ রোডের ২টি কারখানায় ১টি চিনি কলের জন্য ট্রলি তৈরি হচ্ছিল। ছাত্র-জনতা সেই ট্রলিগুলো এনে রাস্তায় ফেলে ডায়মন্ড হল মোড় থেকে চাষাঢ়া রেললাইন পর্যন্ত ব্যারিকেড তৈরী করে। বিক্ষুব্ধজনতা ফতুল্লা থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত রেল লাইনের স্লিপার তুলে ফেলে; যাতে রেল পথেও পাক বাহিনী নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করতে না পারে। ঐদিন দুপুর থেকেই নারায়ণগঞ্জবাসী শহর ছাড়তে শুরু করে।
২৭ মার্চ ভোর রাতে পাক বাহিনী ট্যাংক, কামান ও আধুনিক অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে রওনা হয়। তারা ব্যারিকেড তুলে তুলে আস্তে আস্তে নারায়ণগঞ্জের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। রহমতউল্লা ক্লাব তখন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সকাল ১০ টার দিকে ক্যাম্পে খবর আসে পাক সেনারা নারায়ণগঞ্জের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পাক বাহিনী ঢাকার টিকাটুলি থেকেই গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পাগলা অঞ্চলে প্রথমে তারা এক নৈশ-প্রহরীকে হত্যা করে। সকাল ১১টার দিকে পাক বাহিনী পঞ্চবটীর কাছাকাছি চলে আসে। এদিকে সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ছাত্র জনতা ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি গ্রুপ মাসদাইর কবরস্থানের কাছে অবস্থান নেয়, একটি গ্রুপ মাসদাইর খায়ের সাহেবের বাড়ীর কাছে ও অপর গ্রুপটি চাঁদমারী টিলাতে অবস্থান গ্রহণ করে- যাতে রেল পথেও তাদের প্রতিরোধ করা যায়। অন্যদিকে ছাত্রদের একটি দল অস্ত্র সংগ্রহ করতে থাকে। বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁদের সংগ্রহে থাকা বন্দুক, পিস্তল রহমতউল্লা ক্লাব ক্যাম্পে এসে জমা দিতে থাকে। বহু পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্য তাঁদের অস্ত্র দেশের যুদ্ধের জন্য ক্যাম্পে এসে জমা দেন।
একদিকে ট্যাংক কামান ও ভারী অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে পাক বাহিনী অপরদিকে শুধু রাইফেল আর দোনালা বন্দুক নিয়ে তাদের প্রতিরোধের জন্য ছাত্র-জনতা। পাক বাহিনী পঞ্চবটী থেকে শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে কবরস্থানের কাছে অবস্থান নেয়া গ্রুপটি অতর্কিতে পাক বাহিনীর দিকে গুলি ছুড়তে থাকে। এতে একজন পাক সেনা গুলিবিদ্ধ হলে পাক বাহিনীর একটি জীপ তাকে নিয়ে ঢাকায় রওনা হয়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে পাক সেনারা সেখানেই থমকে যায় এবং তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে। ট্যাংক সামনে রেখে জীপ থেকে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। ছাত্রদের গ্রুপটি পেছনে হটতে থাকে এবং চাষাঢ়া এসে অবস্থান নেয়। পাক বাহিনী গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। বিকেল ৩টার দিকে তারা মাসদাইর এলাকায় পৌঁছে গানপাউডার দিয়ে বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাড়িঘর থেকে ধরে এনে গুলি করে নির্বিচারে হত্যা করে নিরীহ সাধারণ মানুষকে। তারা এম.এ ছাত্তারের (পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের উপদেষ্টা) জেষ্ঠ্য পুত্র তৌফিক সাত্তার ও তৌফিক সাত্তারের বন্ধু জালাল আহমেদকে হত্যা করে। মাসদাইরে জামিরুল হকের বাসায় ঢুকে তাঁকে তাঁর স্ত্রী সহ পুরো পরিবারকে হত্যা করে। হানাদার বাহিনী বাসায় ঢুকে হত্যা করে আব্দুস সাত্তারকে ও তাঁর বাড়ির দারোয়ানকে। মসজিদ পবিত্র স্থান, এখানে পাক সেনারা হামলা করবেনা ভেবে ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে অনেকে মাসদাইরে ‘হানজত আলীর মসজিদ’ নামে একটি মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নেন। হানাদার বাহিনী বুট পায়ে সে মসজিদে ঢুকে ভেতর থেকে প্রায় ২০ জনকে ধরে এনে বাইরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে তাঁদের হত্যা করে। এখানে শহিদ হন ব্যাংক কর্মকর্তা শরিয়তউল্লাহ (পিতা-আশেক আলী মাতব্বর), জসিমউল হক ও তার স্ত্রী লায়লা হক, মোঃ জিন্নাহ (পিতা-পাগলা বাদশা), ফটিক চাাঁন মিয়া (পিতা-বেলায়েত আলী), ফকির চাঁন (পিতা-শ্যামা মুন্সী), সাচ্চু মিয়া (পিতা-সামসুল হুদা), ড্রাইভার নুরুল ইসলাম, বেলায়েত হোসেন, উত্তর মাসদাইরের ওমর আলী, আব্দুস সামাদ, চুন্নু মিয়া, আব্দুল লতিফ, দিল মোহাম্মদ, আব্দুল মজিদ, আক্তার হোসেন, মোঃ মুকুল, আব্দুস সাত্তার নামে আরও এক জন। তারা অবাঙ্গালী দুই সহোদর আলী আক্তার ও আলী আহাম্মদ কে হত্যা করে। বাড়িঘরে দাউ দাউ আগুন জ্বলতে থাকে। আগুনে পুড়ে শহিদ হন সমিরউদ্দিন সারেং এর স্ত্রী তাহেরুন্নেছা।
ঐদিন পাক বাহিনী শহরে প্রবেশ না করে রাতে নারায়ণগঞ্জ সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ে অবস্থান নেয়। আর এ সময়ের মধ্যে শহরের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ^রী নদী পার হয়ে বন্দর, নবীগঞ্জ, কলাগাছিয়া, আলীরটেক, বক্তাবলী, ডিগ্রিরচর, মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর ও বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শহর ছেড়ে চলে যান।
২৮ মার্চ পাক বাহিনী পূনরায় আক্রমণ শুরু করে। সকাল প্রায় ১০টার দিকে তাদের একটি দল পশ্চিম দিক থেকে চাষাঢ়া ও অন্য একটি দল চাঁদমারী ঘুরে আক্রমনে এগিয়ে আসে। দুইদিকের আক্রমনে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ দলটি পেছনে হঠতে থাকে। পাক বাহিনী বেলা ১২টার দিকে চাষাঢ়া অতিক্রম করে শহরে প্রবেশ করে। মূল সড়ক দিয়ে চলতে চলতে তারা নিতাইগঞ্জ পুলে এসে অবস্থান নেয়। পথে যেতে তারা দুইপাশের ভবন বাড়িঘর মেশিনগান ও কামানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে। তারা প্রেসিডেন্ট রোডের মোড়ে পাকবে ভবন, হাজেরা কুটির, পৌরসভা ভবন কামানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ঐ রাতেই তারা ক্যাম্প হিসেবে পরিচালিত রহমতউল্লা ক্লাব, দেওভোগের সমাজ উন্নয়ন ক্লাব সহ বহু বাড়িঘর গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। আর নারায়ণগঞ্জে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। নৃশংস সে হত্যাযজ্ঞ চলে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত।
বন্দর গণহত্যা
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলা কালে দেশের বিভিন্ন প্রন্তে সংঘটিত গণহত্যার প্রকৃত তথ্য ও চিত্র এখনো আমাদের মূল ইতিহাসের সাথে যুক্ত হতে পারে নি। এ সব তথ্য ও সংবাদ এখনো অনুদ্ঘাটিত এবং অবহেলিত। আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা ত্রিশলক্ষ বলেছি সত্য; কিন্তু দেশের সকল গণহত্যার প্রকৃত তথ্য তুলে আনলে এ সংখ্য যে তার চেয়েও অনেক বেশি হবে সে বিষয়ে এখন অনেক গবেষকই একমত। কয়েকদিন আগে দেশের বিশটি জেলায় গণহত্যার পরিসংখ্যান সংবলিত একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানেও তারা গণহত্যার প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার ব্যপারে মত প্রকাশ করেছেন।
নারায়ণগঞ্জে অনেক গুলো গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। ৪ এপ্রিল বন্দরে সংঘটিত গণহত্যা এ সবের অন্যতম। যদিও জেলার প্রকৃত তথ্য এখনো অনুদ্ঘাটিত। নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দু’একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও, তা তথ্যবিকৃতি ও ভুল তথ্যে ত্রুটি যুক্ত। স্বল্পপরিশ্রমে ইতিহাস লিখনে যে বিচ্যূতি হয় এখানে তাই হয়েছে। তার পরেও শুরুটা যে হয়েছে, সেটাও কম কিসে।
শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ শহর, পূর্ব পাড়ে বন্দর। একসময় বন্দর পাটের কল, জাহাজ নির্মাণের ডকইয়ার্ড ও খাদ্য গুদামের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। কদম-রসুল দরগাহ্র কারনে আড়াই’শ বছর ধরে পূর্ব বঙ্গে বন্দর গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে ইংরেজ ও আর্মেনিয়দের মাঝেমধ্যে বিচরণ করতে দেখা গেলেও অবাঙালি বিহারিদের পদচারণা কখনোই ছিল না। কিন্তু সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পরে রেডক্রসের উদ্যোগে বন্দরের বিভিন্ন স্থানে অবাঙালি বিহারিদের রিফিউজি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। পরে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে এমন দাঁড়ায় যে কিছু কিছু পাড়া-মহল্লা ও এলাকা তারা দখলে নিয়ে নেয়।
বন্দর শহরতলি হলেও ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন জাতীয় সংগ্রামে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ষাটের দশকে আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে বন্দরের ছিল সাহসী ভূমিকা। সে সময় সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের মাধ্যমে বন্দরের যুবক ও সংস্কৃতি কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আইয়ূব খানের বিরুদ্ধে দেশবাসী রায় ঘোষণা করলে, এর কয়েকদিন পর একুশে ফেব্রুয়ারি সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের সদস্যরা বন্দরে বিভিন্ন বাড়ি-ঘর ও দোকান-পাটে কালো পতাকা উড়িয়ে দেন। বন্দরে বসবাসরত বিহারিদের নেতা আইয়ূব মাষ্টারের আইয়ূব রেস্টুরেন্টেও তখন ক্লাব সদস্যরা কালো পতাকা উড়িয়ে দেন। কিন্তু পতাকা উত্তোলনের কিছুক্ষণ পর আইয়ূব মাষ্টার কালো পতাকা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলে এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে। ক্লাব সদস্যদের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ জনতা আইয়ূব রেস্টুরেন্ট ও কনভেনশন মুসলিম লীগের সে সময়ের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ আলীর বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। যার ফলে সিরাজদ্দৌলা ক্লাব সদস্য ও এলাকার যুবকদের প্রতি বিহারি ও মুসলিম লীগের লোকদের ছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই আইয়ূব মাষ্টার ও মোহাম্মদ আলীর বাড়ি দু’টিই হয়ে উঠেছিল বন্দরে পাক সেনাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প।
একাত্তরে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে মার্চের ১৭-১৮ তারিখ সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের নেতৃত্বে বন্দরে প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। এ প্রতিরোধ কমিটি বিহারিদের কাছ থেকে প্রায় চল্লিশটি রাইফেল-বন্দুক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একটি অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলেন। ২৫ মার্চ টিক্কাখানরা যখন ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইটের নামে হাজার-হাজার নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে চলেছে; বন্দরে তখন সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের মাঠে মঞ্চস্থ হচ্ছে সাত্তার ভূইয়া রচিত ও এস এম ফারুক পরিচালিত ‘অমর বাঙালি’ নাটক। যে নাটক পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তখন বাঙালির রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এসব কারণে তখন বিহারিদের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল সিরাজদ্দৌলা ক্লাব।
একাত্তরের ৪ এপ্রিল ভোররাতে বিহারিদের সহায়তায় নবীগঞ্জঘাট ও দক্ষিণের কেরোসিনঘাট দিয়ে একসঙ্গে বন্দরে প্রবেশ করে পাক হানাদারবাহিনী। নবীগঞ্জ দিয়ে পাড় হওয়া গ্রুপটি ইস্পাহানী ও জেলেপাড়ার বহু বাড়ি-ঘর গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং এ এলাকা থেকে বহু লোককে ধরে বন্দর সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে নিয়ে হাজির করে। ক্লাব মাঠে আসতে পথের দু’পাশের অসংখ্য বাড়ি-ঘর পাক সেনারা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। কেরাসিনঘাট দিয়ে পাড় হওয়া গ্রুপটি ডকইয়ার্ডে উঠে সামনে অগ্রসর হয়ে হিন্দু-অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতে থাকে। লালজির আখড়া ও বৃন্দাবন আখড়া গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকে বহু লোককে ধরে সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে নিয়ে আসে। পাক সেনাদের উভয় গ্রুপই সকাল ন’টার মধ্যে ক্লাব মাঠে এসে পৌঁছে। সে সময় মাঠের ক্লাব ঘরে আশ্রয় নেয়া সাধারণ মানুষ ও ধরে আনা বন্দিদের মোট ৫৮ জনকে পাক সেনারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে প্রথমে গুলি করে হত্যা করে। পরে আশপাশের বাড়িঘর থেকে কাপড়-চোপড় ও মূলিবাঁশের বেড়া এনে লাশের উপরে ফেলে গানপাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সন্ধ্যার পূর্বে হানাদার বাহিনী শীতলক্ষ্যা পাড় হয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে চলে আসে। বন্দর বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। বাড়ি-ঘর ফেলে জ্ঞানশূন্য সমস্ত মানুষ দিগি¦দিক পালিয়ে যেতে থাকে। লাশের স্তূপ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসেন মুজিবুর রহমান কচি নামের এক কিশোর। পোড়া বাড়ি-ঘর, মৃত মানুষের গন্ধ আর স্বজনহারা মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে শীতলক্ষ্যার পূর্বপারের বাতাস। রাতেই বন্দরের বিভিন্ন এলাকা বিরান-ভূমিতে পরিণত হয়। রাত গভীর হলে সে ক্লাব মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এলাকাবাসী ৫৪ জন হিন্দু-মুসলমান শহিদদের একসাথে গণ-কবরে সমাহিত করেন। নির্জন নিস্তব্ধ সে কবরের পাশে সারা রাত জেগে থাকে দল বেঁধে অসংখ্য জোনাকি। ধ্বংসস্তুপ আর অগ্নিদগ্ধ বন্দরের পাড়ে আছরে পড়তে থাকে শীতলক্ষ্যার কালঢেউ সারা রাত ক্ষোভে, দুঃখে, বিদ্রোহে ভোরের সূর্যোদয় পর্যন্ত।
বক্তাবলী গণহত্যা
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই যেমনি গৌরবের তেমনি শোকের। প্রতিদিন অসংখ্য স্বজন হারিয়েছি আমরা, শত্রুকে পরাজিত করে ক্রমাগত এগিয়ে গিয়েছি বিজয়ের দিকে। একাত্তরে যুদ্ধকালীন গোটা নয় মাস নিরীহ মানুষের উপর পাক সেনারা চালায় বর্বরোচিত নির্মম নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ। সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও রয়েগেছে তাদের সে নির্যাতন ও বর্বরতার অসংখ্য চিহ্ন। নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত হয়েছে ১০৯টি গণহত্যা, রয়েছে ৩৩টি বধ্যভূমি ও গণকবর, রয়েছে ৪৬টি নির্যাতনকেন্দ্র। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরপরাধ নিরীহ মানুষদের নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তবে সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ও গৌরবের সে উপাখ্যান পুরোপুরি এখনো সংগ্রহ করা যায় নি, নেই কোন শহীদের তালিকা।
একাত্তরের ২৯ নভেম্বর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক শোক ও গৌরবের দিন। দিনটি বক্তাবলী গণহত্যা ও প্রতিরোধের দিবস হিসেবে পরিচিত। ২৫ মার্চ ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যার দুইদিন পর ২৭ মার্চ দুপুরে পাক সেনারা নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করতে গেলে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সে দিন শহরে না ঢুকে নারায়ণগঞ্জ সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ে রাত কাটিয়ে ২৮ মার্চ সকালে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শহরে ঢোকে হানাদার বাহিনী। যুদ্ধকালীন গোটা নয় মাস নিরীহ মানুষের উপর তারা চালায় বর্বরোচিত নির্মম নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ।
নারায়ণগঞ্জের পশ্চিমাঞ্চল ধলেশ্বরীর পাড় ধরে বক্তাবলীর বাইশটি গ্রাম। বক্তাবলী ও আলীরটেক দুটি ইউনিয়নের সমন্বয়ে বক্তাবলী পরগনা। তখন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জের দিকে চলে যাওয়ার সহজ ও নিরাপদ যাত্রাপথটি ছিল এই বক্তাবলী। বক্তাবলীর পূর্বে ও দক্ষিণে ধলেশ্বরী নদী আর উত্তরে বুড়িগঙ্গা। দক্ষিণ আমেরিকার আটলান্টিকের পাড়ে লম্বা সরু দেশ চিলির মতো এ বক্তাবলী। দুই নদীর মাঝখানে বক্তাবলীর বাইশটি গ্রাম যেন দুপুরের ঘাসের ওপর বিছিয়ে রাখা মায়ের ভেজা কাপড়।
২৯ নভেম্বর রাতে যখন ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা বক্তাবলী পরগনা; তখন নারায়ণগঞ্জ শহরের কয়েকজন রাজাকারের সহযোগিতায় মধ্যরাত সাড়ে তিনটায় পাকবাহিনী তিনদিন থেকে ঘিরে ফেলে গোটা বক্তাবলী। প্রথমে তারা গানবোট নিয়ে ধলেশ্বরী নদীর বুকে অবস্থান নেয়। সুবেহসাদেকের সময় বক্তাবলীর চরে গানবোট ভিড়িয়ে নদীর পাড়ে নামতে শুরু করে। সে দিন প্রচণ্ড কুয়াশার কারণে তারা গ্রামে অগ্রসর হতে সাহস করে না। সে সময় মুক্তারকান্দি প্রাইমারি স্কুল ও কানাইনগর হাই স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি ক্যাম্প ছিল। নদীর পাড় সংলগ্ন ডিক্রির চর মসজিদ ও বিভিন্ন বাড়িতে রাত কাটাতেন মুক্তিযোদ্ধারা। যার ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সে দিন পাকসেনাদের উপস্থিতি সাথে সাথেই টের পেয়ে যান এবং প্রতিরোধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অন্যদিকে কুয়াশা একটু কাটতে থাকলে কুঁড়ের পাড় অঞ্চলের নদীর কাছ থেকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে গ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে পাক সেনাবাহিনী। তখন সকাল প্রায় সাতটা। মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদারদের প্রতিরোধ শুরু করেন। এখানে উল্লেখ্য মাহফুজুর রহমান পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। প্রতিরোধের শুরুতেই পাঁচজন পাকসেনাকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধারা এবং আহত হয় বেশ কিছু পাকসেনা। পাকসেনারা পাঁচটি লাশ ও আহত দুই জনকে কাঁধে নিয়ে পিছু হটে। এখানে প্রায় দুই ঘণ্টা প্রতিরোধ যুদ্ধ চলে। এ দুই ঘণ্টা প্রতিরোধের কারণে বক্তাবলীর গ্রামগুলো থেকে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ তখন মুন্সিগঞ্জ ও বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হন। এর পরপরই পাকবাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রামগুলোর ওপর। পাকবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা বাধ্য হয়ে পিছু হটেন। আর তখনই শুরু হয় পাকবাহিনীর তাণ্ডব। তারা ডিক্রির চর নদীর পাড়ে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে একসাথে হত্যা করে চল্লিশ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে। লক্ষ্মীনগর কবরস্থানের কাছে খড়ের পাড়ার ভেতরে আশ্রয় নেয়া দলবদ্ধ গ্রামবাসীদের আগুন দিয়ে পুরিয়ে হত্যা করে। শীতের সকালে রাজাপুরের হলুদ সরিষা ক্ষেত লাল হয়ে ওঠে, পড়ে থাকে লাশের পর লাশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র শহীদুল্লাহ্, মুনীরুজ্জামানসহ বহু ছাত্র আর সাধারণ কৃষককে হত্যা করে ওরা। সে দিন বক্তাবলীতে ১৩৯ জনকে হত্যা করে পাক হানাদারবাহিনী। বক্তাবলী পরগনার বাইশটি গ্রামই গানপাউডার দিয়ে বিকেলের মধ্যেই জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
দেশে যে কয়টি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে বক্তাবলী তার মধ্যে অন্যতম। এখানে প্রতিরোধ হয়েছে, পাকসেনাদের হত্যা করা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হয়েছেন। অথচ নির্মম আমাদের বাস্তবতা! আজ তিপ্পান্ন বছর পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ছাত্রদের তালিকায় যেমনি এ বক্তাবলীর শহীদদের নাম নেই, স্থানীয় জেলা প্রশাসনের শহীদদের তালিকাতেও এ ১৩৯ জনের একজনেরও নাম নেই। অথচ এ একটি মাত্র অঞ্চল যেখানে তখন একজনও রাজাকার বা স্বাধীনতা-বিরোধী ছিলেন না। এ বাইশটি গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই গ্রামবাসী মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস নিজেরা খেয়ে না খেয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও আশ্রয় নেয়া মানুষদের খাইয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন। এ গ্রামগুলোর ছাত্র, যুবক, চাষাভূষা- প্রতিটি মানুষই ছিলেন প্রকৃত অর্থে মুক্তিযোদ্ধা। বক্তাবলীর সন্তানহারা, পিতাহারা, স্বজনহারা শহীদ পরিবারগুলো অর্ধশতাব্দী ধরে বয়ে চলেছে সেই ক্ষত, এখনও তাদের বুকফাটা আর্তনাদ, আহাজারি।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ৫০ শতাংশ সত্যও এখনো উদঘাটিত হয়নি। এই সময়ে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছেন সকলেই রাজনীতির প্রয়োজনে নিজেদের মতো করে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান তৈরি করেছেন। আওয়ামী লীগ এত বড় একটি জনযুদ্ধকে দলীয় সম্পত্তি বানাতে গিয়ে গোটা মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করেছে। কেউবা মুক্তিযুদ্ধটাকে খণ্ডিত করে আদর্শগত কারণে এর সত্য উদঘাটনে থেকেছে সম্পুর্ণ উদাসিন। এত দিন মুক্তিযুদ্ধটাকে পণ্য বানিয়ে বেচা-কেনার বাজারে তুলে নতুন প্রজন্মের কাছে একে যেমনি অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক কখনোবা গুরুত্বহীন করে তোলা হয়েছে। আজকের প্রজন্ম দীর্ঘ দিন দেখেছে একাত্তরে বা তার পরে জন্ম নেয়া সনদধারি মুক্তিযোদ্ধারা দেশে সর্বশক্তিতে বলীয়ান- অথবা দেশে সকল অন্যায়, অনিয়ম, গুম-হত্যা, নির্যাতন, বিচারহীনতা, দুর্নীতি, অর্থপাচার সবই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বৈধ বলে চালিয়ে দেয়ার হীন-চক্রান্ত বিদ্যমান; তখন এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে বিবেকবান কিংবা নুন্যতম মানবিক চিন্তা সম্পন্ন কোন মানুষের থাকার কথা নয়। কিন্তু চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তীতে আমরা লক্ষ্য করছি একাত্তরে পরাজিত শক্তি আজকে নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান তৈরিতে মেতে উঠেছে। আজকে যেন পূর্বের মতো ইতিহাস বিকৃতির ধারাবাহিকতা ভিন্ন ভাবে শুরু হয়েছে।
আহমদ ছফা বলেছিলেন, একাত্তরে যারা একবার রাজাকার-আলবদরে নাম লিখিয়েছেন তারা সারা জীবনই রাজাকার আর স্বাধীনতা বিরোধী। কিন্তু যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বা ক্যাম্পে গিয়ে নাম লিখিয়েছেন তাঁরা সারাজীবনই মুক্তিযোদ্ধা নন। দেশের ক্রান্তিলগ্নে পদে পদে তাঁদের দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মুক্তিযোদ্ধা থাকতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ করেও যারা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী, দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থ বিরোধী অবস্থান নেন কিংবা দেশের বা দেশের মানুষের সংকটে, দুঃসময়ে নিশ্চুপ থাকেন তারা মুক্তিযোদ্ধা থাকেন না। শেকড় ছিন্ন কোন প্রাণি বা উদ্ভিদ যেমনি বাঁচে না, একাত্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এ ভূখণ্ডের কোন ইতিহাসকেও টেকানো যাবে না। আজকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরির চেয়ে জরুরি ছিল শহীদদের একটি তালিকা তৈরি করা। শহীদের সংখ্য নিয়ে বিতর্কে যেয়ে লাভ নেই। বিশে^ কোন গণহত্যার হিসেব পুরোপুরি নির্ভুল হয় নি। এইটির সাথে জড়িয়ে থাকে দুঃখ, ভালোবাসা, আবেগ আর স্বজন হারানোর বেদনা। একাত্তরকে কেবল যুক্তি দিয়ে শুধু নয়, হৃদয দিয়েও ধারণ করতে হবে।
রফিউর রাব্বি, লেখক ও শিল্পী
লোড হচ্ছে...