জাতীয়
তারেক রহমান— দ্য মডার্ন প্রিন্স
NewsView

রহমান সিদ্দিক
এক. তারেক রহমান ২০০৭ সালে যখন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কারাগারে বন্দি, সে সময় তিনি পড়ার জন্য কিছু বই চেয়েছিলেন স্বজন-সুভানুধ্যায়ীদের কাছে। তার মধ্যে একটি বই ছিল নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’। মানে একটি রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালিত হবে, সেই ভাবনা ২০০৭ সালেই কারাগারে বসে ভাবছিলেন তারেক রহমান। এখন অনেকে বলবেন, ম্যাকিয়াভেলি তো একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেছেন, আধুনিক উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থায় তাঁর জায়গা কোথায়? আমি বলব, এই ভাবনা খণ্ডিত। ম্যাকিয়াভেলির সামনে ছিল মধ্য যুগের ইউরোপের সমাজ; সামন্তবাদী সেই সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি গণতন্ত্রের কথা বলেছেন, বলেছেন মানবতাবাদের কথা। পরবর্তীকালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাই ম্যাকিয়াভেলিকে বলেছেন, ‘ছদ্মবেশী গণতন্ত্রী’।
ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন ইটালির ফ্লোরেন্সের শাসকগোষ্ঠী মেডিসি পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল। বইটি তিনি উৎসর্গ করেন পিয়েরো ডি মেডিসির ছেলে লরেঞ্জোকে। ম্যাকিয়াভেলি যে গণতন্ত্রপন্থী, তার তাঁর উৎসর্গপত্রেই স্পষ্ট হয়ে যায়। রাজার উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘একজন শিল্পী নিচে দাঁড়িয়ে পাহাড়-উপত্যকা বা নৈসর্গিক দৃশ্য আঁকতে পারেন না। সেখানে শিল্পীকে পাহাড় কিংবা সমতলভূমি থেকে কিছুটা উঠতে হয়। রাষ্ট্রনায়কদের বিষয়টাও সেরকম। সঠিকভাবে রাজ্য শাসন করতে হলে রাষ্ট্রনায়কদের নেমে আসতে হবে জনগণ কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের কাছাকাছি। বুঝতে হবে জনগণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।’
‘দ্য প্রিন্স’ বইয়ে ম্যাকিয়াভেলি শাসককে আবেগি না হয়ে বাস্তববাদী হতে বলেছেন। এর জন্য প্রয়োজনে শাসককে সিংহের মতো শক্তিশালী ও শিয়ালের মতো ধূর্ত হওয়ার কৌশল নিতেও পরামর্শ দিয়েছেন। বাস্তবিক অর্থে ম্যাকিয়াভেলি এই কথা বলেছেন, রাষ্ট্রের স্থিতিতাবস্থা বজায় রাখার স্বার্থে, শাসককে কর্তৃত্ববাদী হতে নয়। পরবর্তীকালের অনেক দেশের কর্তৃত্বাদী শাসকরা ম্যাকিয়াভেলির এই খণ্ডিত বক্তব্যকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে নিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। অথচ ম্যাকিয়াভেলি স্পষ্টতই বলেছেন, শাসককে নির্দয় নয়, হতে হবে সদয়। শাসক নিজেকে জনগণের কাছে ভীতির পাত্র করে তুলবেন না। ভালোবাসা অর্জন করতে না পারলেও যেন ঘৃণার পাত্র না হন।
অনুমান করি, তারেক রহমান ম্যাকিয়াভেলির এই আদর্শ অনুসরণ করে জনগণকে ভালোবাসা দিয়ে, জনগণের ভালোবাসা অর্জন করে সামনের দিনে তাঁর রাষ্ট্র প্রকল্প দাঁড় করাবেন। সেটা যে তিনি পারবেন, বিগত কয়েক বছর থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত তাঁর নানা বক্তৃতা, আচরণে এর প্রমাণ রেখে চলেছেন। এই লেখার শিরোমনি করা হয়েছে ‘দ্য মডার্ন প্রিন্স’। তার অর্থ এই নয় যে এটি আধুনিক কোনো রাজপুত্রকে নিয়ে কোনো গল্প বা লেখা। সেই উদ্দেশ্যও এই অধমের নেই। শিরোনামটা ধার করতে হয়েছে আন্তোনিও গ্রামশির ‘দ্য মডার্ন প্রিন্স’ নামক একটি বিখ্যাত লেখা থেকে। গ্রামশি এটি ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির জেল খানায় বসে লিখেছিলেন। ‘প্রিজন নোটবুকস’ নামে যা পরবর্তীকালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
লেখাটিতে মূলত গ্রামশি একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। এখানে ‘মডার্ন প্রিন্স’ শব্দটি গ্রামশি একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংগঠন বা নেতৃত্বের ধারণা বোঝাতে ব্যবহার করেছেন, যা জনগণের কণ্ঠস্বর, ইচ্ছা এবং স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর মতে, এই ‘মডার্ন প্রিন্স’ একটি সমন্বিত রাজনৈতিক শক্তি, যা প্রান্তিক ও নিপীড়িত জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রচলিত শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এবং সমাজে গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।
সুতরাং এই লেখায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘আধুনিক রাজপুত্র’ বোঝানো হয়নি, বোঝানো হয়েছে তাঁর চিন্তা, রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংগঠনিক কর্মতৎপরতাকে। তাঁর এই দূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন দেখা গেছে দুই বছর আগেই, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে। ২০২৩ সালের জুনে রাষ্ট্র কাঠামোর ৩১ দফা রূপরেখার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান একজন ‘মডার্ন প্রিন্স’ হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছেন। ৩১ দফার প্রথম দফাতেই বলা হয়েছে— ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ জন্য অব্যাহত আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে।’
বিএনপি যে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই এর প্রমাণ রেখে আসছে দলটি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ধারণা করা হচ্ছিল, আওয়ামী লীগের বহুসংখ্যক নেতাকর্মী হত্যা-নির্যাতনের শিকার হবেন। কারণ বিগত পনের বছরের বেশি সময় ধরে বিএনপির কর্মীরা যে ধরনের নির্যাতন, মামলা, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসা জেগে উঠবে। ৫ আগস্টের পূর্বে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও গলা উঁচু করে বলতেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে গেলে তাদের দুই লাখ লোককে হত্যা করা হবে। কিন্তু দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দেশে বড় কোনো অঘটন ঘটেনি। এমনটা হয়েছে শুধুমাত্র দলের নেতাকর্মীদের প্রতি তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশনার কারণে।
৫ আগস্টেই তারেক রহমান দেশবাসীসহ নিজ দলের নেতাকর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, রাজনৈতিক কারণে বা ধর্মীয় কারণে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসাপরায়ণ যেন তারা না হন। সেদিনের তাঁর দুটি মন্তব্য ইতিহাসের পাতায় অমোচনীয় হয়ে থাকবে— এক. ‘বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ের আনন্দ মহিমান্বিত হয়।’ দুই. ‘নিজেদের মহত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করুন, আপনি আওয়ামী লীগ না, আপনি মানুষ।’
৫ আগস্ট পরবর্তী আরও অনেক ভাষণে তারেক রহমান বলেছেন, তার দল প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ যা করেছে, একই কাজ যদি এখন বিএনপির নেতাকর্মীরা করেন, তাহলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য কোথায়? নেতাকর্মীদের তিনি বারবার আওয়ামী লীগ (নিপীড়ক অর্থে) না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ফ্যাসিস্ট আমলের পনের বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, হেফাজতে মৃত্যু, মিথ্যা মামলা— সবক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও দলটির নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরিয়েছেন। তারেক রহমান নিজেও এক-এগারো সরকারের আমলে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আর তাঁর মা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার মিথ্যা মামলা, প্রহসনের বিচারে শুধু কারাগারে বন্দি-ই করে রাখেনি, চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। আজকে খালেদা জিয়া যে গুরুতর অসুস্থ; জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তার প্রধান কারণ হাসিনার আমলে তাঁকে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা।
নিজের, পরিবারের এবং দলের নেতাকর্মীদের এমন অত্যাচার-নির্যাতনের পরেও তারেক রহমান প্রতিহিংসা-জিঘাংসার রাজনীতির পরিবর্তে সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা এবং ভালোবাসাকে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ কারণে তাঁকে মূল্যও দিতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু স্যোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার তাঁর এই প্রিন্সিপাল বা আদর্শকে ভালোভাবে নেননি। এই লোকদের দ্বারা তারেক রহমান ও তাঁর দলকে প্রতিনিয়ত কথার আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর এসব ইনফ্লুয়েন্সার দ্বারা অশ্লীল একটি গালি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই সংস্কৃতি বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ভালোভাবে সংক্রমিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, মব উসকে দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরির অপচেষ্টা করে যাচ্ছেন বিদেশে বসে এসব ইনফ্লুয়েন্সার। তারেক রহমান অনেকটা রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে এসবের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছেন। এ কারণে তরুণ প্রজন্মের ছোট একটি অংশ তাঁর ওপর নাখোশ।
ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার আরেকটি বড় উদাহরণ— তারেক রহমানকে নিয়ে এক কার্টুনিস্টের ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন। স্যোশাল মিডিয়ায় প্রচার হওয়া সেই ব্যঙ্গচিত্র তারেক রহমান নিজের ফেসবুক পেইজে শেয়ার দিয়ে ওই কার্টুনিস্টকে এমন আরও আরও ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন করতে উৎসাহিত করেছেন। এই যে উদারতা, সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ— বিগত সময়ে কোনো রাজনীতিবিদ দেখাতে পেরেছিলেন বলে আমাদের নজরে পড়ে না। তারেক রহমানের এই রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক চর্চা অন্য নেতারা ধারণ করতে পারলে সত্যিই একটি আদর্শ রাষ্ট্রের দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দুঃজনক হলো কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে এই মূল্যবোধের প্রবল ঘাটতি সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
তারেক রহমানের আরেকটি ‘মডার্ন প্রিন্স’ নীতি হলো রাজনৈতিক মতভিন্নতা যাই হোক, দলগুলোর মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য বজায় রাখা। সেটা না থাকলে জুলাই অভ্যুত্থানে এত এত তরুণ-যুবা-শিশুর রক্ত সম্পূর্ণ বৃথা যাবে। দলগুলোকে উদ্দেশ করে তিনি বারবার বলেছেন, আমাদের এই অনৈক্যের সুবিধা নিয়ে পতিত ফ্যাসিস্ট আবার ফিরে এলে আমি, আপনি কেউ বাঁচব না। তাঁর এই বক্তব্যে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাউন্ডিং ফাদারদের একজন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করার সময় আমেরিকান উপনিবেশগুলোর সাফল্যের জন্য ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন, না হলে তারা সবাই ধ্বংসের মুখোমুখি হবেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল-- ‘আমাদের সকলকে অবশ্যই এক সঙ্গে ঝুলতে (ফাঁসিতে) হবে, অথবা নিশ্চিতভাবেই আমরা সবাই আলাদাভাবে ঝুলব।’ তাঁর এই উক্তি সামাজিক সংহতির মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে বেঁচে থাকার একটি শক্তিশালী বার্তা। এর ব্যত্যয় হলে নিশ্চিত পরাজয়। এই একই বার্তা তারেক রহমানেরও।
দুই. তারেক রহমান একটা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রপ্রকল্প আমাদের সামনে হাজির করেছেন। তাঁর প্রতি শুভ কামনা। আমাদের বিশ্বাস তিনি সেটা পারবেন। কিন্তু সামনের দিকে আগাতে চাইলে এক পা পেছনে রাখতে হয়। তারেক রহমানের দল বিএনপি অতীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে তাদের অনেক সফলতা যেমন ছিল, ব্যর্থতার পাল্লাও কম ভারি নয়। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের পর পাঁচটি বছর বিএনপি সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করেছে, এটা বিশ্বাস করলে সত্যের অপলাপ হবে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে দীর্ঘ পনের বছর জাতি যে যাতাকলে পিষ্ট হয়েছে, তার জন্য বিএনপির সেই পাঁচ বছরের ব্যর্থতার দায় কম নয়। বিশেষত দলটি ক্ষমতা গ্রহণের পরই সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটা। এই দলীয় সন্ত্রাস দমাতে ‘অপারেশ ক্লিন হার্ট’ এর মতো সেনা অভিযান পর্যন্ত করতে হয়েছিল। সে সময় অনেক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে। তাতেও যখন খুব বেশি ফল দিল না, এরপর বিএনপি গঠন করল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নামে একটি আধা সামরিক বাহিনী। পরবর্তী সময়ে এই র্যাব-ই বিএনপির জন্য ফ্রাংকেনস্টাইনের দানব রূপে হাজির হলো। গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমাতে এই র্যাবের হাতেই বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী গুম-খুন, ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহিভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো। র্যাব হয়ে পড়ল একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী। এছাড়া দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের উত্থান, জায়গায় জায়গায় বোমা হামলা রাষ্ট্রকে অকার্যকর অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল সে সময়। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা। জঙ্গিরা এই হামলা চালালেও তার ব্যর্থতার দায় তখনকার প্রশাসন এড়াতে পারে না। তারেক রহমানের উচিত হবে এসব ব্যর্থতাকে পাঠ্যপুস্তকের মতো পাঠ করে আগামী দিনের রাষ্ট্র প্রকল্প সাজানো। এটা তারেক রহমানের জন্য বড় পরীক্ষা।
তিন. বিএনপি জনমানুষের দল, কোনো ক্যাডারভিত্তিক দল নয়। একমাত্র জনগণই বিএনপিকে রক্ষা করবে। ম্যাকিয়াভেলি তাঁর ‘প্রিন্স’ গ্রন্থে বলেছেন, জনগণ না চাইলে একজন শাসককে কোনো ক্যান্টনমেন্ট রক্ষা করতে পারবে না। বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে আওয়ামী লীগ অঞ্চলভিত্তিক দলীয় ক্যাডার বাহিনী দিয়ে নানা ‘ক্যান্টনমেন্ট’ গড়ে তুলেছিল। তাঁদের ধারণা ছিল, এই ‘ক্যান্টনমেন্টই’ তাঁদের রক্ষা করবে। কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দলীয় ক্যাডার বাহিনী দ্বারা গঠিত এই ক্যান্টনমেন্ট যেমন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে পারেনি, সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টও জনগণের মতের বাইরে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। তাই তারেক রহমানের উচিত হবে, কাজের মধ্য দিয়ে জনগণের ভালোবাসা অর্জন করা। এই জনগণই তাঁদের রক্ষা করবে, কোনো ক্যান্টনমেন্ট নয়।
২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ নির্বাসন জীবন শেষে তারেক রহমান দেশে আসছেন। বাংলাদেশের জন্য এটি অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক দিন। নিরাপত্তার ইস্যুটি না থাকলে আমি পরামর্শ দিতাম, পায়ে হেঁটে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়া; তাদের সুখ-দুঃখের কথা শোনা। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক ষড়যন্ত্রকারীর নিশানার মধ্যে আছেন তারেক রহমান। তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পারলে দীর্ঘদিন ধরে ঘাঁপটি মেরে থাকা অন্ধকারের শক্তি তার ডানা ছড়িয়ে দেবে। বাংলাদেশে যেটুকু আলো এখন পর্যন্ত অবশিষ্ট আছে, তা চিরতরে মুছে যাবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র একটি কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশকে সঠিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যেতে তারেক রহমানকে এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে। তিনি-ই এখন জাতির একমাত্র ভরসা।
এক. তারেক রহমান ২০০৭ সালে যখন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কারাগারে বন্দি, সে সময় তিনি পড়ার জন্য কিছু বই চেয়েছিলেন স্বজন-সুভানুধ্যায়ীদের কাছে। তার মধ্যে একটি বই ছিল নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’। মানে একটি রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালিত হবে, সেই ভাবনা ২০০৭ সালেই কারাগারে বসে ভাবছিলেন তারেক রহমান। এখন অনেকে বলবেন, ম্যাকিয়াভেলি তো একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেছেন, আধুনিক উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থায় তাঁর জায়গা কোথায়? আমি বলব, এই ভাবনা খণ্ডিত। ম্যাকিয়াভেলির সামনে ছিল মধ্য যুগের ইউরোপের সমাজ; সামন্তবাদী সেই সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি গণতন্ত্রের কথা বলেছেন, বলেছেন মানবতাবাদের কথা। পরবর্তীকালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাই ম্যাকিয়াভেলিকে বলেছেন, ‘ছদ্মবেশী গণতন্ত্রী’।
ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন ইটালির ফ্লোরেন্সের শাসকগোষ্ঠী মেডিসি পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল। বইটি তিনি উৎসর্গ করেন পিয়েরো ডি মেডিসির ছেলে লরেঞ্জোকে। ম্যাকিয়াভেলি যে গণতন্ত্রপন্থী, তার তাঁর উৎসর্গপত্রেই স্পষ্ট হয়ে যায়। রাজার উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘একজন শিল্পী নিচে দাঁড়িয়ে পাহাড়-উপত্যকা বা নৈসর্গিক দৃশ্য আঁকতে পারেন না। সেখানে শিল্পীকে পাহাড় কিংবা সমতলভূমি থেকে কিছুটা উঠতে হয়। রাষ্ট্রনায়কদের বিষয়টাও সেরকম। সঠিকভাবে রাজ্য শাসন করতে হলে রাষ্ট্রনায়কদের নেমে আসতে হবে জনগণ কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের কাছাকাছি। বুঝতে হবে জনগণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।’
‘দ্য প্রিন্স’ বইয়ে ম্যাকিয়াভেলি শাসককে আবেগি না হয়ে বাস্তববাদী হতে বলেছেন। এর জন্য প্রয়োজনে শাসককে সিংহের মতো শক্তিশালী ও শিয়ালের মতো ধূর্ত হওয়ার কৌশল নিতেও পরামর্শ দিয়েছেন। বাস্তবিক অর্থে ম্যাকিয়াভেলি এই কথা বলেছেন, রাষ্ট্রের স্থিতিতাবস্থা বজায় রাখার স্বার্থে, শাসককে কর্তৃত্ববাদী হতে নয়। পরবর্তীকালের অনেক দেশের কর্তৃত্বাদী শাসকরা ম্যাকিয়াভেলির এই খণ্ডিত বক্তব্যকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে নিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। অথচ ম্যাকিয়াভেলি স্পষ্টতই বলেছেন, শাসককে নির্দয় নয়, হতে হবে সদয়। শাসক নিজেকে জনগণের কাছে ভীতির পাত্র করে তুলবেন না। ভালোবাসা অর্জন করতে না পারলেও যেন ঘৃণার পাত্র না হন।
অনুমান করি, তারেক রহমান ম্যাকিয়াভেলির এই আদর্শ অনুসরণ করে জনগণকে ভালোবাসা দিয়ে, জনগণের ভালোবাসা অর্জন করে সামনের দিনে তাঁর রাষ্ট্র প্রকল্প দাঁড় করাবেন। সেটা যে তিনি পারবেন, বিগত কয়েক বছর থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত তাঁর নানা বক্তৃতা, আচরণে এর প্রমাণ রেখে চলেছেন। এই লেখার শিরোমনি করা হয়েছে ‘দ্য মডার্ন প্রিন্স’। তার অর্থ এই নয় যে এটি আধুনিক কোনো রাজপুত্রকে নিয়ে কোনো গল্প বা লেখা। সেই উদ্দেশ্যও এই অধমের নেই। শিরোনামটা ধার করতে হয়েছে আন্তোনিও গ্রামশির ‘দ্য মডার্ন প্রিন্স’ নামক একটি বিখ্যাত লেখা থেকে। গ্রামশি এটি ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির জেল খানায় বসে লিখেছিলেন। ‘প্রিজন নোটবুকস’ নামে যা পরবর্তীকালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
লেখাটিতে মূলত গ্রামশি একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। এখানে ‘মডার্ন প্রিন্স’ শব্দটি গ্রামশি একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংগঠন বা নেতৃত্বের ধারণা বোঝাতে ব্যবহার করেছেন, যা জনগণের কণ্ঠস্বর, ইচ্ছা এবং স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর মতে, এই ‘মডার্ন প্রিন্স’ একটি সমন্বিত রাজনৈতিক শক্তি, যা প্রান্তিক ও নিপীড়িত জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রচলিত শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এবং সমাজে গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।
সুতরাং এই লেখায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘আধুনিক রাজপুত্র’ বোঝানো হয়নি, বোঝানো হয়েছে তাঁর চিন্তা, রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংগঠনিক কর্মতৎপরতাকে। তাঁর এই দূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন দেখা গেছে দুই বছর আগেই, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে। ২০২৩ সালের জুনে রাষ্ট্র কাঠামোর ৩১ দফা রূপরেখার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান একজন ‘মডার্ন প্রিন্স’ হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছেন। ৩১ দফার প্রথম দফাতেই বলা হয়েছে— ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ জন্য অব্যাহত আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে।’
বিএনপি যে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই এর প্রমাণ রেখে আসছে দলটি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ধারণা করা হচ্ছিল, আওয়ামী লীগের বহুসংখ্যক নেতাকর্মী হত্যা-নির্যাতনের শিকার হবেন। কারণ বিগত পনের বছরের বেশি সময় ধরে বিএনপির কর্মীরা যে ধরনের নির্যাতন, মামলা, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসা জেগে উঠবে। ৫ আগস্টের পূর্বে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও গলা উঁচু করে বলতেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে গেলে তাদের দুই লাখ লোককে হত্যা করা হবে। কিন্তু দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দেশে বড় কোনো অঘটন ঘটেনি। এমনটা হয়েছে শুধুমাত্র দলের নেতাকর্মীদের প্রতি তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশনার কারণে।
৫ আগস্টেই তারেক রহমান দেশবাসীসহ নিজ দলের নেতাকর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, রাজনৈতিক কারণে বা ধর্মীয় কারণে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসাপরায়ণ যেন তারা না হন। সেদিনের তাঁর দুটি মন্তব্য ইতিহাসের পাতায় অমোচনীয় হয়ে থাকবে— এক. ‘বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ের আনন্দ মহিমান্বিত হয়।’ দুই. ‘নিজেদের মহত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করুন, আপনি আওয়ামী লীগ না, আপনি মানুষ।’
৫ আগস্ট পরবর্তী আরও অনেক ভাষণে তারেক রহমান বলেছেন, তার দল প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ যা করেছে, একই কাজ যদি এখন বিএনপির নেতাকর্মীরা করেন, তাহলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য কোথায়? নেতাকর্মীদের তিনি বারবার আওয়ামী লীগ (নিপীড়ক অর্থে) না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ফ্যাসিস্ট আমলের পনের বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, হেফাজতে মৃত্যু, মিথ্যা মামলা— সবক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও দলটির নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরিয়েছেন। তারেক রহমান নিজেও এক-এগারো সরকারের আমলে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আর তাঁর মা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার মিথ্যা মামলা, প্রহসনের বিচারে শুধু কারাগারে বন্দি-ই করে রাখেনি, চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। আজকে খালেদা জিয়া যে গুরুতর অসুস্থ; জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তার প্রধান কারণ হাসিনার আমলে তাঁকে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা।
নিজের, পরিবারের এবং দলের নেতাকর্মীদের এমন অত্যাচার-নির্যাতনের পরেও তারেক রহমান প্রতিহিংসা-জিঘাংসার রাজনীতির পরিবর্তে সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা এবং ভালোবাসাকে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ কারণে তাঁকে মূল্যও দিতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু স্যোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার তাঁর এই প্রিন্সিপাল বা আদর্শকে ভালোভাবে নেননি। এই লোকদের দ্বারা তারেক রহমান ও তাঁর দলকে প্রতিনিয়ত কথার আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর এসব ইনফ্লুয়েন্সার দ্বারা অশ্লীল একটি গালি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই সংস্কৃতি বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ভালোভাবে সংক্রমিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, মব উসকে দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরির অপচেষ্টা করে যাচ্ছেন বিদেশে বসে এসব ইনফ্লুয়েন্সার। তারেক রহমান অনেকটা রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে এসবের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছেন। এ কারণে তরুণ প্রজন্মের ছোট একটি অংশ তাঁর ওপর নাখোশ।
ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার আরেকটি বড় উদাহরণ— তারেক রহমানকে নিয়ে এক কার্টুনিস্টের ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন। স্যোশাল মিডিয়ায় প্রচার হওয়া সেই ব্যঙ্গচিত্র তারেক রহমান নিজের ফেসবুক পেইজে শেয়ার দিয়ে ওই কার্টুনিস্টকে এমন আরও আরও ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন করতে উৎসাহিত করেছেন। এই যে উদারতা, সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ— বিগত সময়ে কোনো রাজনীতিবিদ দেখাতে পেরেছিলেন বলে আমাদের নজরে পড়ে না। তারেক রহমানের এই রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক চর্চা অন্য নেতারা ধারণ করতে পারলে সত্যিই একটি আদর্শ রাষ্ট্রের দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দুঃজনক হলো কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে এই মূল্যবোধের প্রবল ঘাটতি সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
তারেক রহমানের আরেকটি ‘মডার্ন প্রিন্স’ নীতি হলো রাজনৈতিক মতভিন্নতা যাই হোক, দলগুলোর মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য বজায় রাখা। সেটা না থাকলে জুলাই অভ্যুত্থানে এত এত তরুণ-যুবা-শিশুর রক্ত সম্পূর্ণ বৃথা যাবে। দলগুলোকে উদ্দেশ করে তিনি বারবার বলেছেন, আমাদের এই অনৈক্যের সুবিধা নিয়ে পতিত ফ্যাসিস্ট আবার ফিরে এলে আমি, আপনি কেউ বাঁচব না। তাঁর এই বক্তব্যে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাউন্ডিং ফাদারদের একজন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করার সময় আমেরিকান উপনিবেশগুলোর সাফল্যের জন্য ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন, না হলে তারা সবাই ধ্বংসের মুখোমুখি হবেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল-- ‘আমাদের সকলকে অবশ্যই এক সঙ্গে ঝুলতে (ফাঁসিতে) হবে, অথবা নিশ্চিতভাবেই আমরা সবাই আলাদাভাবে ঝুলব।’ তাঁর এই উক্তি সামাজিক সংহতির মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে বেঁচে থাকার একটি শক্তিশালী বার্তা। এর ব্যত্যয় হলে নিশ্চিত পরাজয়। এই একই বার্তা তারেক রহমানেরও।
দুই. তারেক রহমান একটা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রপ্রকল্প আমাদের সামনে হাজির করেছেন। তাঁর প্রতি শুভ কামনা। আমাদের বিশ্বাস তিনি সেটা পারবেন। কিন্তু সামনের দিকে আগাতে চাইলে এক পা পেছনে রাখতে হয়। তারেক রহমানের দল বিএনপি অতীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে তাদের অনেক সফলতা যেমন ছিল, ব্যর্থতার পাল্লাও কম ভারি নয়। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের পর পাঁচটি বছর বিএনপি সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করেছে, এটা বিশ্বাস করলে সত্যের অপলাপ হবে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে দীর্ঘ পনের বছর জাতি যে যাতাকলে পিষ্ট হয়েছে, তার জন্য বিএনপির সেই পাঁচ বছরের ব্যর্থতার দায় কম নয়। বিশেষত দলটি ক্ষমতা গ্রহণের পরই সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটা। এই দলীয় সন্ত্রাস দমাতে ‘অপারেশ ক্লিন হার্ট’ এর মতো সেনা অভিযান পর্যন্ত করতে হয়েছিল। সে সময় অনেক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে। তাতেও যখন খুব বেশি ফল দিল না, এরপর বিএনপি গঠন করল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নামে একটি আধা সামরিক বাহিনী। পরবর্তী সময়ে এই র্যাব-ই বিএনপির জন্য ফ্রাংকেনস্টাইনের দানব রূপে হাজির হলো। গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমাতে এই র্যাবের হাতেই বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী গুম-খুন, ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহিভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো। র্যাব হয়ে পড়ল একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী। এছাড়া দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের উত্থান, জায়গায় জায়গায় বোমা হামলা রাষ্ট্রকে অকার্যকর অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল সে সময়। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা। জঙ্গিরা এই হামলা চালালেও তার ব্যর্থতার দায় তখনকার প্রশাসন এড়াতে পারে না। তারেক রহমানের উচিত হবে এসব ব্যর্থতাকে পাঠ্যপুস্তকের মতো পাঠ করে আগামী দিনের রাষ্ট্র প্রকল্প সাজানো। এটা তারেক রহমানের জন্য বড় পরীক্ষা।
তিন. বিএনপি জনমানুষের দল, কোনো ক্যাডারভিত্তিক দল নয়। একমাত্র জনগণই বিএনপিকে রক্ষা করবে। ম্যাকিয়াভেলি তাঁর ‘প্রিন্স’ গ্রন্থে বলেছেন, জনগণ না চাইলে একজন শাসককে কোনো ক্যান্টনমেন্ট রক্ষা করতে পারবে না। বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে আওয়ামী লীগ অঞ্চলভিত্তিক দলীয় ক্যাডার বাহিনী দিয়ে নানা ‘ক্যান্টনমেন্ট’ গড়ে তুলেছিল। তাঁদের ধারণা ছিল, এই ‘ক্যান্টনমেন্টই’ তাঁদের রক্ষা করবে। কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দলীয় ক্যাডার বাহিনী দ্বারা গঠিত এই ক্যান্টনমেন্ট যেমন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে পারেনি, সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টও জনগণের মতের বাইরে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। তাই তারেক রহমানের উচিত হবে, কাজের মধ্য দিয়ে জনগণের ভালোবাসা অর্জন করা। এই জনগণই তাঁদের রক্ষা করবে, কোনো ক্যান্টনমেন্ট নয়।
২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ নির্বাসন জীবন শেষে তারেক রহমান দেশে আসছেন। বাংলাদেশের জন্য এটি অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক দিন। নিরাপত্তার ইস্যুটি না থাকলে আমি পরামর্শ দিতাম, পায়ে হেঁটে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়া; তাদের সুখ-দুঃখের কথা শোনা। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক ষড়যন্ত্রকারীর নিশানার মধ্যে আছেন তারেক রহমান। তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পারলে দীর্ঘদিন ধরে ঘাঁপটি মেরে থাকা অন্ধকারের শক্তি তার ডানা ছড়িয়ে দেবে। বাংলাদেশে যেটুকু আলো এখন পর্যন্ত অবশিষ্ট আছে, তা চিরতরে মুছে যাবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র একটি কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশকে সঠিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যেতে তারেক রহমানকে এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে। তিনি-ই এখন জাতির একমাত্র ভরসা।
লোড হচ্ছে...