নারায়ণগঞ্জসদর
নারায়ণগঞ্জে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করে কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না
NewsView

নিউজ ভিউ
বড় গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিগত সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে এক নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রের স্বাধীন ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, যারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না, যারা সংবাদপত্রকে চাপে রাখতে চান, শেষ পর্যন্ত কিন্তু তারাই ক্ষমতায় থাকতে পারে না।
সংবাদপত্র শিল্পে পাঠক ও আয় কমে যাওয়ায় কঠিন সময় পাড় হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম আলো এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পত্রিকা, সবচেয়ে বেশি পাঠক আমাদের। সম্প্রতি বিডি কমিশন সার্ভে করে পেয়েছে, ছাপা এবং অনলাইন পাঠক মিলিয়ে ৫৭ শতাংশ পাঠক প্রথম আলো পাঠ করেন। ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলাতেই কিন্তু আমাদের কাগজ এক নম্বর। আগামীতেও তিনি পাঠকদের কাছে এমন সমর্থন প্রত্যাশা করেন।
চলতি বছরে আন্তর্জাতিকভাবে চারটি বড় স্বীকৃতি অর্জনের কথা উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, এর মধ্যে একটি ছিল গণঅভ্যুত্থানের সময় তরুণ, কিশোর ও ছাত্র পাঠকদের সঙ্গে যুক্ত করার কৌশলের জন্য। তিনি এই স্বীকৃতির সম্মান পাঠকদের সঙ্গেও ভাগ করে নিতে চান কারণ এর পেছনে পাঠকদের ভূমিকা আছে।
তিনি হকার ও বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ২৭ বছর ধরে আমরা একটা নীতি ধারাবাহিকভাবে মেনে চলেছি। প্রথম থেকে আমাদের নীতি ছিল যে আমরা সত্য প্রকাশ করব, দল নিরপেক্ষ স্বাধীন সংবাদপত্র হবো আর অবশ্যই আমাদেরকে নিজের আয়ে পত্রিকাটাকে চলতে হবে, যেন আমরা শুধু বিজ্ঞাপনদাতা বা মালিকের উপর নির্ভরশীল না হয়ে যাই।
দল নিরপেক্ষ স্বাধীন সাংবাদিকতা করার কারণে বিগত ২৭ বছর ধরে নানা সময়ে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার ভোরের কাগজের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপরে আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছিল। আমরা প্রথম আলো করলাম ৯৮ সালে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০০ সনে আমাদের প্রথম আলো অনলাইন সংখ্যা বন্ধ করে দিল এবং সকল সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিল। তারপর আবার ২০০১ সনে বিএনপি সরকার আসলো। তখন আবার সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিল। এভাবে সামরিক, রাজনৈতিক সরকারের সময়গুলোতে আমাদের একটা চাপের ও ভয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
বিগত ১৬ বছরের তীব্র চাপের চিত্র তুলে ধরে মতিউর রহমান বলেন, এই সময়টা আমরা টিকে ছিলাম। সাহস করে টিকে ছিলাম। ভালো করেছি। ভয়, মামলা মোকদ্দমা, প্রচারে বাধা দেওয়া, সরকারি বিজ্ঞাপন শুধু নয়, তখন কিন্তু ব্যক্তি খাতের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ৪৯টি বড় কোম্পানি গত জুলাই মাসের আগে ১২ বছর কোনো বিজ্ঞাপন আমাদের দিতে পারেনি।
তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত একটি ছোট্ট সংবাদকে কেন্দ্র করে আইসিটিভিতে তাঁর ও রিপোর্টারের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয় এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর পাশাপাশি প্রকাশ্যে সাবেক সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে, 'প্রথম আলো আওয়ামী লীগের শত্রু, প্রথম আলো গণতন্ত্রের শত্রু, প্রথম আলো দেশের শত্রু।' মতিউর রহমান আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী শুধু এতেই ক্ষান্ত হননি, তিনি প্রথম আলোর মালিকানা বদলে ফেলার জন্য প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করেছিলেন এবং সম্পাদকের পরিবর্তন করার জন্য যতদূর সম্ভব চেষ্টা তিনি করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "যদি জুলাই-আগস্টের পরিবর্তন না হতো, তাহলে হয়তো প্রথম আলোর মালিকানা থাকতো না, আমি এখনো সম্পাদক থাকতাম না।" তবে এসব কিছুর মধ্যেও জনগণের সমর্থন পাওয়ায় তাঁরা টিকে আছেন এবং ভবিষ্যতেও টিকে থাকবেন বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
দেশের মানুষের সত্য তথ্য জানার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি ইতিমধ্যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার প্রতি তাদের আস্থা প্রকাশ করেছেন। তিনি আশা করেন, নির্বাচনের পরেও এই অবস্থান বজায় থাকবে।
দেশের একটি বড় পরিবর্তন হয়ে গেছে এবং মানুষ নতুন করে ভাবার চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যক্তির ভূমিকা, দলের ভূমিকা, নানান শ্রেণী পেশার ভূমিকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে অনেক বাড়াবাড়ি, অপতথ্য ও অপব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে নতুন করে ভাবা ও সংশোধনের সুযোগ আছে। জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, অসাম্প্রদায়িকতা এই বিষয়গুলি নিয়েও নানা আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে একটা নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, "আমাদের অবশ্যই সত্যিকার অর্থে জাতীয় ঐক্যের দিকে ধীরে ধীরে যাওয়ার চেষ্টা করা দরকার। এখনো কিন্তু আমাদের মধ্যে সেই বিভক্তি, দলাদলি প্রকটভাবে রয়েছে। এইভাবে কিন্তু একটা সমাজ একটা রাষ্ট্র চলতে পারে না।" স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও কিন্তু আমাদের জাতির শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ব্যাংক ব্যবস্থা, নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোতে আমরা খুব ভালো করতে পারছি না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মতিউর রহমান বলেন, নির্বাচন ছাড়া আমাদের সামনে দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নাই। নির্বাচন হতেই হবে। তিনি বলেন, অনেকে অনেক পরিবর্তনের কথা বললেও, এখনো বিশ্বে সংসদীয় গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো কোনো ব্যবস্থা কিন্তু গড়ে ওঠেনি।
তিনি মনে করেন, একটি দল নির্বাচন কমিশনে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ভালো ফল দেবে না এবং নির্বাচন না হওয়া মানে একটা বড় রকমের নতুন সংকট তৈরি হবে। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার জন্যও আমাদের নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিদেশী বিনিয়োগের খুব খারাপ অবস্থা, কারণ অনির্বাচিত সরকারের উপরে বিদেশীদের কোনো আস্থা নাই। তারা অপেক্ষা করে আছেন আগামীতে একটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটা নির্বাচিত সরকার হলে তারা এই বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহিত হবেন। তিনি বলেন, "আমরা চাই একটা সুস্থ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নির্বাচনটা হোক। এটা বর্তমান সরকারের বড় দায়িত্ব।" তিনি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি আবেদন জানান, যেন তারা ভালো নির্বাচনের একটা পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারবে।
সমালোচকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, যারা বলতে চায় যে আমাদের একটি বিশেষ এজেন্ডা আছে, বিশেষ লক্ষ্য উদ্দেশ্য আছে, আমরা বলি—আমাদের একটাই লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সত্য প্রকাশ করা, স্বাধীন সাংবাদিকতা করা। আমরা সব অবস্থাতে দেশের মঙ্গল চাই, মানুষের কল্যাণ চাই।
দেশের মঙ্গল ও মানুষের কল্যাণের জন্য প্রথম আলো বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করে। এর মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণিত অলিম্পিয়াড, জাতীয় বিতর্ক, জাতীয় ভাষা প্রতিযোগিতা, সেরা শিক্ষক সম্মাননা, সেরা কৃষক সম্মাননা, সেরা খেলোয়াড়, এবং ৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ফুটবল প্রতিযোগিতা ও শিল্পী পুরস্কার প্রদান অন্যতম। এই সব কাজের লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের ভালো কল্যাণ।
অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার বক্তাবলী গণহত্যায় শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
জুলাই অভ্যুত্থান নারায়ণগঞ্জের সংগঠক ও ছাত্রফেডারেশন নেতা ফারহানা মানিক বলেন, প্রথম আলোকে আমরা পত্রিকার চেয়ে আমাদের লড়াইয়ের সঙ্গী হিসেবে বেশি পেয়েছি। এসময় তিনি জানতে চান প্রথম আলো তার বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা ধরে রাখবে কি না।
জবাবে মতিউর রহমান বলেন, "আমরা এটা বলতে পারি যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোন ভুল তথ্য যাতে না যায় এদিকে আমরা খুব শক্ত নজরদারী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। একটি সংবাদ একজন না, দুইজন, তিনজন না দেখলে আমরা ছাড়তে দিই না। আমি অধিকাংশ সংবাদ দেখার চেষ্টা করি। আমি আপনাদের এই আশ্বাস দিতে পারি যে, উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ প্রকাশ বা ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এ ধরনের সংবাদ থেকে আমরা বিরত থাকব।"
এছাড়া, পত্রিকার পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার জন্য শিশুদের উপযোগী পাতা প্রকাশের জন্য মতিউর রহমানের কাছে দাবি জানান নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন।
বড় গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিগত সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে এক নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রের স্বাধীন ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, যারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না, যারা সংবাদপত্রকে চাপে রাখতে চান, শেষ পর্যন্ত কিন্তু তারাই ক্ষমতায় থাকতে পারে না।
সংবাদপত্র শিল্পে পাঠক ও আয় কমে যাওয়ায় কঠিন সময় পাড় হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম আলো এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পত্রিকা, সবচেয়ে বেশি পাঠক আমাদের। সম্প্রতি বিডি কমিশন সার্ভে করে পেয়েছে, ছাপা এবং অনলাইন পাঠক মিলিয়ে ৫৭ শতাংশ পাঠক প্রথম আলো পাঠ করেন। ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলাতেই কিন্তু আমাদের কাগজ এক নম্বর। আগামীতেও তিনি পাঠকদের কাছে এমন সমর্থন প্রত্যাশা করেন।
চলতি বছরে আন্তর্জাতিকভাবে চারটি বড় স্বীকৃতি অর্জনের কথা উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, এর মধ্যে একটি ছিল গণঅভ্যুত্থানের সময় তরুণ, কিশোর ও ছাত্র পাঠকদের সঙ্গে যুক্ত করার কৌশলের জন্য। তিনি এই স্বীকৃতির সম্মান পাঠকদের সঙ্গেও ভাগ করে নিতে চান কারণ এর পেছনে পাঠকদের ভূমিকা আছে।
তিনি হকার ও বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ২৭ বছর ধরে আমরা একটা নীতি ধারাবাহিকভাবে মেনে চলেছি। প্রথম থেকে আমাদের নীতি ছিল যে আমরা সত্য প্রকাশ করব, দল নিরপেক্ষ স্বাধীন সংবাদপত্র হবো আর অবশ্যই আমাদেরকে নিজের আয়ে পত্রিকাটাকে চলতে হবে, যেন আমরা শুধু বিজ্ঞাপনদাতা বা মালিকের উপর নির্ভরশীল না হয়ে যাই।
দল নিরপেক্ষ স্বাধীন সাংবাদিকতা করার কারণে বিগত ২৭ বছর ধরে নানা সময়ে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার ভোরের কাগজের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপরে আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছিল। আমরা প্রথম আলো করলাম ৯৮ সালে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০০ সনে আমাদের প্রথম আলো অনলাইন সংখ্যা বন্ধ করে দিল এবং সকল সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিল। তারপর আবার ২০০১ সনে বিএনপি সরকার আসলো। তখন আবার সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিল। এভাবে সামরিক, রাজনৈতিক সরকারের সময়গুলোতে আমাদের একটা চাপের ও ভয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
বিগত ১৬ বছরের তীব্র চাপের চিত্র তুলে ধরে মতিউর রহমান বলেন, এই সময়টা আমরা টিকে ছিলাম। সাহস করে টিকে ছিলাম। ভালো করেছি। ভয়, মামলা মোকদ্দমা, প্রচারে বাধা দেওয়া, সরকারি বিজ্ঞাপন শুধু নয়, তখন কিন্তু ব্যক্তি খাতের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ৪৯টি বড় কোম্পানি গত জুলাই মাসের আগে ১২ বছর কোনো বিজ্ঞাপন আমাদের দিতে পারেনি।
তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত একটি ছোট্ট সংবাদকে কেন্দ্র করে আইসিটিভিতে তাঁর ও রিপোর্টারের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয় এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর পাশাপাশি প্রকাশ্যে সাবেক সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে, 'প্রথম আলো আওয়ামী লীগের শত্রু, প্রথম আলো গণতন্ত্রের শত্রু, প্রথম আলো দেশের শত্রু।' মতিউর রহমান আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী শুধু এতেই ক্ষান্ত হননি, তিনি প্রথম আলোর মালিকানা বদলে ফেলার জন্য প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করেছিলেন এবং সম্পাদকের পরিবর্তন করার জন্য যতদূর সম্ভব চেষ্টা তিনি করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "যদি জুলাই-আগস্টের পরিবর্তন না হতো, তাহলে হয়তো প্রথম আলোর মালিকানা থাকতো না, আমি এখনো সম্পাদক থাকতাম না।" তবে এসব কিছুর মধ্যেও জনগণের সমর্থন পাওয়ায় তাঁরা টিকে আছেন এবং ভবিষ্যতেও টিকে থাকবেন বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
দেশের মানুষের সত্য তথ্য জানার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি ইতিমধ্যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার প্রতি তাদের আস্থা প্রকাশ করেছেন। তিনি আশা করেন, নির্বাচনের পরেও এই অবস্থান বজায় থাকবে।
দেশের একটি বড় পরিবর্তন হয়ে গেছে এবং মানুষ নতুন করে ভাবার চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যক্তির ভূমিকা, দলের ভূমিকা, নানান শ্রেণী পেশার ভূমিকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে অনেক বাড়াবাড়ি, অপতথ্য ও অপব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে নতুন করে ভাবা ও সংশোধনের সুযোগ আছে। জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, অসাম্প্রদায়িকতা এই বিষয়গুলি নিয়েও নানা আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে একটা নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, "আমাদের অবশ্যই সত্যিকার অর্থে জাতীয় ঐক্যের দিকে ধীরে ধীরে যাওয়ার চেষ্টা করা দরকার। এখনো কিন্তু আমাদের মধ্যে সেই বিভক্তি, দলাদলি প্রকটভাবে রয়েছে। এইভাবে কিন্তু একটা সমাজ একটা রাষ্ট্র চলতে পারে না।" স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও কিন্তু আমাদের জাতির শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ব্যাংক ব্যবস্থা, নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোতে আমরা খুব ভালো করতে পারছি না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মতিউর রহমান বলেন, নির্বাচন ছাড়া আমাদের সামনে দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নাই। নির্বাচন হতেই হবে। তিনি বলেন, অনেকে অনেক পরিবর্তনের কথা বললেও, এখনো বিশ্বে সংসদীয় গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো কোনো ব্যবস্থা কিন্তু গড়ে ওঠেনি।
তিনি মনে করেন, একটি দল নির্বাচন কমিশনে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ভালো ফল দেবে না এবং নির্বাচন না হওয়া মানে একটা বড় রকমের নতুন সংকট তৈরি হবে। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার জন্যও আমাদের নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিদেশী বিনিয়োগের খুব খারাপ অবস্থা, কারণ অনির্বাচিত সরকারের উপরে বিদেশীদের কোনো আস্থা নাই। তারা অপেক্ষা করে আছেন আগামীতে একটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটা নির্বাচিত সরকার হলে তারা এই বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহিত হবেন। তিনি বলেন, "আমরা চাই একটা সুস্থ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নির্বাচনটা হোক। এটা বর্তমান সরকারের বড় দায়িত্ব।" তিনি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি আবেদন জানান, যেন তারা ভালো নির্বাচনের একটা পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারবে।
সমালোচকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, যারা বলতে চায় যে আমাদের একটি বিশেষ এজেন্ডা আছে, বিশেষ লক্ষ্য উদ্দেশ্য আছে, আমরা বলি—আমাদের একটাই লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সত্য প্রকাশ করা, স্বাধীন সাংবাদিকতা করা। আমরা সব অবস্থাতে দেশের মঙ্গল চাই, মানুষের কল্যাণ চাই।
দেশের মঙ্গল ও মানুষের কল্যাণের জন্য প্রথম আলো বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করে। এর মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণিত অলিম্পিয়াড, জাতীয় বিতর্ক, জাতীয় ভাষা প্রতিযোগিতা, সেরা শিক্ষক সম্মাননা, সেরা কৃষক সম্মাননা, সেরা খেলোয়াড়, এবং ৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ফুটবল প্রতিযোগিতা ও শিল্পী পুরস্কার প্রদান অন্যতম। এই সব কাজের লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের ভালো কল্যাণ।
অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার বক্তাবলী গণহত্যায় শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
জুলাই অভ্যুত্থান নারায়ণগঞ্জের সংগঠক ও ছাত্রফেডারেশন নেতা ফারহানা মানিক বলেন, প্রথম আলোকে আমরা পত্রিকার চেয়ে আমাদের লড়াইয়ের সঙ্গী হিসেবে বেশি পেয়েছি। এসময় তিনি জানতে চান প্রথম আলো তার বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা ধরে রাখবে কি না।
জবাবে মতিউর রহমান বলেন, "আমরা এটা বলতে পারি যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোন ভুল তথ্য যাতে না যায় এদিকে আমরা খুব শক্ত নজরদারী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। একটি সংবাদ একজন না, দুইজন, তিনজন না দেখলে আমরা ছাড়তে দিই না। আমি অধিকাংশ সংবাদ দেখার চেষ্টা করি। আমি আপনাদের এই আশ্বাস দিতে পারি যে, উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ প্রকাশ বা ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এ ধরনের সংবাদ থেকে আমরা বিরত থাকব।"
এছাড়া, পত্রিকার পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার জন্য শিশুদের উপযোগী পাতা প্রকাশের জন্য মতিউর রহমানের কাছে দাবি জানান নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন।
লোড হচ্ছে...