আন্তর্জাতিক
আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা: পুরোনো শত্রু নতুন সংঘাত
NewsView

তৌহিদুজ্জামান সোহান
আফগানিস্তান-পাকিস্তান টানাপড়েন আজকের নয়। কেবল পশতুদের নিয়েই তো দশক-দশকের বিরোধ রয়েছে দেশটির। তার ওপর দুই দেশের সীমান্তও অস্থির হয়ে থাকে সংঘাতের ডামাডোলে। সর্বশেষ উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের একটি নিরাপত্তাচৌকিতে হামলায় ছয় সেনা নিহত হয়েছে। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কুররাম জেলার উপজাতীয় এলাকায় অবস্থিত ওই চৌকিতে আকস্মিক হামলা চালায়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, এতে তীব্র গোলাগুলির লড়াই শুরু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ ও নিরাপত্তা সূত্র। এই হামলাটি এমন সময়ে ঘটল যখন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সংঘটিত একাধিক ছোটোখাটো সংঘর্ষে ডজনখানেক মানুষ নিহত হয়েছে। এসব সংঘর্ষ সীমান্তে উত্তেজনা আরও বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করেছে। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, ছয়জন নিরাপত্তা সদস্য শহিদ হয়েছেন এবং চারজন আহত হয়েছেন। আর দুই জঙ্গিও লড়াইয়ে নিহত হয়েছে। টিটিপি প্রায় দুই দশক ধরে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলে হামলা বাড়িয়েছে তারা। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে যে, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে ক্ষমতা নেওয়া তালেবান সরকার তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। কাবুল এ অভিযোগ অস্বীকার করে এবং বলে যে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিষয়টি পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমস্যা। মাঠের বাইরে থাকা বিভিন্ন বিষয়ও উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছে। পাকিস্তান দেশটিতে থাকা লাখ লাখ আফগান আশ্রয়প্রার্থীর ব্যাপক বহিষ্কার কার্যক্রম দ্রুততর করেছে।
এমনিতেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক বহুদিনের ক্ষত বহন করে চলছে। দুই দেশই একে অন্যকে ইতিহাসের ভ্রান্ত ধারণা, ভীতি আর অভিযোগের চোখ দিয়ে দেখে এসেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু বাস্তবতা আড়াল করেনি বরং তৈরি করেছে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস। গত কয়েক দশক ধরে একে অন্যের শত্রুদের আশ্রয় দেওয়া এই সন্দেহকে আরও গভীর করেছে। পাকিস্তান বহু বছর ধরে কৌশলগত গভীরতার নামে আফগান তালেবানকে আশ্রয় ও সহযোগিতা দিয়েছে। এর ফলেই অনেক আফগান নিজেদের রাষ্ট্র ও সমাজ ধ্বংসের জন্য পাকিস্তানকে প্রধান দায়ী বলে মনে করে। আজ সেই পরিস্থিতি উল্টে গেছে। এখন আফগানিস্তানই পাকিস্তানের অন্যতম শত্রু সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে আশ্রয় দিচ্ছে। সীমান্তে গোলাগুলি থেকে শুরু করে মাঝেমধ্যে রাজধানীতে হামলা যেকোনো ঘটনায় পুরোনো ক্ষত আবার ফুটে ওঠে।
তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের পর যে সম্পর্ককে অনেকেই মিত্রতা ভাবত, তা খুব দ্রুত ভেঙে গেছে। দুই পক্ষই সীমান্তে গোলাগুলি, শেলিং আর অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলছে। সৌদি আরবসহ বেশ কিছু দেশের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনাও উত্তেজনা কমাতে পারেনি। অক্টোবরের কাবুল বিস্ফোরণ ও পরবর্তী সীমান্ত-সংঘর্ষ দেখিয়ে দিয়েছে পরিস্থিতি কতটা ভঙ্গুর হয়ে আছে। মূলত তিনটি স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক জট এই অচলাবস্থাকে ধরে রেখেছে।
প্রথম সমস্যা হলো পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলে বাড়তে থাকা জঙ্গিবাদ। তালেবান শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়েছে। আফগান ও পাকিস্তানি তালেবান দুটি গোষ্ঠীই প্রায় একই শিকড় থেকে উঠে এসেছে। রক্তের সম্পর্ক, বিয়েবন্ধন, ভাষা ও উপজাতীয় বন্ধন এসব কিছু তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার ভিত্তি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আগের আফগান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় পাকিস্তান যে আশ্রয় ও সহায়তা দিয়েছিল, তা তালেবানের কাছে আজ ঋণের মতো। এবার সেই ঋণ শোধ করতে তারা টিটিপিকে রক্ষা করছে। পাকিস্তানের কাছে এটি নির্মম বিদ্রুপ; নিজেদের তৈরি করা ছায়া আজ তাদের দিকেই ফিরে এসেছে।
দ্বিতীয় সমস্যা ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। আফগানিস্তানকে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে ভারত সেখানে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নানা সামাজিক প্রকল্প চালিয়েছে। এতে পাকিস্তান উদ্বিগ্ন। তাদের দৃষ্টিতে এটি পাকিস্তানকে আঞ্চলিকভাবে ঘিরে ফেলার কৌশল। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন গত অক্টোবরে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুততাকি দিল্লি সফর করেন। পাকিস্তানে এই সফরকে দেখা হয় ভারত-তালেবান ঘনিষ্ঠতার সংকেত হিসেবে। সমীক্ষায় দেখা যায়, সীমান্ত উত্তেজনা সম্পর্কে অবগত পাকিস্তানিদের ৫১ শতাংশ এই সফরে আপত্তি জানিয়েছেন।
তৃতীয় জটিলতা ডুরান্ড লাইন। ১৮৯৩ সালে আঁকা এই সীমান্ত বিভাজন দুই পাশের পশতু জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে দেয়। পরপর কোনো আফগান সরকারই এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। যদিও বাস্তবে তারা সীমান্তকে মেনে নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। পাকিস্তানের পাশের পশতুরা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো ইচ্ছা দেখায় না, তবুও আফগান নেতারা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে প্রায়ই এই ইস্যুটি সামনে আনেন।
এদিকে, পাকিস্তানের সীমান্ত বন্ধ করা, শরণার্থীদের চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ আফগানদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিমান হামলায় বেসামরিক প্রাণহানি ঘটলে সেই ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। আফগানদের একাংশ মনে করে, এই ধরনের সামরিক চাপই উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির প্রকাশ্যে কাবুলের প্রতি কড়া বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, হয় পাকিস্তান নয় টিটিপি-কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। সীমান্তে কয়েক দিনের ভয়াবহ সংঘর্ষে বহু সৈন্য, বেসামরিক মানুষ ও যোদ্ধা নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা টানা বাড়তে থাকে। কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি টিকলেও দুই পক্ষের সন্দেহ দূর হয়নি।
এর বাইরে পাকিস্তান-ভারত সংঘাত নতুন করে জেগে ওঠায় পরিস্থিতির পটভূমিও বদলে গেছে। কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে থাকা স্থায়ী উত্তেজনা আলোচনার জন্য কোনো বাস্তব পরিবেশই রাখে না। এত সবমিলিয়ে শান্তির পথ আজও দূরে। প্রকৃত সমাধান সম্ভব কেবল তখনই, যখন আফগানিস্তানে প্রতিনিধিত্বমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি সরকার গঠিত হবে। দোহা চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যেখানে সব পক্ষ অংশ নেবে এবং একটি বৈধ সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। যে সরকার প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলোচনা করবে, জঙ্গিদের আশ্রয় দেবে না এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মেনে চলবে।
তালেবান সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়া দোহা চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো এই দায়বদ্ধতা কার্যকর না করলে বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। আফগানিস্তানে রাজনৈতিক রূপান্তর ছাড়া পাকিস্তান-আফগান সম্পর্ক স্থায়ী স্থিতি পাবে। এমন আশা করাই কঠিন বলে মনে করেন বিশ্লেষক ওয়াহাব রউফি। তার ভাষ্য মতে-দুই দেশের শান্তি নির্ভর করছে এমন এক আফগানিস্তানের ওপর, যার সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, আইন ও কূটনীতির পথকে অগ্রাধিকার দেয় এবং প্রতিবেশীকে শত্রু নয়, প্রতিবেশী হিসেবেই দেখে। তার আগে উত্তেজনা কমলেও অবিশ্বাস কমবে না। আর অবিশ্বাস থাকলে কখনোই স্থায়ী শান্তি আসবে না।
আফগানিস্তান-পাকিস্তান টানাপড়েন আজকের নয়। কেবল পশতুদের নিয়েই তো দশক-দশকের বিরোধ রয়েছে দেশটির। তার ওপর দুই দেশের সীমান্তও অস্থির হয়ে থাকে সংঘাতের ডামাডোলে। সর্বশেষ উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের একটি নিরাপত্তাচৌকিতে হামলায় ছয় সেনা নিহত হয়েছে। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কুররাম জেলার উপজাতীয় এলাকায় অবস্থিত ওই চৌকিতে আকস্মিক হামলা চালায়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, এতে তীব্র গোলাগুলির লড়াই শুরু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ ও নিরাপত্তা সূত্র। এই হামলাটি এমন সময়ে ঘটল যখন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সংঘটিত একাধিক ছোটোখাটো সংঘর্ষে ডজনখানেক মানুষ নিহত হয়েছে। এসব সংঘর্ষ সীমান্তে উত্তেজনা আরও বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করেছে। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, ছয়জন নিরাপত্তা সদস্য শহিদ হয়েছেন এবং চারজন আহত হয়েছেন। আর দুই জঙ্গিও লড়াইয়ে নিহত হয়েছে। টিটিপি প্রায় দুই দশক ধরে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলে হামলা বাড়িয়েছে তারা। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে যে, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে ক্ষমতা নেওয়া তালেবান সরকার তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। কাবুল এ অভিযোগ অস্বীকার করে এবং বলে যে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিষয়টি পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমস্যা। মাঠের বাইরে থাকা বিভিন্ন বিষয়ও উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছে। পাকিস্তান দেশটিতে থাকা লাখ লাখ আফগান আশ্রয়প্রার্থীর ব্যাপক বহিষ্কার কার্যক্রম দ্রুততর করেছে।
এমনিতেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক বহুদিনের ক্ষত বহন করে চলছে। দুই দেশই একে অন্যকে ইতিহাসের ভ্রান্ত ধারণা, ভীতি আর অভিযোগের চোখ দিয়ে দেখে এসেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু বাস্তবতা আড়াল করেনি বরং তৈরি করেছে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস। গত কয়েক দশক ধরে একে অন্যের শত্রুদের আশ্রয় দেওয়া এই সন্দেহকে আরও গভীর করেছে। পাকিস্তান বহু বছর ধরে কৌশলগত গভীরতার নামে আফগান তালেবানকে আশ্রয় ও সহযোগিতা দিয়েছে। এর ফলেই অনেক আফগান নিজেদের রাষ্ট্র ও সমাজ ধ্বংসের জন্য পাকিস্তানকে প্রধান দায়ী বলে মনে করে। আজ সেই পরিস্থিতি উল্টে গেছে। এখন আফগানিস্তানই পাকিস্তানের অন্যতম শত্রু সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে আশ্রয় দিচ্ছে। সীমান্তে গোলাগুলি থেকে শুরু করে মাঝেমধ্যে রাজধানীতে হামলা যেকোনো ঘটনায় পুরোনো ক্ষত আবার ফুটে ওঠে।
তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের পর যে সম্পর্ককে অনেকেই মিত্রতা ভাবত, তা খুব দ্রুত ভেঙে গেছে। দুই পক্ষই সীমান্তে গোলাগুলি, শেলিং আর অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলছে। সৌদি আরবসহ বেশ কিছু দেশের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনাও উত্তেজনা কমাতে পারেনি। অক্টোবরের কাবুল বিস্ফোরণ ও পরবর্তী সীমান্ত-সংঘর্ষ দেখিয়ে দিয়েছে পরিস্থিতি কতটা ভঙ্গুর হয়ে আছে। মূলত তিনটি স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক জট এই অচলাবস্থাকে ধরে রেখেছে।
প্রথম সমস্যা হলো পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলে বাড়তে থাকা জঙ্গিবাদ। তালেবান শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়েছে। আফগান ও পাকিস্তানি তালেবান দুটি গোষ্ঠীই প্রায় একই শিকড় থেকে উঠে এসেছে। রক্তের সম্পর্ক, বিয়েবন্ধন, ভাষা ও উপজাতীয় বন্ধন এসব কিছু তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার ভিত্তি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আগের আফগান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় পাকিস্তান যে আশ্রয় ও সহায়তা দিয়েছিল, তা তালেবানের কাছে আজ ঋণের মতো। এবার সেই ঋণ শোধ করতে তারা টিটিপিকে রক্ষা করছে। পাকিস্তানের কাছে এটি নির্মম বিদ্রুপ; নিজেদের তৈরি করা ছায়া আজ তাদের দিকেই ফিরে এসেছে।
দ্বিতীয় সমস্যা ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। আফগানিস্তানকে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে ভারত সেখানে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নানা সামাজিক প্রকল্প চালিয়েছে। এতে পাকিস্তান উদ্বিগ্ন। তাদের দৃষ্টিতে এটি পাকিস্তানকে আঞ্চলিকভাবে ঘিরে ফেলার কৌশল। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন গত অক্টোবরে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুততাকি দিল্লি সফর করেন। পাকিস্তানে এই সফরকে দেখা হয় ভারত-তালেবান ঘনিষ্ঠতার সংকেত হিসেবে। সমীক্ষায় দেখা যায়, সীমান্ত উত্তেজনা সম্পর্কে অবগত পাকিস্তানিদের ৫১ শতাংশ এই সফরে আপত্তি জানিয়েছেন।
তৃতীয় জটিলতা ডুরান্ড লাইন। ১৮৯৩ সালে আঁকা এই সীমান্ত বিভাজন দুই পাশের পশতু জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে দেয়। পরপর কোনো আফগান সরকারই এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। যদিও বাস্তবে তারা সীমান্তকে মেনে নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। পাকিস্তানের পাশের পশতুরা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো ইচ্ছা দেখায় না, তবুও আফগান নেতারা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে প্রায়ই এই ইস্যুটি সামনে আনেন।
এদিকে, পাকিস্তানের সীমান্ত বন্ধ করা, শরণার্থীদের চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ আফগানদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিমান হামলায় বেসামরিক প্রাণহানি ঘটলে সেই ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। আফগানদের একাংশ মনে করে, এই ধরনের সামরিক চাপই উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির প্রকাশ্যে কাবুলের প্রতি কড়া বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, হয় পাকিস্তান নয় টিটিপি-কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। সীমান্তে কয়েক দিনের ভয়াবহ সংঘর্ষে বহু সৈন্য, বেসামরিক মানুষ ও যোদ্ধা নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা টানা বাড়তে থাকে। কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি টিকলেও দুই পক্ষের সন্দেহ দূর হয়নি।
এর বাইরে পাকিস্তান-ভারত সংঘাত নতুন করে জেগে ওঠায় পরিস্থিতির পটভূমিও বদলে গেছে। কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে থাকা স্থায়ী উত্তেজনা আলোচনার জন্য কোনো বাস্তব পরিবেশই রাখে না। এত সবমিলিয়ে শান্তির পথ আজও দূরে। প্রকৃত সমাধান সম্ভব কেবল তখনই, যখন আফগানিস্তানে প্রতিনিধিত্বমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি সরকার গঠিত হবে। দোহা চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যেখানে সব পক্ষ অংশ নেবে এবং একটি বৈধ সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। যে সরকার প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলোচনা করবে, জঙ্গিদের আশ্রয় দেবে না এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মেনে চলবে।
তালেবান সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়া দোহা চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো এই দায়বদ্ধতা কার্যকর না করলে বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। আফগানিস্তানে রাজনৈতিক রূপান্তর ছাড়া পাকিস্তান-আফগান সম্পর্ক স্থায়ী স্থিতি পাবে। এমন আশা করাই কঠিন বলে মনে করেন বিশ্লেষক ওয়াহাব রউফি। তার ভাষ্য মতে-দুই দেশের শান্তি নির্ভর করছে এমন এক আফগানিস্তানের ওপর, যার সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, আইন ও কূটনীতির পথকে অগ্রাধিকার দেয় এবং প্রতিবেশীকে শত্রু নয়, প্রতিবেশী হিসেবেই দেখে। তার আগে উত্তেজনা কমলেও অবিশ্বাস কমবে না। আর অবিশ্বাস থাকলে কখনোই স্থায়ী শান্তি আসবে না।
লোড হচ্ছে...