জাতীয়
সবার আগে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন নারায়ণগঞ্জের বাগমার
NewsView

নিউজ ভিউ বিশেষ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আওয়ামীবয়ান অর্ধসত্য। অর্ধসত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ানক। তবে ইতিহাস রচনার দায় কেবলই আওয়ামী লীগকে দিলে চলে না। এ দায় ইতিহাস রচয়িতা থেকে শুরু করে বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজেরও। ব্যতিক্রম বাদে তারা কাজটি করেননি। বরং শাসকদলের আনুকূল্যের খাতিরে ইতিহাস রচয়িতারা প্রভাবিত। তারা মেরুদণ্ড সোজা রেখে ইতিহাস লেখা ও চর্চা করতে অক্ষম ছিলেন। বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে সব শাসকই কমবেশি চেষ্টা করেছেন ইতিহাসকে নিজের পক্ষে নিতে অথবা এড়িয়ে যেতে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সহি ইতিহাস অনেকটাই জনযুদ্ধ। এটি কখনও রাজায় রাজায় যুদ্ধ ছিল না। কতিপয় ছাড়া, দেশের সাধারণ জনতা মুক্তিযুদ্ধের সব চেয়ে বড় অংশীজন। তাদের কৃতিত্বকে খাটো করে ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। তাদের হিস্যা নিশ্চিত না করে বরং সুবিধাবাদীদের হাতে সম্পদ ও শাসন বিতরিত হয়ে আসছে এ যাবৎ। কোনো শাসকই মুক্তিযুদ্ধে সহি ইতিহাস লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। একই সঙ্গে চলমান ব্যবস্থার বিকল্প দাবিদারি রাজনৈতিক দলও এই দায় মাথা তুলে নেয়নি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতরণা করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- ভারতে তাজমহল যারা নির্মাণ করেছেন, সেই শ্রমশিল্পীদের অর্জন, প্রাণ আত্মসাৎ করে সম্রাট শাহজাহানের বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বড় নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব ও মুজিবপরিবারের বাইরে কেউ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন বা সংগঠিত করেছেন, এই সত্য কখনোই মেনে নিতে পারেনি। ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন দাবি তাদের কাছে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছে। ইতিহাসের সত্যকে অনেক সময় পাথরচাপা দিয়ে রাখা যায়, কিন্তু দীর্ঘ সময় রাখা যায় না। ইতিহাস গোপনের তাৎপর্যই ইতিহাস উন্মোচনের প্রতিশ্রুতি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আওয়ামী বয়ায়ন বিনাবাক্যে গিলে ফেলার কারণ থাকতে পারে না। প্রথমত দলটি এই বয়ান তৈরি করেছে একটি শ্রেণির পক্ষে, দ্বিতীয়ত একটি দলের পক্ষে, তৃতীয়ত একটি পরিবারের পক্ষে সর্বশেষ এক ব্যক্তির পক্ষে। এই অপরাধ মার্জনার উপায় একমাত্র ইতিহাস দিয়ে তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করি।
উদাহরণ। রোমান বা বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ প্রোকপিয়াস অব সেজার। সম্রাট জাস্টিনিয়ানের (৪৮২-৫৬৫) সময়কালের এই ইতিহাসবিদ তখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছিলেন। একটি ‘হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার’, দ্বিতীয়টি ‘দ্য বিল্ডিংস’। বই দুটিতে রোমান সাম্রাজ্যের সৌর্যবির্যের কাহিনি ও রোমান স্থাপত্যকলার বিবরণ রয়েছে। যেমন বিখ্যাত হায়া সোফিয়া গির্জা (বর্তমানে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ)। জাস্টিনিয়ানের এই অমর কীর্তি প্রোকপিয়াস তাঁর ‘দ্য বিল্ডিংস’ বইয়ে দারুণভাবে তুলে ধরেছেন।
প্রোকপিয়াসের মহিমা আসলে এই জায়গায় নয়। রোমান সাম্রাজ্যের এই রাজপণ্ডিত আরেকটি বই লিখেছিলেন, ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে। যেটি পরবর্তী সময়ে আধুনিক জামানায় ‘দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি’ নামে প্রকাশ পেয়েছে। বইটি প্রোকপিয়াস তাঁর সময় প্রকাশ করেননি। প্রকাশ করার কথাও না। কারণ বইটিতে সম্রাট জাস্টিনিয়ান ও তাঁর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী থিওডোরার অনেক কুকীর্তি তুলে ধরেছেন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের দুই শতাব্দী পর পাণ্ডুলিপিটি আবিষ্কৃত হয় এবং ১৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি’ নামে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়।
এত কথা বলার কারণ হলো, আওয়ামী লীগের কোনো আমলেই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস প্রকাশ করা যেত না। যেমন মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের ঘটনাবলি আওয়ামী লীগ ইতিহাসের খাতা থেকে পুরোপুরি মুছে দিয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদের দিনপঞ্জি, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, এ কে খন্দকার, মঈদুল হাসান প্রমুখ ব্যক্তির লেখায় মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের অনেক সত্য বেরিয়ে এসেছে, যা আওয়ামী বয়ানের বিপরীত। এগুলোই মুক্তিযুদ্ধের ‘সিক্রেট হিস্টি’ হিসেবে আওয়ামী বয়ানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছে।
শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি, তিনি চেয়েছিলেন স্বায়াত্বশাসন। সত্তরের নির্বাচনের পর তিনি শুধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী-ই হতে চেয়েছেন, এর বেশি কিছু নয়। তবে এতে তার অন্য অবদান খারিজ হয়ে যায় না। বরং সত্য প্রতিষ্ঠত হলে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তার ভূমিকা আরও উজ্জ্বলও হতে পারে। এই ইতিহাস এখন ধীরে ধীরে ফর্সা হচ্ছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা কে? আওয়ামী বয়ানে শেখ মুজিব ছাড়া আর কেউ নন। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। ইতিহাস আরও বলে, ১৯৬২ সালে কিছু ছাত্রনেতা ‘নিউক্লিয়াস’ গঠনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ‘নিউক্লিয়াস’ আজও একটি মিথ হয়ে আছে। ১৯৭২ সালের আগে এ সম্পর্কে কারও কোনো ধারণাই ছিল না। ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন হলেও এর কোনো প্যামফ্লেট বা লিখিত কোনো ডকুমেন্ট নেই। কিন্তু কিছু উদ্যোগ যে তারা নেননি, এটাও অস্বীকার করা হবে অন্যায়। তাঁদের একটা গোপন তৎপরতা অবশ্যই ছিল।
কাঠামোগতভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা আসলে আব্দুল আজিজ বাগমার। এই তথ্য জানা হতো না, যদি ১৯৯৯ সালে তিনি একটি বই প্রকাশ না করতেন। তাঁর প্রকাশিত ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন: উন্মেষ ও অর্জন’ নামে বইটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আরেক ‘সিক্রেট হিস্ট্রি’। বইটির মুখবন্ধে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান চমৎকার একটি মন্তব্য করেছিলেন—’স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের। হলো তা জানতে হলে এ বইটি পড়তে হবে।’
কে এই আব্দুল আজিজ বাগমার? ইতহাস তাঁকে নারায়ণগঞ্জের ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও তার জন্ম গাজীপুরের কালিগঞ্জে। তবে শৈশব, বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জেই। প্রাথমিক পাস করেছেন বার একাডেমি স্কুল থেকে। নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন তোলারাম কলেজে। তোলারাম কলেজেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। হয়েছিলেন তোলারাম কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপিও। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইয়ুব খান তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাসের মধ্যে পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা ‘যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে একটি বড় কাজে হাত দেন। সরকারের শিক্ষাসচিব এস এম শরিফের নেতৃত্বে কমিশন অন ন্যাশনাল এডুকেশন নিয়োগ দেওয়া হয় ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। দেশের সেরা শিক্ষাবিদদের অনেকেই কমিশনের সদস্য হলেন। এটিই পরে শরিফ কমিশন নামে পরিচিতি পায়।
শরিফ কমিশনের খসড়া প্রতিবেদন প্রেসিডেন্টের দপ্তরে জমা পড়ে ২৬ আগস্ট, ১৯৫৯। প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল বিএ পাস কোর্স দুই বছরের পরিবর্তে তিন বছর করা, কোনো একটি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ এবং সব বিষয় মিলিয়ে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেলে পরীক্ষায় পাস হওয়া, প্রাথমিক শিক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত, কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া ইত্যাদি।
শরিফ কমিশনের প্রতিবেদন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ দেশ থেকে সামরিক শাসন তুলে নেওয়া হয়। শুরু হয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন। রাজনৈতিক দলগুলো তখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। অনেকেই মামলা এড়াতে স্বেচ্ছানির্বাসনে গেছেন। আন্দোলনের নেতৃত্বে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্ররা। অনুঘটকের ভূমিকায় ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। তাদের যৌথ নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছিল শিক্ষা আন্দোলন।
শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন কলেজের ছাত্রনেতাদের নিয়ে ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৈরি হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফোরাম। ঢাকার জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি আবদুল্লাহ ওয়ারেস ইমাম এবং নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজের ছাত্রনেতা আবদুল আজিজ বাগমার ছিলেন যথাক্রমে এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬২ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। নারায়ণগঞ্জের একটি ছাত্রসভায় সমবেত সবাই শপথ নেন যে বিজয় ছাড়া কেউ নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাবেন না। তারা আরও শপথ নেন যে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করতে হবে। ছাত্রদের মধ্যে এ ধরনের উচ্চারণ এর আগে শোনা যায়নি। আবদুল আজিজ বাগমারের ভাষ্যমতে, ‘১৯৬২ সালে এ ধ্বনিটি বা স্লোগানটি আমিই উচ্চারণ করেছিলাম। আমি ছিলাম সভার শেষ বক্তা। সবাই উচ্চ কণ্ঠে স্বাধীনতার পক্ষে ধ্বনি প্রদান করে।’
বাগমার আরও লিখেন, ‘তখনকার পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের মৌলিক গণতন্ত্রী চিফ হুইপ এম এ জাহের তাদের নেতাদের সঙ্গে আট দিন সলাপরামর্শ করে আবিষ্কার করল, আবদুল আজিজ বাগমার দেশদ্রোহের ধ্বনি উচ্চারণ করেছে।…অতএব ঘটনার ৯ দিন পর দৈনিক আজাদ পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে জঘন্য অভিযোগ উত্থাপন করল–বাগমার বন্দে মাতরমধ্বনি দিয়েছে, আল্লাহু আকবর দেয়নি। আমি তার প্রতিবাদ করলাম। দৈনিক ইত্তেফাক আমার বক্তব্য সম্পূর্ণটা ছেপেছিল ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে।’
বাষট্টির আন্দোলন শেষ হওয়ার পর ছাত্র ফোরামের নেতারা ইডেন কলেজের নাজমা রহমানের বাবার বাসায় এক গোপন বৈঠকে জাতীয় প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিষয়ে আলোচনা করেন ও সিদ্ধান্ত নেন। ‘কেউ কেউ শপথনামায় রক্তস্বাক্ষর প্রদান করেন। একজন শুধু ওয়াকআউট করেন। তিনি মতিয়া চৌধুরী।’ এভাবেই জন্ম হলো নতুন সংগঠন–‘অস্থায়ী পূর্ববঙ্গ সরকার’, সংক্ষেপে ‘অপূর্ব সংসদ’। দিনটি ছিল ১ অক্টোবর, ১৯৬২। তাঁদের লেখা বিভিন্ন ইশতেহার ও পুস্তিকায় সংগঠনের নাম হিসেবে সংক্ষেপে লেখা হতো ‘অপু’। তারা একটি সরকারকাঠামোও ঠিক করেছিলেন। বেগম সুফিয়া কামালকে রাষ্ট্রপতি ও আবদুল আজিজ বাগমারকে প্রধানমন্ত্রী করে এই রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করা হয়। এর উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই, অধ্যাপক শওকত ওসমান, অধ্যাপক আহমদ শরীফ ও অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী।
অপূর্ব সংসদের মনোগ্রাম এঁকে দিয়েছিলেন শিল্পী প্রাণেশ কুমার মন্ডল। বাগমারের দাবি, বিষয়টি যারা জানতেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। এ ছাড়া রাজনীতিবিদদের মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ বিষয়টি জানতেন। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলগাড়িতে ইন্টার ক্লাসে স্বাধীনতার প্রচারকাজে অংশ নিতেন হাবিবুর রহমান, বাবু সারওয়ার, এ কে এম এ রফিক, নজরুল ইসলাম (মিনা), ফরিদা আক্তার, মনিরুল ইসলাম, আবদুল আউয়াল, লাল মিয়া, শহীদ, মেঘনাদ চন্দ, শান্তিনারায়ণ ঘোষ, কমরউদ্দিন (মন্টু), কামালউদ্দিন আহমদ, আখতারুজ্জামান (মনু), খাজা মহিউদ্দিন, এম এ খালেক, মুক্তা, মতি, মো. আলী, কুতুবউদ্দিন আকসির প্রমুখ।
বাগমার ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তার রুমমেট ছিলেন শেখ রিয়াজউদ্দিন, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ ও খন্দকার মোশারফ হোসেন। এ ছাড়া সিরাজুল আলম খান, আল মুজাহিদী, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুস সোবহান এবং রকিবউদ্দিন আহমদ মাঝেমধ্যে ওই কামরায় আসতেন এবং থাকতেন। তাঁরা সবাই বাগমারের গোপন কার্যকলাপের ব্যাপারে অবহিত ছিলেন বলে বাগমারের ভাষ্যে জানা যায়। এ সময় বাগমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও অপূর্ব সংসদের উপদেষ্টা মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে অস্থায়ী পূর্ববঙ্গ সরকারের জন্য স্বাধীনতার পক্ষে কিছু লিখে দেওয়ার অনুরোধ করলে তিনি ‘বাঙালী কি চায়? স্বাধীনতা’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখে দেন। লেখাটি ‘অপু-১’ ইশতেহার হিসেবে ২১ ডিসেম্বর ১৯৬৩ প্রচার করা হয়।
দ্বিতীয় ইশতেহার, ‘অপু-২’। শিরোনাম দেন ‘শকুন-শৃগালের আবার বাংলা আক্রমণ’। ছদ্মনামে এটি প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আহমদ শরীফ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপূর্ব সংসদের অন্যতম সমন্বয়কারী শান্তিনারায়ণ ঘোষ। ঢাকার ৫৫ পাতলা খান লেনে অবস্থিত কাজী হারুন-অর-রশিদের মালিকানাধীন মোনালিসা প্রেসে এটি ছাপানো হয়। ইশতেহারের শুরুতে বলা হয়, ‘বাংলার ওপর অত্যাচার করে সবাই আনন্দ পায়। কারণ এতে তাদের সম্পদ বৃদ্ধি পায়। শক, হুন, মোগল, পাঠান, পাল, সেন এবং ইংরেজ শতাব্দীর পর শতাব্দী বাংলার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। বাংলাকে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস পেয়েছে। কিন্তু পারেনি। বাংলা নিজেকে বিসর্জন দিয়ে দানের আনন্দ পেয়েছে বারবার। কিন্তু আর কত দিন?’
অপূর্ব সংসদের তৃতীয় ও শেষ ইশতেহারটি ১ অক্টোবর, ১৯৬৫ সালে প্রকাশ করা হয়। এটি লিখে দিয়েছিলেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ। বাগমার এর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন এভাবে -- ‘ড. আহমদ শরীফ সাহেবের নিকট নিয়মিত অনুরোধ করতে থাকি। অতঃপর মে মাসে ‘অপু-৩ ইতিহাসের ধারায় বাঙালী’ স্বাধীনতার তৃতীয় ও চূড়ান্ত ইশতেহারের মূল কপি আমার নিকট হস্তান্তর করেন। তিনি নির্দেশ প্রদান করেন, দ্রুত কপি করে মূল কপি ফেরত দেওয়ার জন্য।’
বাগমার আরও লিখেন, ‘ড. আহমদ শরীফ ওই দুঃসময়ে শতভাগ বিশ্বাস করেছিলেন। এর সকল কৃতিত্ব কেবল তাঁর। তবে ওই বিশ্বাসে কখনো ফাটল ধরেনি। অটুট ছিল। সুলতানা কামালকে দিয়ে দ্রুত কপি করালাম। অন্যদের দেখতে দিলাম…ইতিমধ্যে উপদেষ্টামণ্ডলী দেখা সম্পন্ন করলেন। মুদ্রণের জন্য একজন বিশ্বস্ত প্রেস মালিককে দেওয়া হলো। নাম কাজী হারুন-অর-রশিদ। মোনালিসা ফাইন আর্ট অ্যান্ড প্রিন্টিং প্রেস, ৫৫ পাতলা খান লেন, ঢাকা।’
বাগমারের ভাষ্যে আরও জানা যায়, অস্থায়ী পূর্ববঙ্গ সরকার (অপূর্ব সংসদ) আর বিলম্ব করেনি। ১ অক্টোবর, ১৯৬৫ সাল আমাদের অপু-৩ ইতিহাসের ধারায় বাঙালী বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা প্রকাশিত হলো। রাষ্ট্রপতি কবি বেগম সুফিয়া কামাল ও প্রধানমন্ত্রী আবদুল আজিজ বাগমারের সংক্ষিপ্ত নামে স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়।
বাগমার বলেন, ‘দ্রুত প্রেসক্লাবের নিচের তলায় উত্তর-পূর্ব কক্ষে যেখানে সকল পত্রিকার ফাইল পড়ার জন্য ছিল, তাতে বেশ কিছু কপি রাত ১১টায় রেখে আসা হলো। ওখানে তখন কেউ ছিল না। ইত্তেফাক এর প্রধান সাংবাদিকদের কপি দেওয়া হলো। হাইকোর্ট বারে পৌঁছানো হলো।…ঢাকাস্থ আদমজী কোর্টে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট অফিসে কপি দেওয়া হলো। তবে দুই ঘণ্টার মধ্যে পাক গোয়েন্দারা এই কপি পেয়ে যায়। এমনটা হতে পারে, এ আশঙ্কা আমাদের ছিল। দেওয়া হলো সেগুনবাগিচায় অবস্থিত ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনে। সম্ভবত ক্ষিতীশ সেন বা সেন বলে একজন ছিলেন। চীনসহ অন্যদের কপি দেওয়া হলো।’
মনীষা আহমদ শরীফ তাঁর স্বদেশ অন্বেষা গ্রন্থের ‘বিশ শতকে বাঙালী’ নামক প্রবন্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের উন্মেষকালের একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘উঠতি শিক্ষিত বাঙালী আশাভঙ্গে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল ১৯৫৭-৫৮ সনেই; কোনো কোনো সাংসদ রাজনীতিক স্বায়ত্তশাসন দাবির স্বপ্নও দেখেছিলেন। ভাষার দাবিতে প্রগতিশীলদের আন্দোলন ও ক্ষোভ ক্রোধ ক্রমেই শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে তাল রেখে তীব্র হতে থাকল। এ সময় ১৯৬৫ সনে আবদুল আজিজ বাগমার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক ছাত্র স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সাধ বাস্তবায়নের জন্যে ছাত্র ও নেতা হিসেবে পন্থা আবিষ্কারে ও উপায় উদ্ভাবনে সক্রিয়ভাবে গোপনে কাজ শুরু করলেন। ঢাকার কিছু শিক্ষককে করলেন উপদেষ্টা। পরে ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি হয়েই শেখ মুজিবুর রহমান দাবি জানালেন অভীকচিত্তে ছয় দফা পূরণের। এর কিছু পরে মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমুখ কিছু সামরিক বিভাগের বাঙালী সেনানী আগরতলা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কিংবা অন্যভাবে স্বাধীনতা অর্জনে প্রয়াসী হলেন।’
তথ্যসূত্র: মহিউদ্দিন আহমদ, প্রতিনায়ক: সিরাজুল আলম খান; আব্দুল আজিজ বাগমার, স্বাধীনতার স্বপ্ন: উন্মেষ ও অর্জন; আহমদ শরীফ, স্বদেশ অন্বেষা।
পরিশিষ্ট: ১৯৬৭ সালের ২ নভেম্বর উচ্চ শিক্ষার জন্য আব্দুল আজিজ বাগমার লন্ডনে চলে যান। তিন বছর লন্ডনে থেকে সস্ত্রীক দেশে ফিরে আসেন ১৯৭০ সালের দিকে। তাজউদ্দীন আহমদের ধানমন্ডির বাসায় দোতলায় ভাড়া থাকতেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সেখান থেকেই পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেপ্তার হন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস কারাগারেই ছিলেন বাগমার। দেশ স্বাধীনের পর আবার তিনি লন্ডন চলে যান। পরে দেশে এসে তাজউদ্দীন আহমদের বাড়িতেই ভাড়ায় ওঠেন। ২০১১ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি প্রয়াত হন।
তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ তাঁর ‘তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আব্দুল আজিজ বাগমারের স্ত্রী আতিয়া বাগমারের বুদ্ধিমত্তায় সেদিন তাঁদের পুরো পরিবার রক্ষা পেয়েছিল
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আওয়ামীবয়ান অর্ধসত্য। অর্ধসত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ানক। তবে ইতিহাস রচনার দায় কেবলই আওয়ামী লীগকে দিলে চলে না। এ দায় ইতিহাস রচয়িতা থেকে শুরু করে বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজেরও। ব্যতিক্রম বাদে তারা কাজটি করেননি। বরং শাসকদলের আনুকূল্যের খাতিরে ইতিহাস রচয়িতারা প্রভাবিত। তারা মেরুদণ্ড সোজা রেখে ইতিহাস লেখা ও চর্চা করতে অক্ষম ছিলেন। বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে সব শাসকই কমবেশি চেষ্টা করেছেন ইতিহাসকে নিজের পক্ষে নিতে অথবা এড়িয়ে যেতে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সহি ইতিহাস অনেকটাই জনযুদ্ধ। এটি কখনও রাজায় রাজায় যুদ্ধ ছিল না। কতিপয় ছাড়া, দেশের সাধারণ জনতা মুক্তিযুদ্ধের সব চেয়ে বড় অংশীজন। তাদের কৃতিত্বকে খাটো করে ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। তাদের হিস্যা নিশ্চিত না করে বরং সুবিধাবাদীদের হাতে সম্পদ ও শাসন বিতরিত হয়ে আসছে এ যাবৎ। কোনো শাসকই মুক্তিযুদ্ধে সহি ইতিহাস লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। একই সঙ্গে চলমান ব্যবস্থার বিকল্প দাবিদারি রাজনৈতিক দলও এই দায় মাথা তুলে নেয়নি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতরণা করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- ভারতে তাজমহল যারা নির্মাণ করেছেন, সেই শ্রমশিল্পীদের অর্জন, প্রাণ আত্মসাৎ করে সম্রাট শাহজাহানের বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বড় নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব ও মুজিবপরিবারের বাইরে কেউ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন বা সংগঠিত করেছেন, এই সত্য কখনোই মেনে নিতে পারেনি। ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন দাবি তাদের কাছে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছে। ইতিহাসের সত্যকে অনেক সময় পাথরচাপা দিয়ে রাখা যায়, কিন্তু দীর্ঘ সময় রাখা যায় না। ইতিহাস গোপনের তাৎপর্যই ইতিহাস উন্মোচনের প্রতিশ্রুতি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আওয়ামী বয়ায়ন বিনাবাক্যে গিলে ফেলার কারণ থাকতে পারে না। প্রথমত দলটি এই বয়ান তৈরি করেছে একটি শ্রেণির পক্ষে, দ্বিতীয়ত একটি দলের পক্ষে, তৃতীয়ত একটি পরিবারের পক্ষে সর্বশেষ এক ব্যক্তির পক্ষে। এই অপরাধ মার্জনার উপায় একমাত্র ইতিহাস দিয়ে তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করি।
উদাহরণ। রোমান বা বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ প্রোকপিয়াস অব সেজার। সম্রাট জাস্টিনিয়ানের (৪৮২-৫৬৫) সময়কালের এই ইতিহাসবিদ তখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছিলেন। একটি ‘হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার’, দ্বিতীয়টি ‘দ্য বিল্ডিংস’। বই দুটিতে রোমান সাম্রাজ্যের সৌর্যবির্যের কাহিনি ও রোমান স্থাপত্যকলার বিবরণ রয়েছে। যেমন বিখ্যাত হায়া সোফিয়া গির্জা (বর্তমানে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ)। জাস্টিনিয়ানের এই অমর কীর্তি প্রোকপিয়াস তাঁর ‘দ্য বিল্ডিংস’ বইয়ে দারুণভাবে তুলে ধরেছেন।
প্রোকপিয়াসের মহিমা আসলে এই জায়গায় নয়। রোমান সাম্রাজ্যের এই রাজপণ্ডিত আরেকটি বই লিখেছিলেন, ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে। যেটি পরবর্তী সময়ে আধুনিক জামানায় ‘দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি’ নামে প্রকাশ পেয়েছে। বইটি প্রোকপিয়াস তাঁর সময় প্রকাশ করেননি। প্রকাশ করার কথাও না। কারণ বইটিতে সম্রাট জাস্টিনিয়ান ও তাঁর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী থিওডোরার অনেক কুকীর্তি তুলে ধরেছেন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের দুই শতাব্দী পর পাণ্ডুলিপিটি আবিষ্কৃত হয় এবং ১৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি’ নামে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়।
এত কথা বলার কারণ হলো, আওয়ামী লীগের কোনো আমলেই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস প্রকাশ করা যেত না। যেমন মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের ঘটনাবলি আওয়ামী লীগ ইতিহাসের খাতা থেকে পুরোপুরি মুছে দিয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদের দিনপঞ্জি, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, এ কে খন্দকার, মঈদুল হাসান প্রমুখ ব্যক্তির লেখায় মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের অনেক সত্য বেরিয়ে এসেছে, যা আওয়ামী বয়ানের বিপরীত। এগুলোই মুক্তিযুদ্ধের ‘সিক্রেট হিস্টি’ হিসেবে আওয়ামী বয়ানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছে।
শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি, তিনি চেয়েছিলেন স্বায়াত্বশাসন। সত্তরের নির্বাচনের পর তিনি শুধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী-ই হতে চেয়েছেন, এর বেশি কিছু নয়। তবে এতে তার অন্য অবদান খারিজ হয়ে যায় না। বরং সত্য প্রতিষ্ঠত হলে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তার ভূমিকা আরও উজ্জ্বলও হতে পারে। এই ইতিহাস এখন ধীরে ধীরে ফর্সা হচ্ছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা কে? আওয়ামী বয়ানে শেখ মুজিব ছাড়া আর কেউ নন। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। ইতিহাস আরও বলে, ১৯৬২ সালে কিছু ছাত্রনেতা ‘নিউক্লিয়াস’ গঠনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ‘নিউক্লিয়াস’ আজও একটি মিথ হয়ে আছে। ১৯৭২ সালের আগে এ সম্পর্কে কারও কোনো ধারণাই ছিল না। ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন হলেও এর কোনো প্যামফ্লেট বা লিখিত কোনো ডকুমেন্ট নেই। কিন্তু কিছু উদ্যোগ যে তারা নেননি, এটাও অস্বীকার করা হবে অন্যায়। তাঁদের একটা গোপন তৎপরতা অবশ্যই ছিল।
কাঠামোগতভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা আসলে আব্দুল আজিজ বাগমার। এই তথ্য জানা হতো না, যদি ১৯৯৯ সালে তিনি একটি বই প্রকাশ না করতেন। তাঁর প্রকাশিত ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন: উন্মেষ ও অর্জন’ নামে বইটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আরেক ‘সিক্রেট হিস্ট্রি’। বইটির মুখবন্ধে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান চমৎকার একটি মন্তব্য করেছিলেন—’স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের। হলো তা জানতে হলে এ বইটি পড়তে হবে।’
কে এই আব্দুল আজিজ বাগমার? ইতহাস তাঁকে নারায়ণগঞ্জের ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও তার জন্ম গাজীপুরের কালিগঞ্জে। তবে শৈশব, বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জেই। প্রাথমিক পাস করেছেন বার একাডেমি স্কুল থেকে। নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন তোলারাম কলেজে। তোলারাম কলেজেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। হয়েছিলেন তোলারাম কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপিও। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইয়ুব খান তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাসের মধ্যে পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা ‘যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে একটি বড় কাজে হাত দেন। সরকারের শিক্ষাসচিব এস এম শরিফের নেতৃত্বে কমিশন অন ন্যাশনাল এডুকেশন নিয়োগ দেওয়া হয় ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। দেশের সেরা শিক্ষাবিদদের অনেকেই কমিশনের সদস্য হলেন। এটিই পরে শরিফ কমিশন নামে পরিচিতি পায়।
শরিফ কমিশনের খসড়া প্রতিবেদন প্রেসিডেন্টের দপ্তরে জমা পড়ে ২৬ আগস্ট, ১৯৫৯। প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল বিএ পাস কোর্স দুই বছরের পরিবর্তে তিন বছর করা, কোনো একটি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ এবং সব বিষয় মিলিয়ে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেলে পরীক্ষায় পাস হওয়া, প্রাথমিক শিক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত, কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া ইত্যাদি।
শরিফ কমিশনের প্রতিবেদন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ দেশ থেকে সামরিক শাসন তুলে নেওয়া হয়। শুরু হয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন। রাজনৈতিক দলগুলো তখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। অনেকেই মামলা এড়াতে স্বেচ্ছানির্বাসনে গেছেন। আন্দোলনের নেতৃত্বে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্ররা। অনুঘটকের ভূমিকায় ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। তাদের যৌথ নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছিল শিক্ষা আন্দোলন।
শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন কলেজের ছাত্রনেতাদের নিয়ে ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৈরি হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফোরাম। ঢাকার জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি আবদুল্লাহ ওয়ারেস ইমাম এবং নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজের ছাত্রনেতা আবদুল আজিজ বাগমার ছিলেন যথাক্রমে এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬২ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। নারায়ণগঞ্জের একটি ছাত্রসভায় সমবেত সবাই শপথ নেন যে বিজয় ছাড়া কেউ নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাবেন না। তারা আরও শপথ নেন যে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করতে হবে। ছাত্রদের মধ্যে এ ধরনের উচ্চারণ এর আগে শোনা যায়নি। আবদুল আজিজ বাগমারের ভাষ্যমতে, ‘১৯৬২ সালে এ ধ্বনিটি বা স্লোগানটি আমিই উচ্চারণ করেছিলাম। আমি ছিলাম সভার শেষ বক্তা। সবাই উচ্চ কণ্ঠে স্বাধীনতার পক্ষে ধ্বনি প্রদান করে।’
বাগমার আরও লিখেন, ‘তখনকার পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের মৌলিক গণতন্ত্রী চিফ হুইপ এম এ জাহের তাদের নেতাদের সঙ্গে আট দিন সলাপরামর্শ করে আবিষ্কার করল, আবদুল আজিজ বাগমার দেশদ্রোহের ধ্বনি উচ্চারণ করেছে।…অতএব ঘটনার ৯ দিন পর দৈনিক আজাদ পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে জঘন্য অভিযোগ উত্থাপন করল–বাগমার বন্দে মাতরমধ্বনি দিয়েছে, আল্লাহু আকবর দেয়নি। আমি তার প্রতিবাদ করলাম। দৈনিক ইত্তেফাক আমার বক্তব্য সম্পূর্ণটা ছেপেছিল ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে।’
বাষট্টির আন্দোলন শেষ হওয়ার পর ছাত্র ফোরামের নেতারা ইডেন কলেজের নাজমা রহমানের বাবার বাসায় এক গোপন বৈঠকে জাতীয় প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিষয়ে আলোচনা করেন ও সিদ্ধান্ত নেন। ‘কেউ কেউ শপথনামায় রক্তস্বাক্ষর প্রদান করেন। একজন শুধু ওয়াকআউট করেন। তিনি মতিয়া চৌধুরী।’ এভাবেই জন্ম হলো নতুন সংগঠন–‘অস্থায়ী পূর্ববঙ্গ সরকার’, সংক্ষেপে ‘অপূর্ব সংসদ’। দিনটি ছিল ১ অক্টোবর, ১৯৬২। তাঁদের লেখা বিভিন্ন ইশতেহার ও পুস্তিকায় সংগঠনের নাম হিসেবে সংক্ষেপে লেখা হতো ‘অপু’। তারা একটি সরকারকাঠামোও ঠিক করেছিলেন। বেগম সুফিয়া কামালকে রাষ্ট্রপতি ও আবদুল আজিজ বাগমারকে প্রধানমন্ত্রী করে এই রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করা হয়। এর উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই, অধ্যাপক শওকত ওসমান, অধ্যাপক আহমদ শরীফ ও অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী।
অপূর্ব সংসদের মনোগ্রাম এঁকে দিয়েছিলেন শিল্পী প্রাণেশ কুমার মন্ডল। বাগমারের দাবি, বিষয়টি যারা জানতেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। এ ছাড়া রাজনীতিবিদদের মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ বিষয়টি জানতেন। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলগাড়িতে ইন্টার ক্লাসে স্বাধীনতার প্রচারকাজে অংশ নিতেন হাবিবুর রহমান, বাবু সারওয়ার, এ কে এম এ রফিক, নজরুল ইসলাম (মিনা), ফরিদা আক্তার, মনিরুল ইসলাম, আবদুল আউয়াল, লাল মিয়া, শহীদ, মেঘনাদ চন্দ, শান্তিনারায়ণ ঘোষ, কমরউদ্দিন (মন্টু), কামালউদ্দিন আহমদ, আখতারুজ্জামান (মনু), খাজা মহিউদ্দিন, এম এ খালেক, মুক্তা, মতি, মো. আলী, কুতুবউদ্দিন আকসির প্রমুখ।
বাগমার ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তার রুমমেট ছিলেন শেখ রিয়াজউদ্দিন, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ ও খন্দকার মোশারফ হোসেন। এ ছাড়া সিরাজুল আলম খান, আল মুজাহিদী, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুস সোবহান এবং রকিবউদ্দিন আহমদ মাঝেমধ্যে ওই কামরায় আসতেন এবং থাকতেন। তাঁরা সবাই বাগমারের গোপন কার্যকলাপের ব্যাপারে অবহিত ছিলেন বলে বাগমারের ভাষ্যে জানা যায়। এ সময় বাগমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও অপূর্ব সংসদের উপদেষ্টা মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে অস্থায়ী পূর্ববঙ্গ সরকারের জন্য স্বাধীনতার পক্ষে কিছু লিখে দেওয়ার অনুরোধ করলে তিনি ‘বাঙালী কি চায়? স্বাধীনতা’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখে দেন। লেখাটি ‘অপু-১’ ইশতেহার হিসেবে ২১ ডিসেম্বর ১৯৬৩ প্রচার করা হয়।
দ্বিতীয় ইশতেহার, ‘অপু-২’। শিরোনাম দেন ‘শকুন-শৃগালের আবার বাংলা আক্রমণ’। ছদ্মনামে এটি প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আহমদ শরীফ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপূর্ব সংসদের অন্যতম সমন্বয়কারী শান্তিনারায়ণ ঘোষ। ঢাকার ৫৫ পাতলা খান লেনে অবস্থিত কাজী হারুন-অর-রশিদের মালিকানাধীন মোনালিসা প্রেসে এটি ছাপানো হয়। ইশতেহারের শুরুতে বলা হয়, ‘বাংলার ওপর অত্যাচার করে সবাই আনন্দ পায়। কারণ এতে তাদের সম্পদ বৃদ্ধি পায়। শক, হুন, মোগল, পাঠান, পাল, সেন এবং ইংরেজ শতাব্দীর পর শতাব্দী বাংলার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। বাংলাকে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস পেয়েছে। কিন্তু পারেনি। বাংলা নিজেকে বিসর্জন দিয়ে দানের আনন্দ পেয়েছে বারবার। কিন্তু আর কত দিন?’
অপূর্ব সংসদের তৃতীয় ও শেষ ইশতেহারটি ১ অক্টোবর, ১৯৬৫ সালে প্রকাশ করা হয়। এটি লিখে দিয়েছিলেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ। বাগমার এর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন এভাবে -- ‘ড. আহমদ শরীফ সাহেবের নিকট নিয়মিত অনুরোধ করতে থাকি। অতঃপর মে মাসে ‘অপু-৩ ইতিহাসের ধারায় বাঙালী’ স্বাধীনতার তৃতীয় ও চূড়ান্ত ইশতেহারের মূল কপি আমার নিকট হস্তান্তর করেন। তিনি নির্দেশ প্রদান করেন, দ্রুত কপি করে মূল কপি ফেরত দেওয়ার জন্য।’
বাগমার আরও লিখেন, ‘ড. আহমদ শরীফ ওই দুঃসময়ে শতভাগ বিশ্বাস করেছিলেন। এর সকল কৃতিত্ব কেবল তাঁর। তবে ওই বিশ্বাসে কখনো ফাটল ধরেনি। অটুট ছিল। সুলতানা কামালকে দিয়ে দ্রুত কপি করালাম। অন্যদের দেখতে দিলাম…ইতিমধ্যে উপদেষ্টামণ্ডলী দেখা সম্পন্ন করলেন। মুদ্রণের জন্য একজন বিশ্বস্ত প্রেস মালিককে দেওয়া হলো। নাম কাজী হারুন-অর-রশিদ। মোনালিসা ফাইন আর্ট অ্যান্ড প্রিন্টিং প্রেস, ৫৫ পাতলা খান লেন, ঢাকা।’
বাগমারের ভাষ্যে আরও জানা যায়, অস্থায়ী পূর্ববঙ্গ সরকার (অপূর্ব সংসদ) আর বিলম্ব করেনি। ১ অক্টোবর, ১৯৬৫ সাল আমাদের অপু-৩ ইতিহাসের ধারায় বাঙালী বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা প্রকাশিত হলো। রাষ্ট্রপতি কবি বেগম সুফিয়া কামাল ও প্রধানমন্ত্রী আবদুল আজিজ বাগমারের সংক্ষিপ্ত নামে স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়।
বাগমার বলেন, ‘দ্রুত প্রেসক্লাবের নিচের তলায় উত্তর-পূর্ব কক্ষে যেখানে সকল পত্রিকার ফাইল পড়ার জন্য ছিল, তাতে বেশ কিছু কপি রাত ১১টায় রেখে আসা হলো। ওখানে তখন কেউ ছিল না। ইত্তেফাক এর প্রধান সাংবাদিকদের কপি দেওয়া হলো। হাইকোর্ট বারে পৌঁছানো হলো।…ঢাকাস্থ আদমজী কোর্টে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট অফিসে কপি দেওয়া হলো। তবে দুই ঘণ্টার মধ্যে পাক গোয়েন্দারা এই কপি পেয়ে যায়। এমনটা হতে পারে, এ আশঙ্কা আমাদের ছিল। দেওয়া হলো সেগুনবাগিচায় অবস্থিত ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনে। সম্ভবত ক্ষিতীশ সেন বা সেন বলে একজন ছিলেন। চীনসহ অন্যদের কপি দেওয়া হলো।’
মনীষা আহমদ শরীফ তাঁর স্বদেশ অন্বেষা গ্রন্থের ‘বিশ শতকে বাঙালী’ নামক প্রবন্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের উন্মেষকালের একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘উঠতি শিক্ষিত বাঙালী আশাভঙ্গে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল ১৯৫৭-৫৮ সনেই; কোনো কোনো সাংসদ রাজনীতিক স্বায়ত্তশাসন দাবির স্বপ্নও দেখেছিলেন। ভাষার দাবিতে প্রগতিশীলদের আন্দোলন ও ক্ষোভ ক্রোধ ক্রমেই শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে তাল রেখে তীব্র হতে থাকল। এ সময় ১৯৬৫ সনে আবদুল আজিজ বাগমার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক ছাত্র স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সাধ বাস্তবায়নের জন্যে ছাত্র ও নেতা হিসেবে পন্থা আবিষ্কারে ও উপায় উদ্ভাবনে সক্রিয়ভাবে গোপনে কাজ শুরু করলেন। ঢাকার কিছু শিক্ষককে করলেন উপদেষ্টা। পরে ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি হয়েই শেখ মুজিবুর রহমান দাবি জানালেন অভীকচিত্তে ছয় দফা পূরণের। এর কিছু পরে মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমুখ কিছু সামরিক বিভাগের বাঙালী সেনানী আগরতলা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কিংবা অন্যভাবে স্বাধীনতা অর্জনে প্রয়াসী হলেন।’
তথ্যসূত্র: মহিউদ্দিন আহমদ, প্রতিনায়ক: সিরাজুল আলম খান; আব্দুল আজিজ বাগমার, স্বাধীনতার স্বপ্ন: উন্মেষ ও অর্জন; আহমদ শরীফ, স্বদেশ অন্বেষা।
পরিশিষ্ট: ১৯৬৭ সালের ২ নভেম্বর উচ্চ শিক্ষার জন্য আব্দুল আজিজ বাগমার লন্ডনে চলে যান। তিন বছর লন্ডনে থেকে সস্ত্রীক দেশে ফিরে আসেন ১৯৭০ সালের দিকে। তাজউদ্দীন আহমদের ধানমন্ডির বাসায় দোতলায় ভাড়া থাকতেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সেখান থেকেই পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেপ্তার হন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস কারাগারেই ছিলেন বাগমার। দেশ স্বাধীনের পর আবার তিনি লন্ডন চলে যান। পরে দেশে এসে তাজউদ্দীন আহমদের বাড়িতেই ভাড়ায় ওঠেন। ২০১১ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি প্রয়াত হন।
তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ তাঁর ‘তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আব্দুল আজিজ বাগমারের স্ত্রী আতিয়া বাগমারের বুদ্ধিমত্তায় সেদিন তাঁদের পুরো পরিবার রক্ষা পেয়েছিল
লোড হচ্ছে...