মতামত
থিসিউসের নৌকা ও একাত্তরের চেতনা
NewsView

রহমান সিদ্দিক
‘একাত্তরের চেতনা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’-এসব শব্দবন্ধ এখন অচ্ছুৎ বা অনেকটা গালিতে রূপ নিয়েছে,এমন নমুনা দেখা যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেই মানুষ একটু আঁড় চোখে তাকায়, লোকটা দোসর-টোসর কেউ না তো! দেশের মানুষকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এর জন্য দায়ী। ব্যুৎপত্তিগতভাবে অনেক সুন্দর শব্দ কালে কালে মানুষের মুখে মুখে ফিরে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে কদর্য অর্থে রূপ নিয়েছে- এমন উদাহরণ ব্যাকরণে ভুরিভুরি। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ও অর্থ পরিবর্তন বা সিমান্টিক্স চেইঞ্জ ঘটেছে বিগত শাসকদের অতিকথনে।
রূপকথার ডাইনি যেমন মন্ত্র পড়ে মানুষকে ভেড়া বা গাধা বানিয়ে রাখত, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী বয়ানও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ মন্ত্র পড়ে বাংলাদেশের মানুষকে গাধা-ভেড়া বানিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। রূপকথায় কোনো এক রাজপুত্র এসে যেমন ডাইনির নাক কেটে দিয়ে, তাকে তাড়িয়ে গাধা-ভেড়াকে আবার মানুষ বানিয়েছেন, ২০২৪-এর জুলাইয়ে অভ্যুত্থানও আওয়ামী লীগ দেশের মানুষকে মুক্তি দিয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখনই অচ্ছুৎ হয়ে গেছে।
চেতনা নিয়ে এ যাবৎকালে দার্শনিকরা কম কালি খরচ করেননি। তবে সবচেয়ে যুৎসই বয়ানটা দিয়েছেন বোধ হয় ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ পল সার্ত্র। তাঁর ‘বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস’ কিতাবে সার্ত্র একটি ঘটনা বলেছেন। নিজের ভাষায় সেটা বলছি। ধরুন, কেউ একজন বেড়ার ফাঁক দিয়ে অন্যের ঘরে উঁকিঝুকি মারছে; ওই ঘরে কী হচ্ছে না হচ্ছে তার মজা নিচ্ছে। সে কিন্তু আসলে চেতনার জগতে নেই। মজা নেওয়াটাই তার কাছে সব। এখন কেউ একজন পেছন দিক থেকে তাকে দেখে ফেললেন। তখনই লোকটির চৈতন্য হলো, ‘হায়, আমি একি করছি’! তার মানে আমি কী করছি, এটা চেতনা নয়, আদার বা অপর দেখে ফেলছে আমি কী করছি, এটাই চেতনা। এই চেতনাকে সার্ত্র বলেছেন, অস্তিত্বের লজ্জা বা এক্সিটেনশিয়াল শেইম।
রাজনীতিতে এই শেইম বা লজ্জাশরম থাকাটা খুব জরুরি। বিগত সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ক্ষমতা, অর্থকড়ি সবই ছিল, ছিল না কেবল লজ্জাশরম। তারা ধারণা করেছিলেন, তাদের কেউ দেখছেন না। তা না হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামক জাবর কাটতে কাটতে একাত্তরের যেই মূল্যবোধ, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রটিকে তারা দাঁড় করাত না। জুলাই আন্দোলন আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে একাত্তরের সত্যিকারের চেতনা, সত্যিকারের মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা; একটি মানবিক বাংলাদেশের পথ নির্মাণ করা। কিন্তু দেখা গেল একটি পক্ষ একাত্তরকেই অস্বীকার করা শুরু করেছে। আবার একাত্তর গেল গেল বলে আরেক পক্ষ বেশ কান্নাকাটিও জুড়ে দিয়েছে। একাত্তর বড়, না চব্বিশ বড় সেই আলোচনাও নানা মহলে চওড়া হচ্ছে। এখন কোনটা বড় তার হয়তো একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে থিসিউসির নৌকার ধাঁধাটি থেকে।
এথেন্সের যুবরাজ থিসিউস পার্শ্ববর্তী দেশ ক্রিটে একটি অভিযান চালান। সেখানকার রাজা সাতটি ছেলে শিশু ও সাতটি কন্যা শিশুকে একটি গোলকধাঁধায় বন্দি করে রেখেছেন। শিশুদের পাহারা দিচ্ছে মিনোটর নামক এক অতিকায় দানব। অর্ধমানব, অর্ধষাঁড়ের এই দানবকে হত্যা করে শিশুদের উদ্ধারের ভার পড়েছে থিসিউসের ওপর। থিসিউস গোলকধাঁধায় ঢুকে দৈত্যকে হত্যা করে শিশুদের নিয়ে বের হলেন। ক্রিট থেকে তার নৌকা আবার ফিরল এথেন্সে। ফিরে আসার পর নৌকাটি একটি পূজার বস্তুতে পরিণত হলো। বহু বছর ধরে এথেনিয়ানরা এটিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও যত্ন সহকারে দেখাশোনা করতেন। ডেলোসে বিশেষ ধর্মীয় অভিযানেও নৌকাটি ব্যবহার করতেন তারা। এক পর্যায়ে নৌকাটি বন্দরে নোঙর করা থাকল এবং দীর্ঘ সময় ধরে বন্দরে পড়ে থাকায় ঝড়-বৃষ্টিতে এটি আস্তে আস্তে নষ্ট হতে শুরু করে। কেউ কেউ নৌকাটির কাঠের টুকরো শ্রদ্ধার উপকরণ হিসেবে বাড়িতে নিয়ে রাখত, কেউ কেউ গলায় তাবিজ বানিয়েও রাখত। এভাবে একদিকে নৌকাটির কিছু অংশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে মিস্ত্রীরা এটিকে নতুন কাঠ দিয়ে প্রতিস্থাপন করছেন। এভাবে ক্ষয় এবং প্রতিস্থাপন করতে করতে নৌকাটির পুরোনো যে কাঠ তার আর অবশিষ্ট রইল না। একটি নতুন নৌকায় রূপান্তরিত হলো। এখানেই দার্শনিকদের জিজ্ঞাসা, এটি কি থিসিউসের আগের সেই নৌকা, নাকি একেবারে নতুন, ভিন্ন একটি।
এই জিজ্ঞাসা নিয়ে জন্ম নিল দর্শনের একটি নতুন উদ্দীপক ‘শিপ অব থিসিউস প্যারাডক্স’। এই প্যারাডক্স বা ধাঁধা নিয়ে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস থেকে শুরু করে আধুনিক অনেক দার্শনিক অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, নানা তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। তবে সম্ভবত সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন অ্যারিসস্টটল। অ্যারিসস্টটলের মতে, এটি আগের সেই থিসিউসের নৌকাই। প্রাচীন গ্রিক এই দার্শনিক তার সমস্যা সমাধানে এসেন্স বা সারবস্তুর ধারণা নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেছেন, কিছু একটা তৈরি করতে হলে তিনটি জিনিস লাগে- ম্যাটার বা বস্তু, ফর্ম বা আকৃতি এবং এসেন্স বা সারবস্তু। এই সারবস্তুর আরেক নাম হতে পারে ভাব। অ্যারিসস্টল বলেছেন, যদি প্রতিটি অংশ এক এক করে পরিবর্তন করা হয়েও থাকে, তবুও এটি একই নৌকা থাকবে। কারণ এর সারবস্তু পরিবর্তিত হয়নি।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাও এই সারবস্তু। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একে প্রতিস্থাপন বা সংস্কার করা হয়েছে বটে, তার অর্থ এই নয় যে একাত্তর মুছে গেছে। এখন একাত্তরকে মুছে দিতে চাওয়াটা শুধু বোকামিই নয়, বিপদও বটে। বিপদটা হলো আরেকটি ফ্যাসিবাদের জন্ম হওয়া; এটা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ গণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের চেয়েও ভয়ংকর। গণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদকে কোনো না কোনো সময় পরাস্ত করা যায়, কিন্তু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে ছোঁয়াও যায় না।
এটা সত্য যে একাত্তরকে হাসিনাশাহী থিসিউসের ভাঙা নৌকার মতো পূজার উপকরণ বানিয়ে ফেলেছিল, কাঠের টুকরার মতো তাবিজে ভরে গলায় ঝুলিয়ে রেখেছিল। এটা করেছিল বিশ্বাস বা আদর্শের জায়গা থেকে নয়, বাণিজ্যের জায়গা থেকে, ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার মতলবে। যেমন গ্রাম্য ওঝারা গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে বোকা বানিয়ে নানা ঝারফুক দিয়ে তাদের কাছ থেকে কিছু অর্থকড়ি কামিয়ে নিত, হাসিনাও তাই করেছিল, গ্রাম্য ওঝার মতোই। কিন্তু মানুষকে মাঝে-সাঝে একটু-আধটু বোকা বানানো যায়, সব সময় নয়। মানুষ যখন বুঝে যায়, তারা প্রতারিত হচ্ছেন, তাদের বোকা বানানো হচ্ছে, তখনই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। চব্বিশেও তাই ঘটেছে, সম্মিলিত প্রতিবাদে হাসিনা নিজেই উৎখাত হয়ে গেছেন।
একাত্তর যদি মহাকাব্য হয়, চব্বিশ তার আখ্যান কাব্য। মহাকাব্যের নানা কাহিনী থেকে অনেক আখ্যান কাব্য তৈরি হতে পারে, তৈরি হয়। তার অর্থ এই নয়, সেটাই আসল মহাকাব্য। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিক সত্যিকার গণতান্ত্রিকর রাষ্ট্রে রূপ দিতে হলে একাত্তরের চেতনাকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে। চব্বিশ হবে তার রক্ষাকবচ। অর্থাৎ চব্বিশই একাত্তরকে টেনে নিয়ে যাবে, পথ দেখাবে। কোথাও বিচ্যুত ঘটলে চব্বিশ বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এটাই চব্বিশের শক্তি।
সব কথার শেষ কথা হলো ‘চেতনা’ নিয়ে আমাদের ধারণা খুব একটা স্পষ্ট নয়। এই কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্ররা তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ধারণাকে বলছেন, ‘জুলাই স্পিরিট’। স্পিরিটের মধ্যে একটা ওজনদার ভাব আছে। ‘জুলাই চেতনা’ বললে আবার আওয়ামী লীগের বয়ান প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়, এই ঝুঁকি ছাত্ররা নেবেন কেন? তাই তারা ‘স্পিরিট’ নাম দিয়েছেন। প্রাচীন ল্যাটিন থেকে আসা এই শব্দটির অর্থ ‘শ্বাস নেওয়া’। ওই যে মানুষের ভেতরে ‘রূহ’, বা বাতাস- এটাও স্পিরিট বা চেতনা। গত পনের বছরে বাংলাদেশের মানুষের অনেকটা নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে ছিল, অভ্যুত্থান মানুষকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু গত দেড় বছরে দেশের নানা স্থানে কিছু উপদ্রব দেখা দিয়েছে। ভিন্নমত, ভিন্ন সংস্কৃতির লোকজন আক্রান্ত হচ্ছেন। মানুষের বাগ্স্বাধীনতা আবার গলা টিপে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। এগুলো খুব খাটো করে বা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। নতুন করে মানুষের নিশ্বাস বন্ধ করে দেওয়ার এটি একটি সংগঠিত বা পরিকল্পিত আয়োজন। এই ধারা চলমান থাকলে একাত্তরের চেতনা বলি, আর জুলাই স্পিরিট বলি, কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
‘একাত্তরের চেতনা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’-এসব শব্দবন্ধ এখন অচ্ছুৎ বা অনেকটা গালিতে রূপ নিয়েছে,এমন নমুনা দেখা যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেই মানুষ একটু আঁড় চোখে তাকায়, লোকটা দোসর-টোসর কেউ না তো! দেশের মানুষকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এর জন্য দায়ী। ব্যুৎপত্তিগতভাবে অনেক সুন্দর শব্দ কালে কালে মানুষের মুখে মুখে ফিরে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে কদর্য অর্থে রূপ নিয়েছে- এমন উদাহরণ ব্যাকরণে ভুরিভুরি। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ও অর্থ পরিবর্তন বা সিমান্টিক্স চেইঞ্জ ঘটেছে বিগত শাসকদের অতিকথনে।
রূপকথার ডাইনি যেমন মন্ত্র পড়ে মানুষকে ভেড়া বা গাধা বানিয়ে রাখত, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী বয়ানও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ মন্ত্র পড়ে বাংলাদেশের মানুষকে গাধা-ভেড়া বানিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। রূপকথায় কোনো এক রাজপুত্র এসে যেমন ডাইনির নাক কেটে দিয়ে, তাকে তাড়িয়ে গাধা-ভেড়াকে আবার মানুষ বানিয়েছেন, ২০২৪-এর জুলাইয়ে অভ্যুত্থানও আওয়ামী লীগ দেশের মানুষকে মুক্তি দিয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখনই অচ্ছুৎ হয়ে গেছে।
চেতনা নিয়ে এ যাবৎকালে দার্শনিকরা কম কালি খরচ করেননি। তবে সবচেয়ে যুৎসই বয়ানটা দিয়েছেন বোধ হয় ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ পল সার্ত্র। তাঁর ‘বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস’ কিতাবে সার্ত্র একটি ঘটনা বলেছেন। নিজের ভাষায় সেটা বলছি। ধরুন, কেউ একজন বেড়ার ফাঁক দিয়ে অন্যের ঘরে উঁকিঝুকি মারছে; ওই ঘরে কী হচ্ছে না হচ্ছে তার মজা নিচ্ছে। সে কিন্তু আসলে চেতনার জগতে নেই। মজা নেওয়াটাই তার কাছে সব। এখন কেউ একজন পেছন দিক থেকে তাকে দেখে ফেললেন। তখনই লোকটির চৈতন্য হলো, ‘হায়, আমি একি করছি’! তার মানে আমি কী করছি, এটা চেতনা নয়, আদার বা অপর দেখে ফেলছে আমি কী করছি, এটাই চেতনা। এই চেতনাকে সার্ত্র বলেছেন, অস্তিত্বের লজ্জা বা এক্সিটেনশিয়াল শেইম।
রাজনীতিতে এই শেইম বা লজ্জাশরম থাকাটা খুব জরুরি। বিগত সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ক্ষমতা, অর্থকড়ি সবই ছিল, ছিল না কেবল লজ্জাশরম। তারা ধারণা করেছিলেন, তাদের কেউ দেখছেন না। তা না হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামক জাবর কাটতে কাটতে একাত্তরের যেই মূল্যবোধ, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রটিকে তারা দাঁড় করাত না। জুলাই আন্দোলন আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে একাত্তরের সত্যিকারের চেতনা, সত্যিকারের মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা; একটি মানবিক বাংলাদেশের পথ নির্মাণ করা। কিন্তু দেখা গেল একটি পক্ষ একাত্তরকেই অস্বীকার করা শুরু করেছে। আবার একাত্তর গেল গেল বলে আরেক পক্ষ বেশ কান্নাকাটিও জুড়ে দিয়েছে। একাত্তর বড়, না চব্বিশ বড় সেই আলোচনাও নানা মহলে চওড়া হচ্ছে। এখন কোনটা বড় তার হয়তো একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে থিসিউসির নৌকার ধাঁধাটি থেকে।
এথেন্সের যুবরাজ থিসিউস পার্শ্ববর্তী দেশ ক্রিটে একটি অভিযান চালান। সেখানকার রাজা সাতটি ছেলে শিশু ও সাতটি কন্যা শিশুকে একটি গোলকধাঁধায় বন্দি করে রেখেছেন। শিশুদের পাহারা দিচ্ছে মিনোটর নামক এক অতিকায় দানব। অর্ধমানব, অর্ধষাঁড়ের এই দানবকে হত্যা করে শিশুদের উদ্ধারের ভার পড়েছে থিসিউসের ওপর। থিসিউস গোলকধাঁধায় ঢুকে দৈত্যকে হত্যা করে শিশুদের নিয়ে বের হলেন। ক্রিট থেকে তার নৌকা আবার ফিরল এথেন্সে। ফিরে আসার পর নৌকাটি একটি পূজার বস্তুতে পরিণত হলো। বহু বছর ধরে এথেনিয়ানরা এটিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও যত্ন সহকারে দেখাশোনা করতেন। ডেলোসে বিশেষ ধর্মীয় অভিযানেও নৌকাটি ব্যবহার করতেন তারা। এক পর্যায়ে নৌকাটি বন্দরে নোঙর করা থাকল এবং দীর্ঘ সময় ধরে বন্দরে পড়ে থাকায় ঝড়-বৃষ্টিতে এটি আস্তে আস্তে নষ্ট হতে শুরু করে। কেউ কেউ নৌকাটির কাঠের টুকরো শ্রদ্ধার উপকরণ হিসেবে বাড়িতে নিয়ে রাখত, কেউ কেউ গলায় তাবিজ বানিয়েও রাখত। এভাবে একদিকে নৌকাটির কিছু অংশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে মিস্ত্রীরা এটিকে নতুন কাঠ দিয়ে প্রতিস্থাপন করছেন। এভাবে ক্ষয় এবং প্রতিস্থাপন করতে করতে নৌকাটির পুরোনো যে কাঠ তার আর অবশিষ্ট রইল না। একটি নতুন নৌকায় রূপান্তরিত হলো। এখানেই দার্শনিকদের জিজ্ঞাসা, এটি কি থিসিউসের আগের সেই নৌকা, নাকি একেবারে নতুন, ভিন্ন একটি।
এই জিজ্ঞাসা নিয়ে জন্ম নিল দর্শনের একটি নতুন উদ্দীপক ‘শিপ অব থিসিউস প্যারাডক্স’। এই প্যারাডক্স বা ধাঁধা নিয়ে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস থেকে শুরু করে আধুনিক অনেক দার্শনিক অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, নানা তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। তবে সম্ভবত সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন অ্যারিসস্টটল। অ্যারিসস্টটলের মতে, এটি আগের সেই থিসিউসের নৌকাই। প্রাচীন গ্রিক এই দার্শনিক তার সমস্যা সমাধানে এসেন্স বা সারবস্তুর ধারণা নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেছেন, কিছু একটা তৈরি করতে হলে তিনটি জিনিস লাগে- ম্যাটার বা বস্তু, ফর্ম বা আকৃতি এবং এসেন্স বা সারবস্তু। এই সারবস্তুর আরেক নাম হতে পারে ভাব। অ্যারিসস্টল বলেছেন, যদি প্রতিটি অংশ এক এক করে পরিবর্তন করা হয়েও থাকে, তবুও এটি একই নৌকা থাকবে। কারণ এর সারবস্তু পরিবর্তিত হয়নি।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাও এই সারবস্তু। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একে প্রতিস্থাপন বা সংস্কার করা হয়েছে বটে, তার অর্থ এই নয় যে একাত্তর মুছে গেছে। এখন একাত্তরকে মুছে দিতে চাওয়াটা শুধু বোকামিই নয়, বিপদও বটে। বিপদটা হলো আরেকটি ফ্যাসিবাদের জন্ম হওয়া; এটা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ গণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের চেয়েও ভয়ংকর। গণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদকে কোনো না কোনো সময় পরাস্ত করা যায়, কিন্তু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে ছোঁয়াও যায় না।
এটা সত্য যে একাত্তরকে হাসিনাশাহী থিসিউসের ভাঙা নৌকার মতো পূজার উপকরণ বানিয়ে ফেলেছিল, কাঠের টুকরার মতো তাবিজে ভরে গলায় ঝুলিয়ে রেখেছিল। এটা করেছিল বিশ্বাস বা আদর্শের জায়গা থেকে নয়, বাণিজ্যের জায়গা থেকে, ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার মতলবে। যেমন গ্রাম্য ওঝারা গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে বোকা বানিয়ে নানা ঝারফুক দিয়ে তাদের কাছ থেকে কিছু অর্থকড়ি কামিয়ে নিত, হাসিনাও তাই করেছিল, গ্রাম্য ওঝার মতোই। কিন্তু মানুষকে মাঝে-সাঝে একটু-আধটু বোকা বানানো যায়, সব সময় নয়। মানুষ যখন বুঝে যায়, তারা প্রতারিত হচ্ছেন, তাদের বোকা বানানো হচ্ছে, তখনই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। চব্বিশেও তাই ঘটেছে, সম্মিলিত প্রতিবাদে হাসিনা নিজেই উৎখাত হয়ে গেছেন।
একাত্তর যদি মহাকাব্য হয়, চব্বিশ তার আখ্যান কাব্য। মহাকাব্যের নানা কাহিনী থেকে অনেক আখ্যান কাব্য তৈরি হতে পারে, তৈরি হয়। তার অর্থ এই নয়, সেটাই আসল মহাকাব্য। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিক সত্যিকার গণতান্ত্রিকর রাষ্ট্রে রূপ দিতে হলে একাত্তরের চেতনাকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে। চব্বিশ হবে তার রক্ষাকবচ। অর্থাৎ চব্বিশই একাত্তরকে টেনে নিয়ে যাবে, পথ দেখাবে। কোথাও বিচ্যুত ঘটলে চব্বিশ বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এটাই চব্বিশের শক্তি।
সব কথার শেষ কথা হলো ‘চেতনা’ নিয়ে আমাদের ধারণা খুব একটা স্পষ্ট নয়। এই কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্ররা তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ধারণাকে বলছেন, ‘জুলাই স্পিরিট’। স্পিরিটের মধ্যে একটা ওজনদার ভাব আছে। ‘জুলাই চেতনা’ বললে আবার আওয়ামী লীগের বয়ান প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়, এই ঝুঁকি ছাত্ররা নেবেন কেন? তাই তারা ‘স্পিরিট’ নাম দিয়েছেন। প্রাচীন ল্যাটিন থেকে আসা এই শব্দটির অর্থ ‘শ্বাস নেওয়া’। ওই যে মানুষের ভেতরে ‘রূহ’, বা বাতাস- এটাও স্পিরিট বা চেতনা। গত পনের বছরে বাংলাদেশের মানুষের অনেকটা নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে ছিল, অভ্যুত্থান মানুষকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু গত দেড় বছরে দেশের নানা স্থানে কিছু উপদ্রব দেখা দিয়েছে। ভিন্নমত, ভিন্ন সংস্কৃতির লোকজন আক্রান্ত হচ্ছেন। মানুষের বাগ্স্বাধীনতা আবার গলা টিপে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। এগুলো খুব খাটো করে বা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। নতুন করে মানুষের নিশ্বাস বন্ধ করে দেওয়ার এটি একটি সংগঠিত বা পরিকল্পিত আয়োজন। এই ধারা চলমান থাকলে একাত্তরের চেতনা বলি, আর জুলাই স্পিরিট বলি, কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
লোড হচ্ছে...