মতামত
আইভীর মুক্তি: গণতন্ত্রের পুরোনো আস্থা ভেঙে গেছে, নতুন আস্থায় যেন চোট না লাগে
Newsview2j

কাজল কানন
দেশের রাজনীতিতে এখনো বৃত্তের বাইরের চর্চা সীমিত। ক্ষমতার পুনরুৎপাদন, আনুগত্যের পুরস্কার এবং ভিন্নমতের পদ্ধতিগত দমন এই বৃত্তের প্রবল বৈশিষ্ট্য। চলমান কাঠামো ভাঙার চেষ্টা যে কেউ করলে তাকে হয় কোণঠাসা, নয়তো নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এমন বাস্তবতা ফ্যাসিবাদের উত্থান ত্বরান্বিত করে। এটি কিন্তু আমাদের অতীত রাজনীতেতে দেখা গেছে। তাই নারায়ণগঞ্জের সাবেক সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর উত্থান এবং বর্তমান কারাবন্দি অবস্থা একটি খোলামেলা রাজনৈতিক সত্যকে সামনে আনে। সেটি হচ্ছে- বাংলাদেশে গণমুখী, স্বাধীনচেতা, ব্যতিক্রম নেতৃত্ব এখনো কাঠামোগতভাবে অগ্রহণযোগ্য কিনা?
সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেবল একজন নিরীহ গোছের নারী মেয়র হিসেবে দেখার সুযোগ কম। তিনি মূলত একটি রাজনৈতিক অস্বস্তির নাম। গত ত্রিশ বছরের নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ধারায় আইভী পষ্ট গণমুখী ও ব্যতিক্রম। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তার বিজয় কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে নীরব গণবিস্ফোরণ। ক্ষমতাসীন দল, প্রধান বিরোধী দল, স্থানীয় ব্যবসায়ী-স্বার্থগোষ্ঠী—সবকিছুর মিলিত চাপের বিপরীতে তিনি জনগণের সরাসরি ভোটে জয়ী হন। কোনো লাঠিয়াল বাহিনী, পেশিশক্তি বা অর্থনৈতিক দুর্বত্তায়ন ছাড়াই তার এই বিজয় বাংলাদেশের প্রচলিত নির্বাচনী বাস্তবতায় ব্যতিক্রম।
এই জায়গাটিই তাকে ক্ষমতার দৃষ্টিতে “বিপজ্জনক” করে তোলে। কারণ তিনি দেখিয়েছেন—কেবল দলের অনুমোদন, কেন্দ্রের আশীর্বাদ বা আপসের ধারাবাহিকতা নয়; বরং সরাসরি জনআস্থার ওপর দাঁড়িয়েও ক্ষমতায় আসা সম্ভব। আর এই বাস্তবতা প্রচলিত মোলায়েম রাজনীতির জন্য অস্বস্তি।
তার রাজনৈতিক চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্পষ্টভাষিতা—যাকে অনেকটা ‘ঠোঁটকাটা’ অবস্থান বলা চলে। আলোচিত কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইভীর নির্ভীক অবস্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি তার ধারাবাহিক রাজনৈতিক আচরণের অংশ। যেখানে অন্যরা কৌশলী নীরবতা বেছে নেন, তিনি সেখানে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। এই সরাসরিতা কেবল ব্যক্তিগত সাহসের প্রকাশ নয়; এটি ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ। এই প্রতিরোধই তাকে জনমানসে আলাদা অবস্থানে নিয়ে যায়।
আইভীর এই অবস্থানই রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য করে তোলে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সততা এবং স্পষ্টভাষিতা প্রায়শই গুণ হিসেবে নয়, বরং দায় হিসেবে বিবেচিত হয়। যে নেতা কাঠামোর সীমা অতিক্রম করেন, কাঠামো তাকে সহ্য করে না। আইভীর বর্তমান কারাবন্দিত্ব সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
তার আটক অবস্থাকে যদি কেবল আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক বার্তা—যারা বৃত্তের বাইরে গিয়ে রাজনীতি করতে চান, তাদের জন্য সংকেত। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বার্তা কি কেবল আইভীর জন্য, নাকি ভবিষ্যতের সব ব্যতিক্রমী নেতৃত্বের জন্যও?
এখানে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বিচার শেষ হওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি আটক ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইন কেবল প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তার অংশ। আইন যদি রাজনৈতিক প্রয়োজন পূরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে তা আর আইন থাকে না—নিয়ন্ত্রণের উপকরণ হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ বলছে— রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তার বা আটক যদি ভিন্নমত দমনের কৌশল হয়ে ওঠে, তাহলে তা গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোকেই দুর্বল করে। আইভীর বর্তমান পরিস্থিতি সেই উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয় না।
আরও সরাসরি বললে, আইভীর বন্দিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত প্রতিক্রিয়া। তিনি যে ধরনের জনপ্রতিনিধিত্ব করেন—যেখানে জনস্বার্থ, জবাবদিহি এবং নৈতিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়— এটি চলিত ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে যায় না। ফলে তাকে নিয়ন্ত্রণ, সীমাবদ্ধ বা নিষ্ক্রিয় করার প্রবণতা রাজনৈতিকভাবে “স্বাভাবিক” হয়ে উঠলেও, তা গণতন্ত্রের জন্য গভীর বিপজ্জনক।
এখানে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন ওঠে: যদি আইভী প্রকৃতপক্ষে অপরাধী হন, তাহলে দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা প্রমাণ করা হচ্ছে না কেন? আর যদি তিনি অপরাধী না হন, ধারণানির্ভর অভিযোগে তাকে দীর্ঘদিন আটক রাখার বৈধতা কি দেশের সংবিধান দেয়? এই দ্বৈততা নিজেই ইঙ্গিত করে—বিষয়টি কেবল আইনের নয়; এটি ক্ষমতার রাজনীতি।
আইভীর অনন্যতা এখানেই। তিনি দেখিয়েছেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের খেলা নয়; এটি একটি নৈতিক অবস্থানও হতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছেন, জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব—যদি নেতৃত্বে সততা, সাহস এবং দায়বদ্ধতা থাকে। কিন্তু এই ইতিবাচক দৃষ্টান্তই বৈপরীত্ব হিসেবে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। কারণ একটি বিকল্প মডেল যত সফল হয়, ততই তা প্রচলিত মডেলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরেও আইভী গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো—বিশেষ করে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে—মেরুদণ্ড খাঁড়া রেখে অবস্থান নেন তিনি। ভয় ও বিকল্পহীনতার সংস্কৃতির পাল্টা আর সোজাসাপটা অবস্থান তাকে স্থানীয় স্থানীয় গণ-মানুষের কাছে মিথে পরিণত করেছে। এই পথচলায় নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতিকর্মীসহ নাগরিক সমাজের একটি অংশ তার পাশে ছিল। বরং তার নিজ দলই অনেক ক্ষেত্রে গণমুখী কাজ তাকে বাধা দিয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি যে দলের রাজনীতিতে বিশ্বাসী- এটি দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
এরপরও কারো একটি রাজনৈতিক অবস্থান থাকতে পারে, তারও রয়েছে— গণতন্ত্রে অন্যতম শর্ত এটি। কিন্তু সেই পরিচয়ের আড়ালে আইভীর অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার দৃশ্যমান প্রমাণ জনসমক্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তার রাজনৈতিক পরিচয় তার জন্য সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি তৈরি করেছে। ফলে তার রাজনৈতিক মত বা অবস্থানকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বরং তিনি এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা তার দলের অনেক নেতার পক্ষে সম্ভব হয়নি। প্রতিকূল ও ঝুঁকিপূর্ণ সময়েও তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন, এমনকি রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে দলীয় পরিচয়ের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে কারাগারে গেছেন। এই স্পষ্টভাষিতা—এই ‘ঠোঁটকাটা’ অবস্থান—বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যতিক্রম। অন্যদিকে তিনি জাতীয় নয়, স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে আইভী তার দলে নীতি রীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন- এমন উদাহরণ নারায়ণগঞ্জের বাস্তবতায় ভুড়ি ভুড়ি।
সবশেষে, আইভীর মুক্তির প্রশ্নে রাষ্ট্র কতটা সহনশীল, কতটা আত্মবিশ্বাসী আর গণতান্ত্রিক- সেটি রাষ্ট্রকে করে দেখাতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভিন্নমতকে ভয় পায় না; বরং জায়গা দেয়। বিপরীতে, অনিরাপদ রাষ্ট্র ভিন্নমত দমন করে।
আইভীর মুক্তির বিষয়টি শেষ পর্যন্ত শুধু ব্যক্তির নয়; রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং গণতন্ত্র খোলসা করারও বিষয়। কারণ গণতন্ত্রের পুরোনো আস্থা ভেঙ গেছে, নতুন আস্থায় যেন চোট না লাগে। সেই পথ ঠিক করার জন্য দায় এড়ানো যায় না।
সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেবল একজন নিরীহ গোছের নারী মেয়র হিসেবে দেখার সুযোগ কম। তিনি মূলত একটি রাজনৈতিক অস্বস্তির নাম। গত ত্রিশ বছরের নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ধারায় আইভী পষ্ট গণমুখী ও ব্যতিক্রম। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তার বিজয় কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে নীরব গণবিস্ফোরণ। ক্ষমতাসীন দল, প্রধান বিরোধী দল, স্থানীয় ব্যবসায়ী-স্বার্থগোষ্ঠী—সবকিছুর মিলিত চাপের বিপরীতে তিনি জনগণের সরাসরি ভোটে জয়ী হন। কোনো লাঠিয়াল বাহিনী, পেশিশক্তি বা অর্থনৈতিক দুর্বত্তায়ন ছাড়াই তার এই বিজয় বাংলাদেশের প্রচলিত নির্বাচনী বাস্তবতায় ব্যতিক্রম।
এই জায়গাটিই তাকে ক্ষমতার দৃষ্টিতে “বিপজ্জনক” করে তোলে। কারণ তিনি দেখিয়েছেন—কেবল দলের অনুমোদন, কেন্দ্রের আশীর্বাদ বা আপসের ধারাবাহিকতা নয়; বরং সরাসরি জনআস্থার ওপর দাঁড়িয়েও ক্ষমতায় আসা সম্ভব। আর এই বাস্তবতা প্রচলিত মোলায়েম রাজনীতির জন্য অস্বস্তি।
তার রাজনৈতিক চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্পষ্টভাষিতা—যাকে অনেকটা ‘ঠোঁটকাটা’ অবস্থান বলা চলে। আলোচিত কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইভীর নির্ভীক অবস্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি তার ধারাবাহিক রাজনৈতিক আচরণের অংশ। যেখানে অন্যরা কৌশলী নীরবতা বেছে নেন, তিনি সেখানে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। এই সরাসরিতা কেবল ব্যক্তিগত সাহসের প্রকাশ নয়; এটি ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ। এই প্রতিরোধই তাকে জনমানসে আলাদা অবস্থানে নিয়ে যায়।
আইভীর এই অবস্থানই রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য করে তোলে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সততা এবং স্পষ্টভাষিতা প্রায়শই গুণ হিসেবে নয়, বরং দায় হিসেবে বিবেচিত হয়। যে নেতা কাঠামোর সীমা অতিক্রম করেন, কাঠামো তাকে সহ্য করে না। আইভীর বর্তমান কারাবন্দিত্ব সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
তার আটক অবস্থাকে যদি কেবল আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক বার্তা—যারা বৃত্তের বাইরে গিয়ে রাজনীতি করতে চান, তাদের জন্য সংকেত। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বার্তা কি কেবল আইভীর জন্য, নাকি ভবিষ্যতের সব ব্যতিক্রমী নেতৃত্বের জন্যও?
এখানে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বিচার শেষ হওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি আটক ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইন কেবল প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তার অংশ। আইন যদি রাজনৈতিক প্রয়োজন পূরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে তা আর আইন থাকে না—নিয়ন্ত্রণের উপকরণ হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ বলছে— রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তার বা আটক যদি ভিন্নমত দমনের কৌশল হয়ে ওঠে, তাহলে তা গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোকেই দুর্বল করে। আইভীর বর্তমান পরিস্থিতি সেই উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয় না।
আরও সরাসরি বললে, আইভীর বন্দিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত প্রতিক্রিয়া। তিনি যে ধরনের জনপ্রতিনিধিত্ব করেন—যেখানে জনস্বার্থ, জবাবদিহি এবং নৈতিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়— এটি চলিত ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে যায় না। ফলে তাকে নিয়ন্ত্রণ, সীমাবদ্ধ বা নিষ্ক্রিয় করার প্রবণতা রাজনৈতিকভাবে “স্বাভাবিক” হয়ে উঠলেও, তা গণতন্ত্রের জন্য গভীর বিপজ্জনক।
এখানে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন ওঠে: যদি আইভী প্রকৃতপক্ষে অপরাধী হন, তাহলে দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা প্রমাণ করা হচ্ছে না কেন? আর যদি তিনি অপরাধী না হন, ধারণানির্ভর অভিযোগে তাকে দীর্ঘদিন আটক রাখার বৈধতা কি দেশের সংবিধান দেয়? এই দ্বৈততা নিজেই ইঙ্গিত করে—বিষয়টি কেবল আইনের নয়; এটি ক্ষমতার রাজনীতি।
আইভীর অনন্যতা এখানেই। তিনি দেখিয়েছেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের খেলা নয়; এটি একটি নৈতিক অবস্থানও হতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছেন, জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব—যদি নেতৃত্বে সততা, সাহস এবং দায়বদ্ধতা থাকে। কিন্তু এই ইতিবাচক দৃষ্টান্তই বৈপরীত্ব হিসেবে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। কারণ একটি বিকল্প মডেল যত সফল হয়, ততই তা প্রচলিত মডেলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরেও আইভী গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো—বিশেষ করে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে—মেরুদণ্ড খাঁড়া রেখে অবস্থান নেন তিনি। ভয় ও বিকল্পহীনতার সংস্কৃতির পাল্টা আর সোজাসাপটা অবস্থান তাকে স্থানীয় স্থানীয় গণ-মানুষের কাছে মিথে পরিণত করেছে। এই পথচলায় নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতিকর্মীসহ নাগরিক সমাজের একটি অংশ তার পাশে ছিল। বরং তার নিজ দলই অনেক ক্ষেত্রে গণমুখী কাজ তাকে বাধা দিয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি যে দলের রাজনীতিতে বিশ্বাসী- এটি দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
এরপরও কারো একটি রাজনৈতিক অবস্থান থাকতে পারে, তারও রয়েছে— গণতন্ত্রে অন্যতম শর্ত এটি। কিন্তু সেই পরিচয়ের আড়ালে আইভীর অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার দৃশ্যমান প্রমাণ জনসমক্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তার রাজনৈতিক পরিচয় তার জন্য সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি তৈরি করেছে। ফলে তার রাজনৈতিক মত বা অবস্থানকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বরং তিনি এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা তার দলের অনেক নেতার পক্ষে সম্ভব হয়নি। প্রতিকূল ও ঝুঁকিপূর্ণ সময়েও তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন, এমনকি রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে দলীয় পরিচয়ের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে কারাগারে গেছেন। এই স্পষ্টভাষিতা—এই ‘ঠোঁটকাটা’ অবস্থান—বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যতিক্রম। অন্যদিকে তিনি জাতীয় নয়, স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে আইভী তার দলে নীতি রীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন- এমন উদাহরণ নারায়ণগঞ্জের বাস্তবতায় ভুড়ি ভুড়ি।
সবশেষে, আইভীর মুক্তির প্রশ্নে রাষ্ট্র কতটা সহনশীল, কতটা আত্মবিশ্বাসী আর গণতান্ত্রিক- সেটি রাষ্ট্রকে করে দেখাতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভিন্নমতকে ভয় পায় না; বরং জায়গা দেয়। বিপরীতে, অনিরাপদ রাষ্ট্র ভিন্নমত দমন করে।
আইভীর মুক্তির বিষয়টি শেষ পর্যন্ত শুধু ব্যক্তির নয়; রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং গণতন্ত্র খোলসা করারও বিষয়। কারণ গণতন্ত্রের পুরোনো আস্থা ভেঙ গেছে, নতুন আস্থায় যেন চোট না লাগে। সেই পথ ঠিক করার জন্য দায় এড়ানো যায় না।
লোড হচ্ছে...