জাতীয়
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জন-আকাঙক্ষা ও বাস্তবতা।। রফিউর রাব্বি
NewsView

রফিউর রাব্বি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিপ্লব, গণ-বিদ্রোহ, ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান ইত্যাদি বিশেষণে বিভিন্ন জন এখনো যেমনি সংজ্ঞায়িত করে চলেছেন, সাথে সাথে চলছে এর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন ভাবে বিশ্লেষণ। সে যাই হোক, এ সব গণ-বিদ্রোহ হচ্ছে প্রচলিত নিয়ম বদলাবার প্রয়োজনে অনিয়মতান্ত্রিক গণ-বিস্ফোরণ, নতুন নিয়ম তৈরির গণ-কর্মযজ্ঞ- যা অনিয়মতান্ত্রিক পথে সংঘটিত হয়। ঠিক পুরোনো সব নিয়ম অনিয়মের ঝড়ে ভাঙার মতো। অনিয়ম যখন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় তখন গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এইটি যেমনি ছকে বাধা কোন পথে অগ্রসর হয় না, তেমনি এর শুরুতে কাক্সিক্ষত নতুন নিয়ম সম্পর্কেও আন্দোলনে অংশীজনদের কোন সুনির্দিষ্ট পূর্বপরিকল্পনা থাকেনা।
এ অভ্যুত্থানকে সামনে রেখে যদিও কেউ কেউ ‘মেটিকুলাস ডিজাইন তত্ত্ব’ সামনে আনছেন তা নিতান্তই রাজনৈতিক কারণে। সমাজ বিজ্ঞানে ‘কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা’ নিয়ে একধরণের তত্ত্বের প্রচলন আছে। এই তত্ত্ব অনুসারে, সামাজিক বা অর্থনৈতিক বিষয়াদি আগে থেকে পরিকল্পনা করে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায় না। নোবেল বিজয়ী ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ফ্রেডরিক হায়েকের একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে, “অর্থশাস্ত্রের কৌতুহল জাগানো কাজ হলো মানুষকে দেখানো যে যেটাকে তারা পরিকল্পনা করবেন বলে মনে করেন, সেটা তাদের কতটা অজানা।” হায়েক আবার কল্যাণরাষ্ট্র ও সমাজতন্ত্রের সমালোচনা করে কুখ্যাতিও কুড়িয়েছেন। আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছক এঁকে, খুব পরিকল্পনা করে শুরু হয়নি। বৈষম্যটি ছিল দৃশ্যমান। আমাদের এখানে চালের মণ ৩০ টাকা, পশ্চিম পাকিস্তানে ২০ টাকা, আমরা নির্বাচনে জিতেছি; কিন্তু ওরা ক্ষমতা দেবে না, জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণ বঙ্গে ৫ লক্ষ (পাকিস্তান সরকারের হিসেবে, আন্তর্জাতিক ভাষ্য ১০ লক্ষ) মানুষের মৃত্যু হলো-ওরা কেউ দেখতে এলো না-ইত্যাদি। সোনার বাংলা শ্মশান কেন?-এই প্রশ্নে বৈষম্য ও অনিয়ম ভাঙ্গার স্বপ্নে মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দেশ স্বাধীন হলো। সংবিধান তৈরি হলো। তাতে লেখা হলো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মানুষের মধ্যে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। মানুষ সমতা চেয়েছিল, স্বাধীনতা চেয়েছিল, বৈষম্য থেকে মুক্তি চেয়েছিল, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়-বিচার চেয়েছিল, খেয়ে-পরে বাঁচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা চেয়েছিল। সে সময়ের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা সংবিধানে এ কথাগুলো সংযোজনের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাতে মনে হয়েছিল আমাদের দেশটা আমরা হয়তো সে পথেই নিয়ে যাবো; কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। পশ্চিমাপন্থী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে তাঁর নিজস্ব পথেই যাত্রা শুরু করলেন। সংবিধানে লেখা চারটি মূলনীতির কোনটিই তাঁর শাসনামলে সামান্যতম গুরুত্ব পায়নি। পরবর্তী কোন সরকারের শাসনামলে তা পায়নি।
শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে কর্তৃত্ববাদী ধারা প্রবর্তন করেন। নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীকে অসীম ক্ষমতার অধিকারী করেন। যা আজকে কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসনের ভিত্তি বলে বহুল আলোচিত হচ্ছে। বিগত সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলী খান বলেছিলেন, “রাশিয়ায় জার বা জার্মানিতে হিটলারেরও সে ক্ষমতা ছিলনা যা আমাদের সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছে।”
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে উচ্ছৃঙ্খলতা চরমে পৌঁছেছিল। ব্যাংক-বীমা, হাট-বাজার লুট, প্রতিপক্ষকে রাজাকার বলে হত্যা, লুটের টাকা ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বলে হত্যা, সীমাহীন দুর্নীতি- এ সব অব্যাহত ছিল চুয়াত্তর পর্যন্ত। তিয়াত্তরে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণার পরেও ফলাফল বদলে দেয়ার মধ্যদিয়ে স্বাধীন দেশে নির্বাচনে ভোট কারচুপির পালা শুরু হয়েছিল। এ সব অরাজকতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে আসে। সরকারি হিসেবে দুর্ভিক্ষে ২৭ হাজার মানুষের মৃত্যু বলা হলেও বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসেবে তা ১ থেকে সাড়ে ৪ লক্ষ। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে অমর্ত্য সেনের একটি গবেষণা রয়েছে। তিনি তাতে বলেছেন, “কেবল খাদ্য সংকটের কারণে দুর্ভিক্ষ হয়নি। অন্য বারের তুলনায় সে বছর খাদ্য উৎপাদন হয়েছিল বেশি। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস এবং সরকারের ভুল পদক্ষেপ দুর্ভিক্ষের কারণ।”
শেখ মুজিবের একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, “সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সাড়ে সাত কোটি কম্বল, আমার কম্বল কই?” চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ ও বন্যায় রিলিফের কম্বল বিতরণের সময় এক সমাবেশে তিনি এ কথা বলেছিলেন; কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে তিনি যখন এ কথা বলছেন, তখন তাঁর পাশেই ছিলেন কম্বল আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি। এ সব কারণে মানুষের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল। অন্যদিকে অব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনী তৈরি করেন; কিন্তু এই রক্ষীবাহিনী সরকার-বিরোধীদের বিরুদ্ধে হিংস্র হয়ে ওঠেছিল। রাষ্ট্র-বিরোধী আখ্যা দিয়ে তারা জাসদের ২৫ থেকে ৩৫ হাজার গণবাহিনীর যুবকদের হত্যা করেছে। এই রক্ষীবাহিনী গঠনকে সেনাবাহিনীও ভালোভাবে নেয়নি। এইটিকে তারা সেনাবাহিনীর বিকল্প শক্তি হিসেবে মনে করেছে। সরকারি দল ‘এক নেতা এক দেশ- বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ বলে যখন গণতন্ত্রের কবর খুঁড়ছে তখন শেখ মুজিব তা থামাতে চাননি। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। অন্যদিকে একাত্তরে পরাজিত রাজাকার-আলবদররা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিরাজমান ছিল। পঁচাত্তরের মর্মান্তিক ঘটনা যখন সংঘটিত হয় তখন শেখ মুজিব যেমনি জন-বিচ্ছিন্ন, তেমনি দল-বিচ্ছিন্ন। স্বাধীনতা পূর্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আর স্বধীনতা উত্তর শাসক শেখ মুজিবের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছিল আকাশ আর পাতাল। ঊনসত্তরে যারা তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিলেন তাদের অনেকেই বাকশাল গঠনকালে তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেলেন। পঁচাত্তরে তাঁর জনপ্রিয়তা তলানীতে।
এখানে একটি বাস্তবতা আলোচনার দাবি রাখে। আর তা হচ্ছে, স্বাধীনতার পর দেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ, বিরোধী দলে কমিউনিস্ট পার্টি-ন্যাপ। মাঠে পরাজিত দল জামায়াত নেই, ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক-প্রতিক্রিয়াশীল কোন দল নেই, বিএনপির জন্ম হয়নি। এমনি বাস্তবতায় জাসদের জন্ম হলো। বলা চলে ঝলসে উঠল দলটি। এদেরকে দমাতে মুজিব সরকার নিষ্ঠুর হয়ে উঠলো। প্রশ্ন হচ্ছে সরকারের সেই দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি কেন যথাযথ প্রতিবাদ করেনি, সরব হয়ে ওঠেনি। বিরোধী দল হিসেবে কেন তারা যথাযথ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হলো তা রাজনীতির জাতীয় চরিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় ন্যাপ-সিপিবির বহু সমাবেশ আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পণ্ড করে দিয়েছে। তিয়াত্তরের নির্বাচনে ন্যাপ-সিপিবির প্রার্থীকে জোর করে পরাজিত করা হয়েছে, সে বছর পহেলা জানুয়ারি ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে মতিউল ইসলাম ও মির্জা কাদেরকে রাজপথে পুলিশ নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্য মতে একাত্তরে গঠিত মুজিব-বাহিনী পাক-সেনাদের বিরুদ্ধে যতটানা তৎপর ছিল তার চেয়ে বেশি তৎপর ছিল বামপন্থী নিধনে। এমনি বাস্তবতা ও শাসকগোষ্ঠীর ক্রমাগত ব্যর্থতার পরেও রাজনীতির মাঠ জনমত কমিউনিস্টদের পক্ষে না এসে কি ভাবে প্রতিক্রিয়াশীলদের পক্ষে চলে গেল সে জরুরী প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ উদারপন্থী থেকে বুর্জোয়া পরে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠার ধারাবাহিকতায় এ দল সম্পর্কে কমিউনিস্টদের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ আজকের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী জামায়াত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর উত্থানের কারণ বোঝার জন্য জরুরী।
দুই।
আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা’র কথা উল্লেখ আছে। আবার একই ভাবে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধি-নিষেধ’-এর কথাও বলা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই বিভিন্ন গণবিরোধী আইন এখনও বলবৎ আছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: ২০১৮ (বর্তমানে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ: ২০২৫), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন: ২০০৬, স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট: ১৯৭৪, ফৌদারি কার্যবিধি: ১৮৯৮, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (অনুপ্রবেশ) আইন: ১৯৭২, ধর্মীয় অবমাননা সংক্রান্ত আইন (দণ্ডবিধি: ১৮৬০), মুদ্রণ ও প্রকাশনা আইন: ১৯৭৩, অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট: ১৯২৩, বিশেষ ট্রাইবুনাল আইন: ১৯৭৪ ইত্যাদি। রাষ্ট্রের এই সমস্ত আইন প্রতিনিয়ত বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে চলেছে। গণসার্বভৌমত্ব (পপুলার সভরেন্টি) হচ্ছে জনগণই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূলউৎস। আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। শাসকগোষ্ঠী হরহামেশা এ কথাটি উচ্চারণ করেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকের গণসার্বভৌমত্বকে হরণ করে থাকে। রাষ্ট্রকে সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠার ধারণাই গণসার্বভৌমত্ব বিরোধী আইনকে বৈধতা দেয়। এ সবই পশ্চিমা রাষ্ট্রের পুরোনো সার্বভৌমত্ব ধারণা প্রসূত। এই পশ্চিমা ‘লিবারেলিজম’ বা নির্বাচনবাদী রাজনীতির ভেতরেই নিহিত থাকে ফ্যাসিবাদ তৈরির অবকাঠামো; কিন্তু এই নির্বাচনবাদী রাজনীতি বর্তমান-বিশ্বে প্রধানতম হলেও হিটলার, মুসোলিনি এই নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমেই নিজ নিজ দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। শেখ হাসিনাও সে পথেই এ দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করে স্বৈরশাসক হয়ে উঠেছিলেন; কিন্তু এ ব্যবস্থা সব দেশে সমান ভাবে কার্যকর হয়নি। অনেক দেশেই তা সুফল বয়ে এনেছে; কিন্তু বুর্জোয়া এই শাসনব্যবস্থার মধ্যদিয়ে কখনো গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তা আবার স্বৈরশাসনে পিষ্ট হওয়ার নজিরও বিশ্বে রয়েছে। স্পেন ও চিলি তার উদাহরণ।
পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরে স্বাধীন দেশে জিয়াউর রহমান প্রথম সামরিক শাসন জারি করেন। পরে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরে ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় দফায় সামরিক শাসন জারি করেন জেনারেল এরশাদ। মুজিব সরকারের পরে একই ভাবে গণতন্ত্রকে নির্বাসন দিয়েছেন সামরিক শাসকেরা। সামরিক শাসনের অনেক কিছুই পূর্বের ধারাবাহিকতায় পরিচালিত হয়েছে। জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহেরসহ বহু মেধাবী সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছেন। আবার জিয়াউর রহমানকে হত্যার জন্য এরশাদকে দায়ি করা হয়। জিয়া ও এরশাদের শাসনামলে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও কোনটিই দেশে-বিদেশে স্বচ্ছ বলে বিবেচিত হয়নি। অবশ্য দলীয় তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত কোন জাতীয় নির্বাচনই এ দেশে স্বচ্ছতার মানদণ্ডে কখনো উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ১৯৯৪ সালে বিএনপির শাসনামলে কারচুপি-পূর্ণ মাগুরা উপ নির্বাচনের কারণে আমাদের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটে। বিগত ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে দল-নিরপেক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাপনায় ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ এবং সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পাঁচটি নির্বাচন কম ত্রুটিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে; কিন্তু ২০১১ সালে শেখ হাসিনা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে নিজের কফিনে নিজেই পেরেক ঠুকেন।
ঊনসত্তর, নব্বই ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান চরিত্রগত দিক থেকে ভিন্নতর হলেও এ সব অভ্যুত্থানই শাসকগোষ্ঠীর বদল এনে দিয়েছে। তবে আইয়ুব খান ও এরশাদ উর্দি পড়া স্বৈরশাসক হলেও শেখ হাসিনা রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠে কুশাসন, দুর্নীতি ও নিপীড়নে কুখ্যাতি অর্জন করেছেন। অন্যদের দেশ ত্যাগ করতে না হলেও শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন, দলেবলে দেশ ছেড়েছেন। এরা সকলেই নিজেদের স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে বরাবরই উন্নয়নের বয়ান হাজির রেখেছেন।
জুলাই আন্দোলনটি শুধুমাত্র কোটা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে শুরু হলেও পরে তা পুরোপুরি রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করেছে। বিভিন্ন আন্দোলনের ক্ষেত্রেতা-ই হয়ে থাকে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিশু-কিশোরদের যানবাহনে, রাস্তায় লিখতে দেখা গেছে ‘রাষ্ট্রের সংস্কার বা মেরামত চলছে’; কিন্তু জুলাই আন্দোলন দমাতে সরকার ছাত্র-জনতার উপর রাষ্ট্রের সর্বশক্তি ব্যবহার করেছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবিকে ব্যবহারসহ হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুঁড়েছে। গত দেড় দশকে মানুষের, বিভিন্ন গোষ্ঠীর ছোট ছোট পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, ছোট ছোট বিদ্রোহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শক্তি যুগিয়েছে। একদিকে যেমনি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন, গুম-খুনবিরোধী আন্দোলন, সম্পদ রক্ষার আন্দোলন- অন্য দিকে শাসকগোষ্ঠীর জেলায় জেলায় মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে ভিন্ন মতকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ, দুর্নীতি, আয়নাঘর, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার, বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দলীয় গডফাদারদের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা, প্রতিটি স্বায়ত্ব শাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে দলীয়করণ করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন- এ সবই জুলাইগণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রেখেছে।
জুলাইয়ে দেয়ালে দেয়ালে ছাত্ররা গ্রাফিতি লিখেছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ধর্মীয়, জাতিগত, লৈঙ্গিক-সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ, সমতল-পাহাড়ি নির্বিশেষে। এ আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছে নারীরা, শ্রমজীবী, রিক্সাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, কারখানার শ্রমিক, কর্মচারী, মাদ্রাসার ছাত্র, রাজপথের ভাসমান শিশুরা। ডান, বাম, মধ্যপন্থী, ধর্মীয় সংগঠন নির্বিশেষে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। চব্বিশে আমরা ইতিহাসের দীর্ঘতম জুলাই অতিক্রম করতে দেখেছি। ৩৬ জুলাই। কিন্তু পরিবর্তনের পরে অভ্যুত্থানের মালিকানা নিয়ে রাজনৈতিক-রশি-টানাটানি শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা যেমনি একক ভাবে দাবি করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ইতিহাসে বিকৃতি এনেছে; এ যেন ঠিক তারই ধারাবাহিকতা। আমরা জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের পরিসংখ্যানটি দেখলে এ অভ্যুত্থানের শ্রেণি-চরিত্রটি উপলব্ধি করতে পারবো। তবে এইটি সত্য যে, শেখ হাসিনার পনের বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নামেনি। প্রচলিত রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের অনাস্থা এর প্রধানতম কারণ। যখন ছাত্ররা রাস্তায় নামল, বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়াল, দলে দলে অকাতরে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে থাকল; তখন কেউই ঘরে থাকতে পারেনি। এই কৃতিত্ব অবশ্যই ছাত্রদের প্রাপ্য। তাই বলে জুলাই অভ্যুত্থানের গণ-চরিত্রকে অস্বীকার করে কেবল ছাত্রদের মালিকানা দাবি কোন ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। পাশাপাশি এ-ও মনে রাখতে হবে আমাদের গৌরবের সকল অধ্যায়ের সূচনা প্রথমে ছাত্ররাই করেছে। বায়ান্ন, বাষট্টি, ঊনসত্তর, নব্বই সবই তার উদাহরণ। জনযুদ্ধ একাত্তরের সূচনাটা ছাত্রদের হাত ধরেই হয়েছে।
তিন।
৫ আগস্টের পরে আমরা দেখি জাতিবাদী শক্তির শূন্যতায় ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তি ফ্যাসিবাদের জায়গা দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের কিছু অংশের বিভিন্ন কার্যক্রম ‘মব জাস্টিস’ হিসেবে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমনি আতঙ্ক তৈরি করেছে; পাশাপাশি সুফি, বাউল ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার ভীতি তৈরি করেছে। শতাধিক মাজার ও খানকায় আক্রমণ করা হয়েছে। মন্দির ও মসজিদে হামলা হয়েছে। নাটক, সিনেমা, বাউল মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা করা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তুলে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে, যে নারীরা আন্দোলনে সাহসের সাথে বুলেটের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল পরে সে নারীদের প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হয়েছে। সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম নারীদের বিরুদ্ধে কুরুচিকর ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ সবের বিরুদ্ধে কার্যত কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পুলিশের গণবিরোধী ভূমিকায় জনমনে তাদের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল; পরবর্তী সময়ে এমনকি এখনও পর্যন্ত পুলিশ সে অবস্থা কাটিয়ে নিজেদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারেনি। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় মব-সন্ত্রাসীরা উৎসাহ পেয়েছে। সেনা বাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে নামলেও পরিস্থিতিতে তার প্রভাব পড়েনি। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সঙ্গীত ও সংস্কৃতি নিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের একটি অংশের বিভিন্ন মন্তব্য জনমনে মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতি প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান নিয়েই তৈরি হয়েছিল ক্ষোভ। মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকারী আওয়ামী লীগের দখলদাররা সদলবলে পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের দখলে থাকা হাট, ঘাট, মাঠ, বাজার, পরিবহন, মাদক, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু পরে বিএনপির নতুন দখলদারদের দখলে চলে গেছে। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বিএনপির বিভিন্ন অংশে ঠাঁই করে নিচ্ছে। এমনকি জামায়াতের দলেও তারা ঢুকে পড়ছে। অপরাধীদের সাথে নিরপরাধীদের যুক্ত করে আওয়ামী আমলের মতো অবাধে মামলা বাণিজ্য চলেছে। নতুন নতুন সিণ্ডিকেট তৈরি হচ্ছে। এ সবই হচ্ছে প্রশাসনের জ্ঞাতসারে। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই ২০২৩ সালে বিগত সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দিতে যে চুক্তি করেছিল, তা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার তৎপরতা। ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র তিনদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার সাথে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে আত্মঘাতি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। উপদেষ্টাদের তত্ত্বগত দিক থেকে প্রাজ্ঞ মনে হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অদক্ষতা ও ব্যর্থতা দেশের স্বার্থ রক্ষার বিরুদ্ধে গেছে।
চব্বিশের আন্দোলনের অংশীজনদের মধ্যে মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রবল হয়ে উঠেছিল। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল। রিক্সাওয়ালা, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র-ব্যবসায়ী যেভাবে রাস্তায় নেমেছিল ৫ আগস্টের পরে ঠিক সে ভাবেই তারা ঘরে ফিরে গেছে। তারা আশাহত হয়েছে। দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে শ্রমিকরা নাজেহাল হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে, তাদের উপর গুলি চালানো হয়েছে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক নিহত হয়েছেন। চব্বিশের অভ্যুত্থান উত্তর দেশে এমন হওয়ার কথা ছিলনা। বৈষম্য বিরোধের বদলে বৈষম্যবাদী মতাদর্শীরা প্রবল হয়ে উঠেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সরকারি গেজেটে যে ৮৪৪ জনকে শহীদ দেখানো হয়েছে তাতে শ্রমজীবী ২৮৪, শিক্ষার্থী ২৬৯, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ১২০, চাকরিজীবী ১০৮ এবং ২৯ জন অন্যান্য। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ৮০ শতাংশই ছিল কৃষকের সন্তান। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আমাদের জনযুদ্ধ, গণসংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থান- এ সবে শ্রমজীবীদের সিংহভাগ অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাদের স্বার্থ বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। অথচ তাদের চাহিদা কখনো খুব বেশিছিল না, সব সময়তা একই ‘অন্নচাই, প্রাণচাই, আলোচাই, চাই মুক্ত বায়ু,/ চাইবল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু।’ এটুকুর জন্য আত্মদান, সংগ্রাম, রাজনীতি কত কী! তবে আশার কথা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কার নিয়ে যে ১১টি কমিটি গঠিত হয়েছে; এর মধ্যে ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’ সরকারের কাছে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি, শ্রমঘণ্টা, কর্মপরিবেশসহ ২৫টি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সুপারিশ উত্থাপন করেছে; কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকার এ সব সংস্কারের দাবিকে কতটা আমলে নেয়। অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের সংগঠন এনসিপির আলোচনাতেও শ্রমিকের কথা গুরুত্ব পায়নি। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দিক থেকে দলটিকে শিশুই বলা চলে। তাদের আচরণ, কথা ও কাজের অমিল ইতোমধ্যেই জনমনে নানাহ প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে তরুণদের বড় একটি অংশ যে, তাদের দিকে তাকিয়ে আছে আমরা তাদের পদযাত্রায় অংশগ্রহণ থেকে তা বুঝতে পারি; কিন্তু আখেরে দলটি কতদূর যাবে তা নিয়ে এখনি যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডে অর্থের যোগান এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে নানান প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এখানে একটি তথ্য মনে রাখা জরুরী যে, এখন আমাদের ভোটারদের ৪০ শতাংশ নতুন ও তরুণ। যারা জাতীয় নির্বাচনে এবারই প্রথম ভোট দিয়েছে। যে অংশটি প্রচলিত রাজনীতিকে সমর্থন করে না। জুলাই অভ্যুত্থান তারই প্রমাণ। সুতরাং রাজনীতির নতুন মেরুকরণের চিত্রটি আমরা হয়তো অচিরেই বুঝতে পারবো।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও সংস্কার কমিশনগুলো যে ‘জুলাই সনদ’ তৈরির কাজ করছে, তাতে সংবিধান, নির্বাচন প্রক্রিয়া, বিচার ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, আনুপাতিক হারে ভোট, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ইত্যাদিসহ বেশ কিছুবড় পরিবর্তনের আভাস দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনোত্তর বিএনপি সরকার তা কতটা বাস্তবায়নের পথে যাবে সেইটিই এখন দেখার বিষয়। আমাদের রাজনীতিতে ‘সংস্কার’ কথাটির একটি নেতিবাচক অর্থ রয়েছে। এক-এগারোতে তার উৎপত্তি। সংস্কারপন্থী হিসেবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, সে সময়ে তাদেরকে রাজনীতিতে নেতিবাচক ভাবেই হাজির করা হয়েছে; কিন্তু সংস্কার প্রগতিরই একটি প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়ত সংস্কারের মধ্যদিয়েই সভ্যতা, সমাজ অগ্রসর হয়, বিকশিত হয়। আমাদের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে প্রতিনিয়ত সংস্কার বা পরিবর্তন। এখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে কাজগুলো করতে চাচ্ছে, তা রাতারাতি হয়ে যাবার বিষয় নয়। একটা ফ্যাসিবাদী রেজিমকে উৎখাত করেই গোটা রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে বদলে দেবো-বিষয়টি এমন নয়। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ ও দর্শন রয়েছে। মেনিফেস্টো বা নির্বাচনী ইশতেহার আলাদা। সবকিছুকে এক জায়গায় নিয়ে আসা কখনো সম্ভব নয়। মতৈক্যের বিষয়টি হবে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’। জুলাই সনদের এ বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে পারলেই বড় অর্জন হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় গিয়ে দল আর তা বাস্তবায়নের পথে হাঁটে না। ৯০ পরবর্তী সময়ে তিন জোটের রূপরেখা কেউই মানেনি। ইতোমধ্যে আমাদের সংবিধানে কাটাছেঁড়া কম হয়নি। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতা যেমনি আছে পাশাপাশি রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও আছে। আবার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ও আছে। একসাথে সবই রইল। কোনটাকে বাদ দেয়া গেল না। এমন উদ্ভট বিষয় বিশ্বে বিরল। একে আবার আমাদের কিছু বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক দল বিশ্বসেরা সংবিধান বলে তৃপ্তি পান। ১৯৮৮ সালে জেনারেল এরশাদ যখন অষ্টম-সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেন, তখন প্রায় সব বিরোধী রাজনৈতিক দল এর বিরোধীতা করলেও ক্ষমতায় গিয়ে তারা আর তা বদলাতে চায়নি।
চার।
শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ভারত। কেন ভারত শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল তা খতিয়ে দেখা আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য জরুরী। আমাদের রাজনীতিতে ভারত সব সময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাসিনার শাসন টিকিয়ে রাখতে নিয়ম-কানুন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের কিছুই তোয়াক্কা না করে ভারত যেমনি বাংলাদেশের জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, শেখ হাসিনাও তেমনি ভারতের স্বার্থ রক্ষায় দেশের স্বার্থকে অকাতরে জলাঞ্জলি দিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভারতকে যা দিয়েছি সেটি তারা সারা জীবন মনে রাখবে।’ কিন্তু কী দিয়েছেন তিনি বা তার সরকার তা কখনো প্রকাশ করেনি। হাসিনার শাসনামলের দেড় দশকে ভারতের সাথে ২০টি চুক্তি ও ৬৬টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখবো এ সব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের অধিকাংশই সম্পাদিত হয়েছে ভারতের স্বার্থ রক্ষার জন্য।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার জন্য ভারতের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে শেখ হাসিনা ২০১০ সালে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন। সে চুক্তির অধীনে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটারের মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া দেয়, যা ১৯৭৫ সালে ভারত-বাংলাদেশের সম্পাদিত ‘যুগ্ম-সীমান্ত নির্দেশাবলী’র সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কোন ধরনের শুল্ক ছাড়া বিনা পয়সায় ভারতকে ট্রানজিট দেয়া, চারটি নদী-পথ ব্যবহার, রেল-পথ ব্যবহারসহ বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সে সময় এ সবের বিরোধীতা করলে সরকারের পক্ষ থেকে ট্রানজিটের বিনিময়ে বাংলাদেশ ইউরোপ-সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে বলে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। ট্রানজিটের বিরুদ্ধে সিলেটে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুললে সে সময় বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুমের শিকার হতে হয়েছে।
কোন রকম বিকল্প না রেখে শেখ হাসিনা দেশের আমদানী বাজারকে ভারতের হাতে একচেটিয়াভাবে তুলে দিয়েছেন। এমন এক বাজারব্যবস্থা তিনি তৈরি করেছেন যেখানে ভারতের পণ্য ছাড়াও অন্য দেশের অনেক পণ্য ভারতের মাধ্যমে আমদানী করতে হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে স্থলপথে ভারত থেকে ১ কোটি ৫০ লক্ষ ৫০ হাজার ৩৬৩ টন পণ্য আমদানী করা হয়েছে। বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানী করেছে ৯ লক্ষ ৭৮ হাজার ৪৩৮ টন। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ হাজার ১৬০.৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখানে বাণিজ্যের ৯৪ শতাংশ ভারতের অনুকুলে; যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরল।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট; কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৬ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট। চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হলেও শেখ হাসিনা ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেন। শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে ভারত সফরে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু গৌতম আদানীর ‘আদানী পাওয়ার’র সাথে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি করেন। আমাদের জ¦ালানী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ চুক্তি দেশের স্বার্থে নয় শেখ হাসিনা আদানী পাওয়ারকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে নরেন্দ্র মোদীকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য করেছেন। এর আগে ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় এলে প্রথম ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে হাসিনা সরকার। সে সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অর্থনীতিবিদরা চুক্তিপত্র প্রকাশের দাবি করলেও সে চুক্তিপত্রের কোন কাগজ প্রকাশ করা হয়নি। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরে ১৫৮ পৃষ্ঠার এ অসম চুক্তিটি এখন জনসমক্ষে এসেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানাচ্ছে এ জন্য প্রতিমাসে অতিরিক্ত ৭০০ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী ২৫ বছরে ২৩.৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভারতকে দিতে হবে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদয় রিজার্ভের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিদেশী কর্মরতরা সর্বমোট ৯ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার রেমিটেন্স দেশের বাইরে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে ভারতে গেছে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার।
দেশের স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমিক পর্যায়ের ১ কোটি ৮৯ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিবছর ২৩ কোটিরও বেশিবই এর প্রয়োজন হয়। এনসিটিবির এ বই ছাপানোকে কেন্দ্র করে দেশে বড় একটি প্রকাশনা শিল্প গড়ে উঠেছিল, যার সাথে কয়েক লক্ষ লোকের কর্ম-সংস্থান তৈরি হয়েছিল; কিন্তু ২০০৯ সালে হাসিনা সরকার গঠনের পর বই ছাপার এ দায়িত্ব ভারতের কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার হাতে তুলে দেয়া হয়। সে সময় এর প্রতিবাদে প্রকাশকদের আন্দোলনেও ফল হয়নি। গত অক্টোবরে পূর্বের সিদ্ধান্ত বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার বই ছাপাবার নতুন দরপত্র আহ্বান করেছে।
ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন ভারতের ছত্তিশগড়ে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করার জন্য ভারত সরকারের অনুমতি চায়। সে দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রকল্পটিকে পরিবেশের জন্য ‘মারাত্মক ক্ষতিকর’ বলে প্রতিবেদন দেয়ায় ভারত সরকার তা নাকচ করে দেয়; কিন্তু ২০১০ সালে শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে ভারত সে ‘মারাত্মক ক্ষতিকর’ প্রকল্পটি বাংলাদেশকে গছিয়ে দিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। সে স্মারকে দুই দেশ যৌথ ভাবে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১২ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপালে দুইটি ৬৬০ ইউনিটের ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি স্বাক্ষর করে। সুন্দরবন ধ্বংস করে এ প্রকল্পকরা নিয়ে দেশ বিদেশের জ¦ালানী-বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবাদী, রাজনীতিবিদ, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রবল আপত্তির পরেও শেখ হাসিনা সে প্রকল্প থেকে সরে আসেননি। ২০২২ সালে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু করা হলেও কারিগরি ত্রুটি, কয়লা সংকট ও অন্যান্য কারণে এখন পর্যন্ত মোট সাত বার প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রকল্পে নির্মাণ-শ্রমিক থেকে শুরু করে কারিগরি কাজে যুক্ত অধিকাংশই ভারতীয়। যারা আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত সব কিছুই ভারত থেকে আনেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা এমন সময় রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প চুক্তি করেন যখন সারাবিশ্ব পরিবেশের জন্য হুমকি বলে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করে দিচ্ছে। ক্ষমতা হারানোর দুই মাস আগে শেখ হাসিনা ভারতে গেলে সেখানে রেল ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর করেন। একতরফাভাবে ভারতকে সুবিধা দিয়ে করা সে চুক্তিকে সে সময় দেশের বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদরা সংবাদ মাধ্যমে গোলামীর-চুক্তি বলে অবহিত করেন। তারা সে চুক্তি প্রকাশের দাবি জানালেও তা প্রকাশ করা হয়নি। এমনি বহু অসম চুক্তি শেখ হাসিনা ১৫ বছরে ভারতের সাথে স্বাক্ষর করেছেন। যার অধিকাংশই গোপনে, সংসদকে পাশকাটিয়ে। ভারতকে সুবিধা দিতেই শেখ হাসিনা নিজের দেশের স্বাস্থ্য খাতকে দুর্বল করে রেখেছেন বলে স্বাস্থ্য খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শেখ হাসিনার এ সব দুষ্কর্মের ফিরিস্তি দিলে কলেবর আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে। হাসিনা যেমনি ভারতের স্বার্থ রক্ষায় হয়ে উঠেছিলেন বেপরোয়া অন্যদিকে তাকে ক্ষমতায় রাখতে ভারতও হয়ে উঠেছিল নির্লজ্জ। যার ফলে আমাদের দেশে ক্রমান্বয়ে হাসিনা বিরোধীতা ভারত বিরোধীতায় রূপ নিয়েছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ভারত। ভারতের এ ভূমিকায় তাদের সকল অংশীজনের সমান অবস্থান মনে করলে বড় ধরণের ভ্রান্তি তৈরি হবে। সে যুদ্ধে ভারত সরকার, মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির লক্ষ্য ও স্বার্থ এক ছিল না। সেখানকার বাঙালিদের বড় একটি অংশের নাড়ি পড়ে আছে এই বাংলায়। যাদের আত্মীয়-স্বজন এখনও বাংলাদেশে। দুই বাংলার রয়েছে অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি। দিল্লির মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীদের স্বার্থের কথা রবীন্দ্রনাথই বলে গিয়েছেন বহু আগে। তাদের চিন্তায় সঙ্গত কারণেই মুনাফাই প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ। আর মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের সমর্থনের কারণ যতটা না মানবিক তার চেয়ে বেশি তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান ভাঙ্গার সুযোগ ভারত সরকার হাতছাড়া করবে না এটাই বাস্তবতা। ঐতিহাসিকভাবেই ভারত সরকারের সমর্থন যতটা না বাংলাদেশ বা এর জনগণের প্রতি তার চেয়ে বেশি আওয়ামী লীগ ও শেখ পরিবারের প্রতি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে বুঝতে হলে শুধু আওয়ামী লীগের ১৫ বছর সামনে রাখলেই চলবেনা বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের ভূমিকাও মনে রাখা জরুরী। আমাদের রাজনীতি ভারতকে সরিয়ে রেখে চিন্তা করা যাবেনা।
পাঁচ।
বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের নির্লিপ্ততা ও মব-সন্ত্রাসের কারণে কারো কারো মনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে যে, আমরা হয়তো আগেই ভালো ছিলাম, কিছুইতো বদলাচ্ছে না। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ভয়াবহ মব এখন কমে এসেছে। আমরা সহজে সব কিছু ভুলে যাওয়া জাতি। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলের চিত্র আমাদের সামনে রাখতে হবে। হাসিনার শাসনামলের ফিরিস্তি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। ফেসবুকে লেখার কারণে বছরের পর বছর বিনা অপরাধে জেলে থাকতে হয়েছে। কোন মন্ত্রী-এমপি নয়, আওয়ামী লীগ নয়-ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে লেখার কারণে জেলে যাওয়ার শত শত ঘটনা ঘটেছে। হাসিনার আবদার রক্ষা না করায় দেশের প্রধান বিচারপতিকে দেশ থেকে চূড়ান্ত অপমান করে বের করে দেয়া হয়েছে, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া তিন তিনটি নির্বাচন সম্পন্ন করেছে, ভিন্ন মতকে দমাতে যতটা নিষ্ঠুর হতে হয় তাই হয়েছে, বিচার ব্যবস্থা ও মানবাধিকার ছিল তলানিতে। নিজের পতনের জন্য এমনি হাজারো কারণ তৈরি করেছেন শেখ হাসিনা। লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে পরিকল্পিত ভাবে আওয়ামী লীগ বা সে সময়ের সুবিধাভোগী কিছু গোষ্ঠী এ বয়ানটি সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে। যে অংশটি হাসিনার পতনটিকে এখনো মেনে নিতে পারেনি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, একাত্তরের বিশাল জনযুদ্ধের পর দেশে যে অরাজকতা শুরু হয়েছিল, এক কথায় তা ছিল ভয়াবহ। এ দেশের মানুষ তখন বলেনি পাকিস্তানামলে আমরা ভালো ছিলাম। রাজাকার, আলবদর, জামায়াত ছাড়া কেউ পাকিস্তান ফিরে পেতে চায়নি। কারণ রাজনীতিতে তখন গুণগত পরিবর্তন এসে গেছে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি হয়ে গেছে। আমরা নতুনতর লড়াইয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। ঠিক তেমনি চব্বিশের পরিবর্তন যে শুধু একটি রেজিম বা স্বৈরশাসকের পরিবর্তন নয়, আমাদের রাজনীতির নতুনতর বিন্যাস যে তৈরি হয়ে গেছে, নতুনতর মেরুকরণ যে তৈরি হয়েছে, পুরোনো আয়নায় যে রাজনীতিকে দেখার আর সুযোগ নেই এই সত্যটি বোঝা আজকের জরুরী কর্তব্য। আমরা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, চিন্তা- কোন কিছু থেকেই মুক্তিযুদ্ধকে যেমনি বাদ দিতে পারিনা, তেমনি চব্বিশের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কেও সরানো যাবেনা। এইটিকে কেবল একটি অভ্যুত্থান হিসেবে দেখলে চলবেনা। আমাদের রাজনীতির চরিত্র বদলের এইটি একটি মাইলফলক। একাত্তর বা চব্বিশ এর কোন একটিকে বাদ দিয়ে অথবা একটির উপর অন্যটিকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। একাত্তর শুনলে জামায়াত-রাজাকারদের মধ্যে যেমনি আতঙ্ক তৈরি হয়, চব্বিশ-জুলাই শুনলে আওয়ামী লীগের মধ্যেও ঠিক তেমনি। জামায়াত যেমনি একাত্তরকে এখনো দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র বলে, আওয়ামী লীগও জুলাই আন্দোলনকে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র বলে চলেছে। জামায়াত একাত্তরে তাদের ভূমিকাকে এখনও যেমনি ভুল মনে করেনা, আওয়ামী লীগও জুলাইয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা হত্যাকে, পনের বছরের বর্বরতাকে সঠিক মনে করে। এ বিষয়ে তাদের সামান্যতম অনুশোচনা বোধ নেই। জামায়াত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে এ বিষয়ে যথেষ্ট মিল রয়েছে।
এটা সত্য যে, বিগত পনের বছরে হাসিনা সরকার মুক্তিযুদ্ধের যে বয়ান তৈরি করেছে তা শুধু ভুলই নয়, বিকৃতও। একটি জনযুদ্ধকে তারা নিজ দলের একক কৃতিত্ব বানাতে গিয়ে জাতির বৃহত্তর অবদানকে অস্বীকার করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীদের পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকার করে নিতে পারেনি। এই স্বীকৃতি তাদের আদালতে মামলা করে আদায় করতে হয়েছে। যদিও একাত্তরে জন্ম না নেয়া নিজ দলের হাজার হাজার কর্মীকে তারা মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে। ভিন্ন মতের লোকদের হরহামেশা রাজাকার আখ্যা দিয়েছে। আর এই রাজাকার বলা থেকেই জুলাই আন্দোলন গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। আওয়ামী লীগ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে শেখ মুজিবকে একক ও একমাত্র মহানায়ক বানাতে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে ফজলুল হক, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, তাজুদ্দিন, মণিসিংহ, মোজাফ্ফর, ওসমানীসহ বহু নায়কদের বাদ দিয়ে দিয়েছে। জিয়াউর রহমানকে ইতিহাসের খল-নায়ক বানাতে চেয়েছে। ইতিহাসে যার যতটুকু অবদান এবং জায়গা শেখ হাসিনা তা কাউকেই দিতে চান নি। দলীয় বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে ইতিহাসের আওয়ামী-বয়ান তৈরি করেছেন। আমাদের দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, বুদ্ধিজীবী, অভিনেতা, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশায় যারা জড়িত তাদের সিংহভাগ হাসিনা সরকারকে যেভাবে দুই হাত তুলে সমর্থন দিয়েছেন অন্য কোন দলের ক্ষেত্রেতো নয়ই, এমনকি অন্য অনেক দেশের ইতিহাসেও তা বিরল। আমাদের বর্তমান দুর্গতি ও স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করার জন্য এদের দায়ও কম নয়।
জুলাই অভ্যুত্থানে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল। নির্দ্বিধায় বলাচলে এ আন্দোলনের নিয়ামকশক্তিই ছিল এই ঐক্য। যে ঐক্য দেশকে একটি স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করতে পেরেছিল। জাতিয় রাজনীতিতে যখন ‘কমন এনিমি’ চিহ্নিত করা যায় তখনি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে ওঠে। এক সময় ব্রিটিশরা আমাদের কমন এনিমি ছিল পরে পাকিস্তানের অবাঙালিরা। স্বাধীন দেশে শেখ হাসিনা যখন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলের সকল পথ বন্ধ করে দিলেন তখন নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাক্সক্ষায় ঐক্য গড়ে উঠল। তবে খুব দ্রুতই সে ঐক্য ভেঙ্গে এখন যে যার জায়গায় ফিরে গিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে; কিন্তু এমনি অনেক বৃহত্তর জাতীয় সংকট রয়েছে যেখানে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।
ডায়ালেকটিকস এর একটি সূত্র বলছে, পরিবর্তন বা বিকাশ একটি নিয়ম মেনে চলে। তা ঘূর্ণায়মান পদ্ধতির মতো। যে বিন্দু থেকে বস্তুটি যাত্রা শুরু করে তা ঘুরে এসে ঠিক আগের বিন্দুতে মেলেনা। আগের বিন্দু থেকে উপড়ে উঠে যায়। এইটি স্পাইরাল পদ্ধতি বা স্পিরিং এর মতো। সুতরাং কোন পরিবর্তনই আমাদের পূর্বাবস্থায় নেবে না, বিজ্ঞানের এ সত্যটি সামনে রেখেই আমাদের ভবিষ্যতকে বুঝতে হবে। জুলাইগণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে ইতিহাসের পুরোনো সে সত্যকে হাজির করেছে। শাসক যত শক্তিমানই হোকনা কেন, জনগণ সম্মিলিতভাবে রাজনৈতিক সত্তা হয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ালে সে ইতিহাস বদলে দিতে পারে।
বিএনপি আগেও রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু সমাজ বিজ্ঞানের তত্ত্ব বলে বর্তমান বিএনপি আগের বিএনপি এক নয়। দেখার বিষয় তারা কতদূর যায়। তাদের সামনে সম্ভাবনার উন্মিুক্ত অবারিত দ্বার, পেছনে একটি স্বৈরশাসনের মর্মান্তিক পরিণতির ইতিহাস। কিন্তু দুর্বিত্তায়নের ইতিহাস খুব সহজ-সরল নয়, তাই সামনের লড়াইটাও যে খুব সহজ হবে না আমরা তাও বুঝতে পারি। তবে লড়াইয়ের ধরনটা ঠিক আগের মতো আর হবে না। সামনের লড়াইয়ে রাজনীতিকে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে রক্ষা করা যেমনি জরুরী, তেমনি সংস্কৃতি ও ধর্মকে রক্ষা করাও বড় কর্তব্য। নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চিন্তা, ধর্ম, নীতি-নৈতিকতার বিকাশের মধ্য দিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা আজকে বড় কর্তব্য। এ কাজটি করতে গেলে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, সামাজিক দুর্বৃত্ত ও ধর্মীয় দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে লড়াই সমান ভাবে জারি রাখাটা জন্য জরুরী। মহাবিশ্বে মানুষ বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন জায়গায় বার বার সমাজ গড়ে তুলেছে। সমাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া। মানুষ নিজের গড়া সে সমাজের বাসিন্দা। মহামানবের চলমান স্রোতধারায় মানুষ অমর। মানুষ মরণশীল; কিন্তু মানুষ মরে না। মানুষ চলে গেলেও মানব বেঁচে থাকে। আর সে মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষাও কখনো মরে না।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিপ্লব, গণ-বিদ্রোহ, ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান ইত্যাদি বিশেষণে বিভিন্ন জন এখনো যেমনি সংজ্ঞায়িত করে চলেছেন, সাথে সাথে চলছে এর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন ভাবে বিশ্লেষণ। সে যাই হোক, এ সব গণ-বিদ্রোহ হচ্ছে প্রচলিত নিয়ম বদলাবার প্রয়োজনে অনিয়মতান্ত্রিক গণ-বিস্ফোরণ, নতুন নিয়ম তৈরির গণ-কর্মযজ্ঞ- যা অনিয়মতান্ত্রিক পথে সংঘটিত হয়। ঠিক পুরোনো সব নিয়ম অনিয়মের ঝড়ে ভাঙার মতো। অনিয়ম যখন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় তখন গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এইটি যেমনি ছকে বাধা কোন পথে অগ্রসর হয় না, তেমনি এর শুরুতে কাক্সিক্ষত নতুন নিয়ম সম্পর্কেও আন্দোলনে অংশীজনদের কোন সুনির্দিষ্ট পূর্বপরিকল্পনা থাকেনা।
এ অভ্যুত্থানকে সামনে রেখে যদিও কেউ কেউ ‘মেটিকুলাস ডিজাইন তত্ত্ব’ সামনে আনছেন তা নিতান্তই রাজনৈতিক কারণে। সমাজ বিজ্ঞানে ‘কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা’ নিয়ে একধরণের তত্ত্বের প্রচলন আছে। এই তত্ত্ব অনুসারে, সামাজিক বা অর্থনৈতিক বিষয়াদি আগে থেকে পরিকল্পনা করে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায় না। নোবেল বিজয়ী ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ফ্রেডরিক হায়েকের একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে, “অর্থশাস্ত্রের কৌতুহল জাগানো কাজ হলো মানুষকে দেখানো যে যেটাকে তারা পরিকল্পনা করবেন বলে মনে করেন, সেটা তাদের কতটা অজানা।” হায়েক আবার কল্যাণরাষ্ট্র ও সমাজতন্ত্রের সমালোচনা করে কুখ্যাতিও কুড়িয়েছেন। আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছক এঁকে, খুব পরিকল্পনা করে শুরু হয়নি। বৈষম্যটি ছিল দৃশ্যমান। আমাদের এখানে চালের মণ ৩০ টাকা, পশ্চিম পাকিস্তানে ২০ টাকা, আমরা নির্বাচনে জিতেছি; কিন্তু ওরা ক্ষমতা দেবে না, জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণ বঙ্গে ৫ লক্ষ (পাকিস্তান সরকারের হিসেবে, আন্তর্জাতিক ভাষ্য ১০ লক্ষ) মানুষের মৃত্যু হলো-ওরা কেউ দেখতে এলো না-ইত্যাদি। সোনার বাংলা শ্মশান কেন?-এই প্রশ্নে বৈষম্য ও অনিয়ম ভাঙ্গার স্বপ্নে মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দেশ স্বাধীন হলো। সংবিধান তৈরি হলো। তাতে লেখা হলো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মানুষের মধ্যে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। মানুষ সমতা চেয়েছিল, স্বাধীনতা চেয়েছিল, বৈষম্য থেকে মুক্তি চেয়েছিল, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়-বিচার চেয়েছিল, খেয়ে-পরে বাঁচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা চেয়েছিল। সে সময়ের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা সংবিধানে এ কথাগুলো সংযোজনের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাতে মনে হয়েছিল আমাদের দেশটা আমরা হয়তো সে পথেই নিয়ে যাবো; কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। পশ্চিমাপন্থী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে তাঁর নিজস্ব পথেই যাত্রা শুরু করলেন। সংবিধানে লেখা চারটি মূলনীতির কোনটিই তাঁর শাসনামলে সামান্যতম গুরুত্ব পায়নি। পরবর্তী কোন সরকারের শাসনামলে তা পায়নি।
শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে কর্তৃত্ববাদী ধারা প্রবর্তন করেন। নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীকে অসীম ক্ষমতার অধিকারী করেন। যা আজকে কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসনের ভিত্তি বলে বহুল আলোচিত হচ্ছে। বিগত সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলী খান বলেছিলেন, “রাশিয়ায় জার বা জার্মানিতে হিটলারেরও সে ক্ষমতা ছিলনা যা আমাদের সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছে।”
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে উচ্ছৃঙ্খলতা চরমে পৌঁছেছিল। ব্যাংক-বীমা, হাট-বাজার লুট, প্রতিপক্ষকে রাজাকার বলে হত্যা, লুটের টাকা ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বলে হত্যা, সীমাহীন দুর্নীতি- এ সব অব্যাহত ছিল চুয়াত্তর পর্যন্ত। তিয়াত্তরে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণার পরেও ফলাফল বদলে দেয়ার মধ্যদিয়ে স্বাধীন দেশে নির্বাচনে ভোট কারচুপির পালা শুরু হয়েছিল। এ সব অরাজকতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে আসে। সরকারি হিসেবে দুর্ভিক্ষে ২৭ হাজার মানুষের মৃত্যু বলা হলেও বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসেবে তা ১ থেকে সাড়ে ৪ লক্ষ। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে অমর্ত্য সেনের একটি গবেষণা রয়েছে। তিনি তাতে বলেছেন, “কেবল খাদ্য সংকটের কারণে দুর্ভিক্ষ হয়নি। অন্য বারের তুলনায় সে বছর খাদ্য উৎপাদন হয়েছিল বেশি। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস এবং সরকারের ভুল পদক্ষেপ দুর্ভিক্ষের কারণ।”
শেখ মুজিবের একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, “সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সাড়ে সাত কোটি কম্বল, আমার কম্বল কই?” চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ ও বন্যায় রিলিফের কম্বল বিতরণের সময় এক সমাবেশে তিনি এ কথা বলেছিলেন; কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে তিনি যখন এ কথা বলছেন, তখন তাঁর পাশেই ছিলেন কম্বল আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি। এ সব কারণে মানুষের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল। অন্যদিকে অব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনী তৈরি করেন; কিন্তু এই রক্ষীবাহিনী সরকার-বিরোধীদের বিরুদ্ধে হিংস্র হয়ে ওঠেছিল। রাষ্ট্র-বিরোধী আখ্যা দিয়ে তারা জাসদের ২৫ থেকে ৩৫ হাজার গণবাহিনীর যুবকদের হত্যা করেছে। এই রক্ষীবাহিনী গঠনকে সেনাবাহিনীও ভালোভাবে নেয়নি। এইটিকে তারা সেনাবাহিনীর বিকল্প শক্তি হিসেবে মনে করেছে। সরকারি দল ‘এক নেতা এক দেশ- বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ বলে যখন গণতন্ত্রের কবর খুঁড়ছে তখন শেখ মুজিব তা থামাতে চাননি। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। অন্যদিকে একাত্তরে পরাজিত রাজাকার-আলবদররা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিরাজমান ছিল। পঁচাত্তরের মর্মান্তিক ঘটনা যখন সংঘটিত হয় তখন শেখ মুজিব যেমনি জন-বিচ্ছিন্ন, তেমনি দল-বিচ্ছিন্ন। স্বাধীনতা পূর্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আর স্বধীনতা উত্তর শাসক শেখ মুজিবের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছিল আকাশ আর পাতাল। ঊনসত্তরে যারা তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিলেন তাদের অনেকেই বাকশাল গঠনকালে তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেলেন। পঁচাত্তরে তাঁর জনপ্রিয়তা তলানীতে।
এখানে একটি বাস্তবতা আলোচনার দাবি রাখে। আর তা হচ্ছে, স্বাধীনতার পর দেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ, বিরোধী দলে কমিউনিস্ট পার্টি-ন্যাপ। মাঠে পরাজিত দল জামায়াত নেই, ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক-প্রতিক্রিয়াশীল কোন দল নেই, বিএনপির জন্ম হয়নি। এমনি বাস্তবতায় জাসদের জন্ম হলো। বলা চলে ঝলসে উঠল দলটি। এদেরকে দমাতে মুজিব সরকার নিষ্ঠুর হয়ে উঠলো। প্রশ্ন হচ্ছে সরকারের সেই দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি কেন যথাযথ প্রতিবাদ করেনি, সরব হয়ে ওঠেনি। বিরোধী দল হিসেবে কেন তারা যথাযথ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হলো তা রাজনীতির জাতীয় চরিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় ন্যাপ-সিপিবির বহু সমাবেশ আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পণ্ড করে দিয়েছে। তিয়াত্তরের নির্বাচনে ন্যাপ-সিপিবির প্রার্থীকে জোর করে পরাজিত করা হয়েছে, সে বছর পহেলা জানুয়ারি ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে মতিউল ইসলাম ও মির্জা কাদেরকে রাজপথে পুলিশ নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্য মতে একাত্তরে গঠিত মুজিব-বাহিনী পাক-সেনাদের বিরুদ্ধে যতটানা তৎপর ছিল তার চেয়ে বেশি তৎপর ছিল বামপন্থী নিধনে। এমনি বাস্তবতা ও শাসকগোষ্ঠীর ক্রমাগত ব্যর্থতার পরেও রাজনীতির মাঠ জনমত কমিউনিস্টদের পক্ষে না এসে কি ভাবে প্রতিক্রিয়াশীলদের পক্ষে চলে গেল সে জরুরী প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ উদারপন্থী থেকে বুর্জোয়া পরে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠার ধারাবাহিকতায় এ দল সম্পর্কে কমিউনিস্টদের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ আজকের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী জামায়াত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর উত্থানের কারণ বোঝার জন্য জরুরী।
দুই।
আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা’র কথা উল্লেখ আছে। আবার একই ভাবে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধি-নিষেধ’-এর কথাও বলা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই বিভিন্ন গণবিরোধী আইন এখনও বলবৎ আছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: ২০১৮ (বর্তমানে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ: ২০২৫), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন: ২০০৬, স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট: ১৯৭৪, ফৌদারি কার্যবিধি: ১৮৯৮, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (অনুপ্রবেশ) আইন: ১৯৭২, ধর্মীয় অবমাননা সংক্রান্ত আইন (দণ্ডবিধি: ১৮৬০), মুদ্রণ ও প্রকাশনা আইন: ১৯৭৩, অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট: ১৯২৩, বিশেষ ট্রাইবুনাল আইন: ১৯৭৪ ইত্যাদি। রাষ্ট্রের এই সমস্ত আইন প্রতিনিয়ত বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে চলেছে। গণসার্বভৌমত্ব (পপুলার সভরেন্টি) হচ্ছে জনগণই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূলউৎস। আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। শাসকগোষ্ঠী হরহামেশা এ কথাটি উচ্চারণ করেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকের গণসার্বভৌমত্বকে হরণ করে থাকে। রাষ্ট্রকে সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠার ধারণাই গণসার্বভৌমত্ব বিরোধী আইনকে বৈধতা দেয়। এ সবই পশ্চিমা রাষ্ট্রের পুরোনো সার্বভৌমত্ব ধারণা প্রসূত। এই পশ্চিমা ‘লিবারেলিজম’ বা নির্বাচনবাদী রাজনীতির ভেতরেই নিহিত থাকে ফ্যাসিবাদ তৈরির অবকাঠামো; কিন্তু এই নির্বাচনবাদী রাজনীতি বর্তমান-বিশ্বে প্রধানতম হলেও হিটলার, মুসোলিনি এই নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমেই নিজ নিজ দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। শেখ হাসিনাও সে পথেই এ দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করে স্বৈরশাসক হয়ে উঠেছিলেন; কিন্তু এ ব্যবস্থা সব দেশে সমান ভাবে কার্যকর হয়নি। অনেক দেশেই তা সুফল বয়ে এনেছে; কিন্তু বুর্জোয়া এই শাসনব্যবস্থার মধ্যদিয়ে কখনো গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তা আবার স্বৈরশাসনে পিষ্ট হওয়ার নজিরও বিশ্বে রয়েছে। স্পেন ও চিলি তার উদাহরণ।
পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরে স্বাধীন দেশে জিয়াউর রহমান প্রথম সামরিক শাসন জারি করেন। পরে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরে ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় দফায় সামরিক শাসন জারি করেন জেনারেল এরশাদ। মুজিব সরকারের পরে একই ভাবে গণতন্ত্রকে নির্বাসন দিয়েছেন সামরিক শাসকেরা। সামরিক শাসনের অনেক কিছুই পূর্বের ধারাবাহিকতায় পরিচালিত হয়েছে। জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহেরসহ বহু মেধাবী সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছেন। আবার জিয়াউর রহমানকে হত্যার জন্য এরশাদকে দায়ি করা হয়। জিয়া ও এরশাদের শাসনামলে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও কোনটিই দেশে-বিদেশে স্বচ্ছ বলে বিবেচিত হয়নি। অবশ্য দলীয় তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত কোন জাতীয় নির্বাচনই এ দেশে স্বচ্ছতার মানদণ্ডে কখনো উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ১৯৯৪ সালে বিএনপির শাসনামলে কারচুপি-পূর্ণ মাগুরা উপ নির্বাচনের কারণে আমাদের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটে। বিগত ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে দল-নিরপেক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাপনায় ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ এবং সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পাঁচটি নির্বাচন কম ত্রুটিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে; কিন্তু ২০১১ সালে শেখ হাসিনা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে নিজের কফিনে নিজেই পেরেক ঠুকেন।
ঊনসত্তর, নব্বই ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান চরিত্রগত দিক থেকে ভিন্নতর হলেও এ সব অভ্যুত্থানই শাসকগোষ্ঠীর বদল এনে দিয়েছে। তবে আইয়ুব খান ও এরশাদ উর্দি পড়া স্বৈরশাসক হলেও শেখ হাসিনা রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠে কুশাসন, দুর্নীতি ও নিপীড়নে কুখ্যাতি অর্জন করেছেন। অন্যদের দেশ ত্যাগ করতে না হলেও শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন, দলেবলে দেশ ছেড়েছেন। এরা সকলেই নিজেদের স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে বরাবরই উন্নয়নের বয়ান হাজির রেখেছেন।
জুলাই আন্দোলনটি শুধুমাত্র কোটা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে শুরু হলেও পরে তা পুরোপুরি রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করেছে। বিভিন্ন আন্দোলনের ক্ষেত্রেতা-ই হয়ে থাকে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিশু-কিশোরদের যানবাহনে, রাস্তায় লিখতে দেখা গেছে ‘রাষ্ট্রের সংস্কার বা মেরামত চলছে’; কিন্তু জুলাই আন্দোলন দমাতে সরকার ছাত্র-জনতার উপর রাষ্ট্রের সর্বশক্তি ব্যবহার করেছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবিকে ব্যবহারসহ হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুঁড়েছে। গত দেড় দশকে মানুষের, বিভিন্ন গোষ্ঠীর ছোট ছোট পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, ছোট ছোট বিদ্রোহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শক্তি যুগিয়েছে। একদিকে যেমনি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন, গুম-খুনবিরোধী আন্দোলন, সম্পদ রক্ষার আন্দোলন- অন্য দিকে শাসকগোষ্ঠীর জেলায় জেলায় মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে ভিন্ন মতকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ, দুর্নীতি, আয়নাঘর, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার, বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দলীয় গডফাদারদের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা, প্রতিটি স্বায়ত্ব শাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে দলীয়করণ করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন- এ সবই জুলাইগণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রেখেছে।
জুলাইয়ে দেয়ালে দেয়ালে ছাত্ররা গ্রাফিতি লিখেছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ধর্মীয়, জাতিগত, লৈঙ্গিক-সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ, সমতল-পাহাড়ি নির্বিশেষে। এ আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছে নারীরা, শ্রমজীবী, রিক্সাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, কারখানার শ্রমিক, কর্মচারী, মাদ্রাসার ছাত্র, রাজপথের ভাসমান শিশুরা। ডান, বাম, মধ্যপন্থী, ধর্মীয় সংগঠন নির্বিশেষে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। চব্বিশে আমরা ইতিহাসের দীর্ঘতম জুলাই অতিক্রম করতে দেখেছি। ৩৬ জুলাই। কিন্তু পরিবর্তনের পরে অভ্যুত্থানের মালিকানা নিয়ে রাজনৈতিক-রশি-টানাটানি শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা যেমনি একক ভাবে দাবি করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ইতিহাসে বিকৃতি এনেছে; এ যেন ঠিক তারই ধারাবাহিকতা। আমরা জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের পরিসংখ্যানটি দেখলে এ অভ্যুত্থানের শ্রেণি-চরিত্রটি উপলব্ধি করতে পারবো। তবে এইটি সত্য যে, শেখ হাসিনার পনের বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নামেনি। প্রচলিত রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের অনাস্থা এর প্রধানতম কারণ। যখন ছাত্ররা রাস্তায় নামল, বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়াল, দলে দলে অকাতরে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে থাকল; তখন কেউই ঘরে থাকতে পারেনি। এই কৃতিত্ব অবশ্যই ছাত্রদের প্রাপ্য। তাই বলে জুলাই অভ্যুত্থানের গণ-চরিত্রকে অস্বীকার করে কেবল ছাত্রদের মালিকানা দাবি কোন ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। পাশাপাশি এ-ও মনে রাখতে হবে আমাদের গৌরবের সকল অধ্যায়ের সূচনা প্রথমে ছাত্ররাই করেছে। বায়ান্ন, বাষট্টি, ঊনসত্তর, নব্বই সবই তার উদাহরণ। জনযুদ্ধ একাত্তরের সূচনাটা ছাত্রদের হাত ধরেই হয়েছে।
তিন।
৫ আগস্টের পরে আমরা দেখি জাতিবাদী শক্তির শূন্যতায় ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তি ফ্যাসিবাদের জায়গা দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের কিছু অংশের বিভিন্ন কার্যক্রম ‘মব জাস্টিস’ হিসেবে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমনি আতঙ্ক তৈরি করেছে; পাশাপাশি সুফি, বাউল ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার ভীতি তৈরি করেছে। শতাধিক মাজার ও খানকায় আক্রমণ করা হয়েছে। মন্দির ও মসজিদে হামলা হয়েছে। নাটক, সিনেমা, বাউল মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা করা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তুলে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে, যে নারীরা আন্দোলনে সাহসের সাথে বুলেটের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল পরে সে নারীদের প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হয়েছে। সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম নারীদের বিরুদ্ধে কুরুচিকর ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ সবের বিরুদ্ধে কার্যত কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পুলিশের গণবিরোধী ভূমিকায় জনমনে তাদের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল; পরবর্তী সময়ে এমনকি এখনও পর্যন্ত পুলিশ সে অবস্থা কাটিয়ে নিজেদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারেনি। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় মব-সন্ত্রাসীরা উৎসাহ পেয়েছে। সেনা বাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে নামলেও পরিস্থিতিতে তার প্রভাব পড়েনি। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সঙ্গীত ও সংস্কৃতি নিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের একটি অংশের বিভিন্ন মন্তব্য জনমনে মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতি প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান নিয়েই তৈরি হয়েছিল ক্ষোভ। মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকারী আওয়ামী লীগের দখলদাররা সদলবলে পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের দখলে থাকা হাট, ঘাট, মাঠ, বাজার, পরিবহন, মাদক, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু পরে বিএনপির নতুন দখলদারদের দখলে চলে গেছে। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বিএনপির বিভিন্ন অংশে ঠাঁই করে নিচ্ছে। এমনকি জামায়াতের দলেও তারা ঢুকে পড়ছে। অপরাধীদের সাথে নিরপরাধীদের যুক্ত করে আওয়ামী আমলের মতো অবাধে মামলা বাণিজ্য চলেছে। নতুন নতুন সিণ্ডিকেট তৈরি হচ্ছে। এ সবই হচ্ছে প্রশাসনের জ্ঞাতসারে। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই ২০২৩ সালে বিগত সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দিতে যে চুক্তি করেছিল, তা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার তৎপরতা। ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র তিনদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার সাথে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে আত্মঘাতি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। উপদেষ্টাদের তত্ত্বগত দিক থেকে প্রাজ্ঞ মনে হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অদক্ষতা ও ব্যর্থতা দেশের স্বার্থ রক্ষার বিরুদ্ধে গেছে।
চব্বিশের আন্দোলনের অংশীজনদের মধ্যে মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রবল হয়ে উঠেছিল। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল। রিক্সাওয়ালা, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র-ব্যবসায়ী যেভাবে রাস্তায় নেমেছিল ৫ আগস্টের পরে ঠিক সে ভাবেই তারা ঘরে ফিরে গেছে। তারা আশাহত হয়েছে। দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে শ্রমিকরা নাজেহাল হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে, তাদের উপর গুলি চালানো হয়েছে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক নিহত হয়েছেন। চব্বিশের অভ্যুত্থান উত্তর দেশে এমন হওয়ার কথা ছিলনা। বৈষম্য বিরোধের বদলে বৈষম্যবাদী মতাদর্শীরা প্রবল হয়ে উঠেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সরকারি গেজেটে যে ৮৪৪ জনকে শহীদ দেখানো হয়েছে তাতে শ্রমজীবী ২৮৪, শিক্ষার্থী ২৬৯, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ১২০, চাকরিজীবী ১০৮ এবং ২৯ জন অন্যান্য। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ৮০ শতাংশই ছিল কৃষকের সন্তান। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আমাদের জনযুদ্ধ, গণসংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থান- এ সবে শ্রমজীবীদের সিংহভাগ অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাদের স্বার্থ বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। অথচ তাদের চাহিদা কখনো খুব বেশিছিল না, সব সময়তা একই ‘অন্নচাই, প্রাণচাই, আলোচাই, চাই মুক্ত বায়ু,/ চাইবল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু।’ এটুকুর জন্য আত্মদান, সংগ্রাম, রাজনীতি কত কী! তবে আশার কথা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কার নিয়ে যে ১১টি কমিটি গঠিত হয়েছে; এর মধ্যে ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’ সরকারের কাছে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি, শ্রমঘণ্টা, কর্মপরিবেশসহ ২৫টি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সুপারিশ উত্থাপন করেছে; কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকার এ সব সংস্কারের দাবিকে কতটা আমলে নেয়। অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের সংগঠন এনসিপির আলোচনাতেও শ্রমিকের কথা গুরুত্ব পায়নি। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দিক থেকে দলটিকে শিশুই বলা চলে। তাদের আচরণ, কথা ও কাজের অমিল ইতোমধ্যেই জনমনে নানাহ প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে তরুণদের বড় একটি অংশ যে, তাদের দিকে তাকিয়ে আছে আমরা তাদের পদযাত্রায় অংশগ্রহণ থেকে তা বুঝতে পারি; কিন্তু আখেরে দলটি কতদূর যাবে তা নিয়ে এখনি যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডে অর্থের যোগান এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে নানান প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এখানে একটি তথ্য মনে রাখা জরুরী যে, এখন আমাদের ভোটারদের ৪০ শতাংশ নতুন ও তরুণ। যারা জাতীয় নির্বাচনে এবারই প্রথম ভোট দিয়েছে। যে অংশটি প্রচলিত রাজনীতিকে সমর্থন করে না। জুলাই অভ্যুত্থান তারই প্রমাণ। সুতরাং রাজনীতির নতুন মেরুকরণের চিত্রটি আমরা হয়তো অচিরেই বুঝতে পারবো।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও সংস্কার কমিশনগুলো যে ‘জুলাই সনদ’ তৈরির কাজ করছে, তাতে সংবিধান, নির্বাচন প্রক্রিয়া, বিচার ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, আনুপাতিক হারে ভোট, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ইত্যাদিসহ বেশ কিছুবড় পরিবর্তনের আভাস দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনোত্তর বিএনপি সরকার তা কতটা বাস্তবায়নের পথে যাবে সেইটিই এখন দেখার বিষয়। আমাদের রাজনীতিতে ‘সংস্কার’ কথাটির একটি নেতিবাচক অর্থ রয়েছে। এক-এগারোতে তার উৎপত্তি। সংস্কারপন্থী হিসেবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, সে সময়ে তাদেরকে রাজনীতিতে নেতিবাচক ভাবেই হাজির করা হয়েছে; কিন্তু সংস্কার প্রগতিরই একটি প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়ত সংস্কারের মধ্যদিয়েই সভ্যতা, সমাজ অগ্রসর হয়, বিকশিত হয়। আমাদের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে প্রতিনিয়ত সংস্কার বা পরিবর্তন। এখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে কাজগুলো করতে চাচ্ছে, তা রাতারাতি হয়ে যাবার বিষয় নয়। একটা ফ্যাসিবাদী রেজিমকে উৎখাত করেই গোটা রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে বদলে দেবো-বিষয়টি এমন নয়। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ ও দর্শন রয়েছে। মেনিফেস্টো বা নির্বাচনী ইশতেহার আলাদা। সবকিছুকে এক জায়গায় নিয়ে আসা কখনো সম্ভব নয়। মতৈক্যের বিষয়টি হবে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’। জুলাই সনদের এ বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে পারলেই বড় অর্জন হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় গিয়ে দল আর তা বাস্তবায়নের পথে হাঁটে না। ৯০ পরবর্তী সময়ে তিন জোটের রূপরেখা কেউই মানেনি। ইতোমধ্যে আমাদের সংবিধানে কাটাছেঁড়া কম হয়নি। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতা যেমনি আছে পাশাপাশি রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও আছে। আবার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ও আছে। একসাথে সবই রইল। কোনটাকে বাদ দেয়া গেল না। এমন উদ্ভট বিষয় বিশ্বে বিরল। একে আবার আমাদের কিছু বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক দল বিশ্বসেরা সংবিধান বলে তৃপ্তি পান। ১৯৮৮ সালে জেনারেল এরশাদ যখন অষ্টম-সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেন, তখন প্রায় সব বিরোধী রাজনৈতিক দল এর বিরোধীতা করলেও ক্ষমতায় গিয়ে তারা আর তা বদলাতে চায়নি।
চার।
শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ভারত। কেন ভারত শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল তা খতিয়ে দেখা আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য জরুরী। আমাদের রাজনীতিতে ভারত সব সময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাসিনার শাসন টিকিয়ে রাখতে নিয়ম-কানুন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের কিছুই তোয়াক্কা না করে ভারত যেমনি বাংলাদেশের জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, শেখ হাসিনাও তেমনি ভারতের স্বার্থ রক্ষায় দেশের স্বার্থকে অকাতরে জলাঞ্জলি দিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভারতকে যা দিয়েছি সেটি তারা সারা জীবন মনে রাখবে।’ কিন্তু কী দিয়েছেন তিনি বা তার সরকার তা কখনো প্রকাশ করেনি। হাসিনার শাসনামলের দেড় দশকে ভারতের সাথে ২০টি চুক্তি ও ৬৬টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখবো এ সব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের অধিকাংশই সম্পাদিত হয়েছে ভারতের স্বার্থ রক্ষার জন্য।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার জন্য ভারতের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে শেখ হাসিনা ২০১০ সালে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন। সে চুক্তির অধীনে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটারের মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া দেয়, যা ১৯৭৫ সালে ভারত-বাংলাদেশের সম্পাদিত ‘যুগ্ম-সীমান্ত নির্দেশাবলী’র সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কোন ধরনের শুল্ক ছাড়া বিনা পয়সায় ভারতকে ট্রানজিট দেয়া, চারটি নদী-পথ ব্যবহার, রেল-পথ ব্যবহারসহ বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সে সময় এ সবের বিরোধীতা করলে সরকারের পক্ষ থেকে ট্রানজিটের বিনিময়ে বাংলাদেশ ইউরোপ-সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে বলে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। ট্রানজিটের বিরুদ্ধে সিলেটে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুললে সে সময় বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুমের শিকার হতে হয়েছে।
কোন রকম বিকল্প না রেখে শেখ হাসিনা দেশের আমদানী বাজারকে ভারতের হাতে একচেটিয়াভাবে তুলে দিয়েছেন। এমন এক বাজারব্যবস্থা তিনি তৈরি করেছেন যেখানে ভারতের পণ্য ছাড়াও অন্য দেশের অনেক পণ্য ভারতের মাধ্যমে আমদানী করতে হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে স্থলপথে ভারত থেকে ১ কোটি ৫০ লক্ষ ৫০ হাজার ৩৬৩ টন পণ্য আমদানী করা হয়েছে। বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানী করেছে ৯ লক্ষ ৭৮ হাজার ৪৩৮ টন। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ হাজার ১৬০.৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখানে বাণিজ্যের ৯৪ শতাংশ ভারতের অনুকুলে; যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরল।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট; কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৬ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট। চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হলেও শেখ হাসিনা ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেন। শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে ভারত সফরে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু গৌতম আদানীর ‘আদানী পাওয়ার’র সাথে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি করেন। আমাদের জ¦ালানী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ চুক্তি দেশের স্বার্থে নয় শেখ হাসিনা আদানী পাওয়ারকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে নরেন্দ্র মোদীকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য করেছেন। এর আগে ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় এলে প্রথম ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে হাসিনা সরকার। সে সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অর্থনীতিবিদরা চুক্তিপত্র প্রকাশের দাবি করলেও সে চুক্তিপত্রের কোন কাগজ প্রকাশ করা হয়নি। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরে ১৫৮ পৃষ্ঠার এ অসম চুক্তিটি এখন জনসমক্ষে এসেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানাচ্ছে এ জন্য প্রতিমাসে অতিরিক্ত ৭০০ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী ২৫ বছরে ২৩.৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভারতকে দিতে হবে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদয় রিজার্ভের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিদেশী কর্মরতরা সর্বমোট ৯ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার রেমিটেন্স দেশের বাইরে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে ভারতে গেছে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার।
দেশের স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমিক পর্যায়ের ১ কোটি ৮৯ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিবছর ২৩ কোটিরও বেশিবই এর প্রয়োজন হয়। এনসিটিবির এ বই ছাপানোকে কেন্দ্র করে দেশে বড় একটি প্রকাশনা শিল্প গড়ে উঠেছিল, যার সাথে কয়েক লক্ষ লোকের কর্ম-সংস্থান তৈরি হয়েছিল; কিন্তু ২০০৯ সালে হাসিনা সরকার গঠনের পর বই ছাপার এ দায়িত্ব ভারতের কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার হাতে তুলে দেয়া হয়। সে সময় এর প্রতিবাদে প্রকাশকদের আন্দোলনেও ফল হয়নি। গত অক্টোবরে পূর্বের সিদ্ধান্ত বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার বই ছাপাবার নতুন দরপত্র আহ্বান করেছে।
ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন ভারতের ছত্তিশগড়ে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করার জন্য ভারত সরকারের অনুমতি চায়। সে দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রকল্পটিকে পরিবেশের জন্য ‘মারাত্মক ক্ষতিকর’ বলে প্রতিবেদন দেয়ায় ভারত সরকার তা নাকচ করে দেয়; কিন্তু ২০১০ সালে শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে ভারত সে ‘মারাত্মক ক্ষতিকর’ প্রকল্পটি বাংলাদেশকে গছিয়ে দিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। সে স্মারকে দুই দেশ যৌথ ভাবে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১২ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপালে দুইটি ৬৬০ ইউনিটের ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি স্বাক্ষর করে। সুন্দরবন ধ্বংস করে এ প্রকল্পকরা নিয়ে দেশ বিদেশের জ¦ালানী-বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবাদী, রাজনীতিবিদ, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রবল আপত্তির পরেও শেখ হাসিনা সে প্রকল্প থেকে সরে আসেননি। ২০২২ সালে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু করা হলেও কারিগরি ত্রুটি, কয়লা সংকট ও অন্যান্য কারণে এখন পর্যন্ত মোট সাত বার প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রকল্পে নির্মাণ-শ্রমিক থেকে শুরু করে কারিগরি কাজে যুক্ত অধিকাংশই ভারতীয়। যারা আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত সব কিছুই ভারত থেকে আনেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা এমন সময় রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প চুক্তি করেন যখন সারাবিশ্ব পরিবেশের জন্য হুমকি বলে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করে দিচ্ছে। ক্ষমতা হারানোর দুই মাস আগে শেখ হাসিনা ভারতে গেলে সেখানে রেল ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর করেন। একতরফাভাবে ভারতকে সুবিধা দিয়ে করা সে চুক্তিকে সে সময় দেশের বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদরা সংবাদ মাধ্যমে গোলামীর-চুক্তি বলে অবহিত করেন। তারা সে চুক্তি প্রকাশের দাবি জানালেও তা প্রকাশ করা হয়নি। এমনি বহু অসম চুক্তি শেখ হাসিনা ১৫ বছরে ভারতের সাথে স্বাক্ষর করেছেন। যার অধিকাংশই গোপনে, সংসদকে পাশকাটিয়ে। ভারতকে সুবিধা দিতেই শেখ হাসিনা নিজের দেশের স্বাস্থ্য খাতকে দুর্বল করে রেখেছেন বলে স্বাস্থ্য খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শেখ হাসিনার এ সব দুষ্কর্মের ফিরিস্তি দিলে কলেবর আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে। হাসিনা যেমনি ভারতের স্বার্থ রক্ষায় হয়ে উঠেছিলেন বেপরোয়া অন্যদিকে তাকে ক্ষমতায় রাখতে ভারতও হয়ে উঠেছিল নির্লজ্জ। যার ফলে আমাদের দেশে ক্রমান্বয়ে হাসিনা বিরোধীতা ভারত বিরোধীতায় রূপ নিয়েছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ভারত। ভারতের এ ভূমিকায় তাদের সকল অংশীজনের সমান অবস্থান মনে করলে বড় ধরণের ভ্রান্তি তৈরি হবে। সে যুদ্ধে ভারত সরকার, মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির লক্ষ্য ও স্বার্থ এক ছিল না। সেখানকার বাঙালিদের বড় একটি অংশের নাড়ি পড়ে আছে এই বাংলায়। যাদের আত্মীয়-স্বজন এখনও বাংলাদেশে। দুই বাংলার রয়েছে অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি। দিল্লির মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীদের স্বার্থের কথা রবীন্দ্রনাথই বলে গিয়েছেন বহু আগে। তাদের চিন্তায় সঙ্গত কারণেই মুনাফাই প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ। আর মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের সমর্থনের কারণ যতটা না মানবিক তার চেয়ে বেশি তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান ভাঙ্গার সুযোগ ভারত সরকার হাতছাড়া করবে না এটাই বাস্তবতা। ঐতিহাসিকভাবেই ভারত সরকারের সমর্থন যতটা না বাংলাদেশ বা এর জনগণের প্রতি তার চেয়ে বেশি আওয়ামী লীগ ও শেখ পরিবারের প্রতি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে বুঝতে হলে শুধু আওয়ামী লীগের ১৫ বছর সামনে রাখলেই চলবেনা বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের ভূমিকাও মনে রাখা জরুরী। আমাদের রাজনীতি ভারতকে সরিয়ে রেখে চিন্তা করা যাবেনা।
পাঁচ।
বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের নির্লিপ্ততা ও মব-সন্ত্রাসের কারণে কারো কারো মনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে যে, আমরা হয়তো আগেই ভালো ছিলাম, কিছুইতো বদলাচ্ছে না। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ভয়াবহ মব এখন কমে এসেছে। আমরা সহজে সব কিছু ভুলে যাওয়া জাতি। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলের চিত্র আমাদের সামনে রাখতে হবে। হাসিনার শাসনামলের ফিরিস্তি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। ফেসবুকে লেখার কারণে বছরের পর বছর বিনা অপরাধে জেলে থাকতে হয়েছে। কোন মন্ত্রী-এমপি নয়, আওয়ামী লীগ নয়-ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে লেখার কারণে জেলে যাওয়ার শত শত ঘটনা ঘটেছে। হাসিনার আবদার রক্ষা না করায় দেশের প্রধান বিচারপতিকে দেশ থেকে চূড়ান্ত অপমান করে বের করে দেয়া হয়েছে, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া তিন তিনটি নির্বাচন সম্পন্ন করেছে, ভিন্ন মতকে দমাতে যতটা নিষ্ঠুর হতে হয় তাই হয়েছে, বিচার ব্যবস্থা ও মানবাধিকার ছিল তলানিতে। নিজের পতনের জন্য এমনি হাজারো কারণ তৈরি করেছেন শেখ হাসিনা। লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে পরিকল্পিত ভাবে আওয়ামী লীগ বা সে সময়ের সুবিধাভোগী কিছু গোষ্ঠী এ বয়ানটি সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে। যে অংশটি হাসিনার পতনটিকে এখনো মেনে নিতে পারেনি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, একাত্তরের বিশাল জনযুদ্ধের পর দেশে যে অরাজকতা শুরু হয়েছিল, এক কথায় তা ছিল ভয়াবহ। এ দেশের মানুষ তখন বলেনি পাকিস্তানামলে আমরা ভালো ছিলাম। রাজাকার, আলবদর, জামায়াত ছাড়া কেউ পাকিস্তান ফিরে পেতে চায়নি। কারণ রাজনীতিতে তখন গুণগত পরিবর্তন এসে গেছে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি হয়ে গেছে। আমরা নতুনতর লড়াইয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। ঠিক তেমনি চব্বিশের পরিবর্তন যে শুধু একটি রেজিম বা স্বৈরশাসকের পরিবর্তন নয়, আমাদের রাজনীতির নতুনতর বিন্যাস যে তৈরি হয়ে গেছে, নতুনতর মেরুকরণ যে তৈরি হয়েছে, পুরোনো আয়নায় যে রাজনীতিকে দেখার আর সুযোগ নেই এই সত্যটি বোঝা আজকের জরুরী কর্তব্য। আমরা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, চিন্তা- কোন কিছু থেকেই মুক্তিযুদ্ধকে যেমনি বাদ দিতে পারিনা, তেমনি চব্বিশের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কেও সরানো যাবেনা। এইটিকে কেবল একটি অভ্যুত্থান হিসেবে দেখলে চলবেনা। আমাদের রাজনীতির চরিত্র বদলের এইটি একটি মাইলফলক। একাত্তর বা চব্বিশ এর কোন একটিকে বাদ দিয়ে অথবা একটির উপর অন্যটিকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। একাত্তর শুনলে জামায়াত-রাজাকারদের মধ্যে যেমনি আতঙ্ক তৈরি হয়, চব্বিশ-জুলাই শুনলে আওয়ামী লীগের মধ্যেও ঠিক তেমনি। জামায়াত যেমনি একাত্তরকে এখনো দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র বলে, আওয়ামী লীগও জুলাই আন্দোলনকে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র বলে চলেছে। জামায়াত একাত্তরে তাদের ভূমিকাকে এখনও যেমনি ভুল মনে করেনা, আওয়ামী লীগও জুলাইয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা হত্যাকে, পনের বছরের বর্বরতাকে সঠিক মনে করে। এ বিষয়ে তাদের সামান্যতম অনুশোচনা বোধ নেই। জামায়াত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে এ বিষয়ে যথেষ্ট মিল রয়েছে।
এটা সত্য যে, বিগত পনের বছরে হাসিনা সরকার মুক্তিযুদ্ধের যে বয়ান তৈরি করেছে তা শুধু ভুলই নয়, বিকৃতও। একটি জনযুদ্ধকে তারা নিজ দলের একক কৃতিত্ব বানাতে গিয়ে জাতির বৃহত্তর অবদানকে অস্বীকার করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীদের পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকার করে নিতে পারেনি। এই স্বীকৃতি তাদের আদালতে মামলা করে আদায় করতে হয়েছে। যদিও একাত্তরে জন্ম না নেয়া নিজ দলের হাজার হাজার কর্মীকে তারা মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে। ভিন্ন মতের লোকদের হরহামেশা রাজাকার আখ্যা দিয়েছে। আর এই রাজাকার বলা থেকেই জুলাই আন্দোলন গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। আওয়ামী লীগ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে শেখ মুজিবকে একক ও একমাত্র মহানায়ক বানাতে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে ফজলুল হক, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, তাজুদ্দিন, মণিসিংহ, মোজাফ্ফর, ওসমানীসহ বহু নায়কদের বাদ দিয়ে দিয়েছে। জিয়াউর রহমানকে ইতিহাসের খল-নায়ক বানাতে চেয়েছে। ইতিহাসে যার যতটুকু অবদান এবং জায়গা শেখ হাসিনা তা কাউকেই দিতে চান নি। দলীয় বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে ইতিহাসের আওয়ামী-বয়ান তৈরি করেছেন। আমাদের দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, বুদ্ধিজীবী, অভিনেতা, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশায় যারা জড়িত তাদের সিংহভাগ হাসিনা সরকারকে যেভাবে দুই হাত তুলে সমর্থন দিয়েছেন অন্য কোন দলের ক্ষেত্রেতো নয়ই, এমনকি অন্য অনেক দেশের ইতিহাসেও তা বিরল। আমাদের বর্তমান দুর্গতি ও স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করার জন্য এদের দায়ও কম নয়।
জুলাই অভ্যুত্থানে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল। নির্দ্বিধায় বলাচলে এ আন্দোলনের নিয়ামকশক্তিই ছিল এই ঐক্য। যে ঐক্য দেশকে একটি স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করতে পেরেছিল। জাতিয় রাজনীতিতে যখন ‘কমন এনিমি’ চিহ্নিত করা যায় তখনি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে ওঠে। এক সময় ব্রিটিশরা আমাদের কমন এনিমি ছিল পরে পাকিস্তানের অবাঙালিরা। স্বাধীন দেশে শেখ হাসিনা যখন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলের সকল পথ বন্ধ করে দিলেন তখন নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাক্সক্ষায় ঐক্য গড়ে উঠল। তবে খুব দ্রুতই সে ঐক্য ভেঙ্গে এখন যে যার জায়গায় ফিরে গিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে; কিন্তু এমনি অনেক বৃহত্তর জাতীয় সংকট রয়েছে যেখানে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।
ডায়ালেকটিকস এর একটি সূত্র বলছে, পরিবর্তন বা বিকাশ একটি নিয়ম মেনে চলে। তা ঘূর্ণায়মান পদ্ধতির মতো। যে বিন্দু থেকে বস্তুটি যাত্রা শুরু করে তা ঘুরে এসে ঠিক আগের বিন্দুতে মেলেনা। আগের বিন্দু থেকে উপড়ে উঠে যায়। এইটি স্পাইরাল পদ্ধতি বা স্পিরিং এর মতো। সুতরাং কোন পরিবর্তনই আমাদের পূর্বাবস্থায় নেবে না, বিজ্ঞানের এ সত্যটি সামনে রেখেই আমাদের ভবিষ্যতকে বুঝতে হবে। জুলাইগণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে ইতিহাসের পুরোনো সে সত্যকে হাজির করেছে। শাসক যত শক্তিমানই হোকনা কেন, জনগণ সম্মিলিতভাবে রাজনৈতিক সত্তা হয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ালে সে ইতিহাস বদলে দিতে পারে।
বিএনপি আগেও রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু সমাজ বিজ্ঞানের তত্ত্ব বলে বর্তমান বিএনপি আগের বিএনপি এক নয়। দেখার বিষয় তারা কতদূর যায়। তাদের সামনে সম্ভাবনার উন্মিুক্ত অবারিত দ্বার, পেছনে একটি স্বৈরশাসনের মর্মান্তিক পরিণতির ইতিহাস। কিন্তু দুর্বিত্তায়নের ইতিহাস খুব সহজ-সরল নয়, তাই সামনের লড়াইটাও যে খুব সহজ হবে না আমরা তাও বুঝতে পারি। তবে লড়াইয়ের ধরনটা ঠিক আগের মতো আর হবে না। সামনের লড়াইয়ে রাজনীতিকে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে রক্ষা করা যেমনি জরুরী, তেমনি সংস্কৃতি ও ধর্মকে রক্ষা করাও বড় কর্তব্য। নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চিন্তা, ধর্ম, নীতি-নৈতিকতার বিকাশের মধ্য দিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা আজকে বড় কর্তব্য। এ কাজটি করতে গেলে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, সামাজিক দুর্বৃত্ত ও ধর্মীয় দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে লড়াই সমান ভাবে জারি রাখাটা জন্য জরুরী। মহাবিশ্বে মানুষ বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন জায়গায় বার বার সমাজ গড়ে তুলেছে। সমাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া। মানুষ নিজের গড়া সে সমাজের বাসিন্দা। মহামানবের চলমান স্রোতধারায় মানুষ অমর। মানুষ মরণশীল; কিন্তু মানুষ মরে না। মানুষ চলে গেলেও মানব বেঁচে থাকে। আর সে মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষাও কখনো মরে না।
লোড হচ্ছে...