মতামত
লাতিনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ কৌশল
NewsView
.jpeg)
ড্যানিয়েল মোরালেস রুভালকাবা
অনুবাদক: রাকিবুল রাকিব
সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য এনেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং চীন-সেলাক (China-CELAC) ফোরামের শক্তিশালীকরণ এই অঞ্চলে একটি বহুত্ববাদী পরিবেশ তৈরি করছে। এই পরিবর্তন এখন নিরাপত্তা খাতেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, যা এতদিন মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে ওয়াশিংটনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ উদ্যোগ চালু করে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ লাতিন আমেরিকার কয়েকটি সরকারকে জড়ো করা হয়। লক্ষ্য হলো মাদক কার্টেল, গ্যাং সহিংসতা ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমনে সমন্বিতভাবে কাজ করা। এটি একদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধীয় নিরাপত্তা কাঠামো সাজানোর বার্তা।
উদ্যোগটি দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে, তবে এ ধরনের উদ্যোগ নতুন নয়। বহু দশক ধরেই মাদকপাচার ও সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আন্তঃআমেরিকান কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত প্রথম আমেরিকান শীর্ষ সম্মেলনের (১৯৯৪) পর থেকে মাদকপাচার ও সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা গোলার্ধীয় সহযোগিতার কেন্দ্রে চলে আসে। এর ফলে দেশগুলোর মধ্যে বহুপাক্ষিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং বিচারিক সমন্বয় বাড়তে থাকে। সান্তিয়াগোতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনের (১৯৯৮) পর এই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়। তখন মাদক কার্টেল দমনের অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য একটি বহুপাক্ষিক কাঠামো চালু করা হয়। মূল ধারণাটি ছিল স্পষ্ট—অপরাধী চক্র যখন আঞ্চলিকভাবে কাজ করে, তখন প্রতিরোধও হতে হবে আঞ্চলিকভাবে।
একুশ শতকের শুরুতে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত রূপ পায়। কুইবেক শীর্ষ সম্মেলনে (২০০১) উদীয়মান হুমকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মেক্সিকোর মন্টেরেতে বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে (২০০৪) সন্ত্রাসবাদ ও সংগঠিত অপরাধ দমনে বহুমাত্রিক নিরাপত্তার ধারণা সামনে আসে। এরপর পোর্ট অব স্পেনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলনে (২০০৯) সহযোগিতা আরও জোরদার করা হয়।
অন্তর্ভুক্তিমূলকতা ছিল সেসব ধারাবাহিক উদ্যোগগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আর শীর্ষ সম্মেলনগুলোকে এমন একটি মঞ্চ হিসেবে ভাবা হয়েছিল, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও গোলার্ধের সব দেশ একসঙ্গে বসে যেকোনো নীতি নিয়ে আলোচনা ও সমন্বয় করতে পারত।
তবে সাম্প্রতিক ডোরাল ঘোষণা (২০২৬) একটি নতুন পরিবর্তনের আভাস দেয়। এখানে সব দেশকে জড়ো করা হচ্ছে না; বরং নির্দিষ্ট কিছু দেশকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ফলে সহযোগিতা বাছাইভিত্তিক। এতে কার্যকারিতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সর্বজনীন অন্তর্ভুক্তির ধারণা সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাছাই করা দেশগুলোর জোট
বহু বছর ধরে গণ্ডিবদ্ধ সহযোগিতার ধারা গড়ে উঠেছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন-লাতিন আমেরিকা সম্পর্ক মূলত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত ছিল। সেই দেশগুলোর সঙ্গে এরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যারা ওয়াশিংটনের নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে রাজি ছিল। এমন একটি উদাহরণ হলো ‘গ্রোথ ইন দ্য আমেরিকাস’ (২০১৯) উদ্যোগ। এ মঞ্চে মার্কিন ঘেঁষা সরকারগুলো অংশগ্রহণ করত। মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।
বাইডেন প্রশাসন ২০২২ সালের লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ‘সামিট অফ দ্য আমেরিকাস’-এ কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং নিকারাগুয়াকে আমন্ত্রণ না জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এতে স্পষ্ট হয় গোলার্ধীয় উদ্যোগের গণ্ডিবদ্ধ প্রকৃতি।
বর্তমানে ‘শিল্ড অব দ্যা আমেরিকাস’ উদ্যোগটি নিরাপত্তা খাতে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রায়োগিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। ঘোষণাপত্রে আঞ্চলিক সমন্বয়ের জন্য কোনো স্থায়ী কাঠামো, তহবিল বা সুস্পষ্ট কর্মপদ্ধতি নেই। ফলে প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের স্বাক্ষরিত এই উদ্যোগটি মোটাদাগে একটি সংকীর্ণ প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করে।
বিস্তৃত পরিভাষার মাধ্যমে কিছু রাজনৈতিক নমনীয়তা দেওয়া হলেও নির্দিষ্ট নীতির প্রবণতা উদ্যোগটির কার্যকারিতা হ্রাস করে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের জোট প্রায়ই দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও অনিশ্চিত ফলাফলের কারণে অতীতের মতো ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। সর্ব-আমেরিকান সহযোগিতার আদর্শ থেকে ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার নীতি। ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও যা প্রতিফলিত হয়েছে।
ডোরালে দেওয়া বিবৃতিতে মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ উল্লেখ করেন, বহিরাগত শক্তিগুলো এই অঞ্চলকে নতুনভাবে গড়ে তুলার চেষ্টা করছে—‘এক ধরনের নতুন বৈশ্বিক দক্ষিণ তৈরির মাধ্যমে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিকে বাইরে রাখা হবে, কিন্তু অ-পশ্চিমা শক্তি ও প্রতিপক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
বৈশ্বিক দক্ষিণে চীনের ক্রমবর্ধমান সক্রিয় উপস্থিতি গোটা গোলার্ধের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বহিঃআঞ্চলিক শক্তির প্রভাব মোকাবিলায় ‘বৃহত্তর উত্তর আমেরিকা’ ধারণার মাধ্যমে নিরাপত্তা বলয় সুসংহত করার চিন্তা উঠে এসেছে—এটাই পেন্টাগনের মূল দৃষ্টিভঙ্গি।
চীনের নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রস্তাব
বিগত দুই দশকে শুধু বাণিজ্য খাতই নয়; অন্যান্য আর্থিক, প্রযুক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং এমনকি অভিবাসন খাতেও বেইজিং এবং লাতিন আমেরিকার সম্পৃক্ততা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সম্পৃক্ততা এখন নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রসারিত হচ্ছে। ২০২২ সালের গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই), ২০২৫ সালের চতুর্থ চায়না-সেলাক ফোরাম (সিসিএফ) এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান বিষয়ক চীনের নীতিপত্র (তৃতীয় শ্বেতপত্র, ২০২৫ সালের শেষের দিকে) একটি ধারাবাহিক অগ্রগতি তুলে ধরে।
জিএসআই মতাদর্শগত কাঠামো হিসেবে কাজ করে। যা সার্বভৌমত্ব, হস্তক্ষেপ পরিহার এবং সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় হুমকি মোকাবিলার ভিত্তি। যদিও মাদক পাচারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবুও এতে বৃহত্তর আন্তঃরাষ্ট্রীয় কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করে চতুর্থ সিসিএফ বৈঠকে চীন এবং লাতিন আমেরিকার মধ্যে পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অধীনে “মাদকের উৎপাদন, ব্যবহার এবং পাচার মোকাবিলায় সহযোগিতার পদ্ধতি অন্বেষণ” করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় শ্বেতপত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে শুধু “অনুসন্ধান” নয়, বরং “আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের মতো অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকিগুলো যৌথভাবে মোকাবিলা” এবং “মাদকবিরোধী সহযোগিতা গভীরতর করা ও যৌথভাবে মাদক চোরাচালান মোকাবিলা” করার পরামর্শ দিয়েছে।
তবে এসব প্রস্তাবের কিছু সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে, এবং আন্তঃ-আমেরিকান ব্যবস্থার সমতুল্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। গোলার্ধব্যাপী সুসংহত কাঠামো, অভিজ্ঞতা এবং পরিচালন নেটওয়ার্কের অভাবও লক্ষ্য করা যায়। তবুও সম্পর্কের দ্রুত অগ্রগতি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে বেইজিং লাতিন আমেরিকার নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ডোমিনিকায় ‘সামিট অব দ্য আমেরিকাস’ বাতিল হওয়ায় ডোরাল বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি ওয়াশিংটনের উদ্যোগে লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রথম বহুপাক্ষিক বৈঠক।
অপূর্ণ অতীত, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আগেকার ব্যর্থ PROSUR উদ্যোগটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও তাৎক্ষণিক লক্ষ্য মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র ঘেঁষা সরকারগুলোকে জড়ো করেছিল। মনে হয়, সেই ধারাকে ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ গোলার্ধীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত করছে। যা টেকসই আঞ্চলিক কাঠামোর বদলে একটি আদর্শভিত্তিক মঞ্চের আভাস দেয়।
ট্রাম্পের ঘোষণায় ‘জরুরি হুমকিগুলো নির্মূলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে’ একটি ‘কাউন্টার কার্টেল কোয়ালিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে এতে কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো, নীতি বা সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নেই। যা লাতিন আমেরিকার জটিল প্রেক্ষাপটে উদ্যোগটিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উদ্যোগটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ থাকার চাপ তৈরি করছে। এমনকি চীনের সঙ্গে সহযোগিতা সীমিত করার নির্দেশও দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের আচরণ উদ্যোগের বাইরে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে বিভেদকে ত্বরান্বিত করবে।
লেখক পরিচিতি
ড্যানিয়েল মোরালেস রুভালকাবা একজন লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ। তিনি চীনের সান ইয়াৎ সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জাতীয় শক্তি ও বিশ্বায়নের গতিপ্রকৃতির বিশ্লেষণ।
অনুবাদক: রাকিবুল রাকিব
সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য এনেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং চীন-সেলাক (China-CELAC) ফোরামের শক্তিশালীকরণ এই অঞ্চলে একটি বহুত্ববাদী পরিবেশ তৈরি করছে। এই পরিবর্তন এখন নিরাপত্তা খাতেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, যা এতদিন মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে ওয়াশিংটনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ উদ্যোগ চালু করে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ লাতিন আমেরিকার কয়েকটি সরকারকে জড়ো করা হয়। লক্ষ্য হলো মাদক কার্টেল, গ্যাং সহিংসতা ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমনে সমন্বিতভাবে কাজ করা। এটি একদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধীয় নিরাপত্তা কাঠামো সাজানোর বার্তা।
উদ্যোগটি দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে, তবে এ ধরনের উদ্যোগ নতুন নয়। বহু দশক ধরেই মাদকপাচার ও সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আন্তঃআমেরিকান কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত প্রথম আমেরিকান শীর্ষ সম্মেলনের (১৯৯৪) পর থেকে মাদকপাচার ও সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা গোলার্ধীয় সহযোগিতার কেন্দ্রে চলে আসে। এর ফলে দেশগুলোর মধ্যে বহুপাক্ষিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং বিচারিক সমন্বয় বাড়তে থাকে। সান্তিয়াগোতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনের (১৯৯৮) পর এই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়। তখন মাদক কার্টেল দমনের অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য একটি বহুপাক্ষিক কাঠামো চালু করা হয়। মূল ধারণাটি ছিল স্পষ্ট—অপরাধী চক্র যখন আঞ্চলিকভাবে কাজ করে, তখন প্রতিরোধও হতে হবে আঞ্চলিকভাবে।
একুশ শতকের শুরুতে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত রূপ পায়। কুইবেক শীর্ষ সম্মেলনে (২০০১) উদীয়মান হুমকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মেক্সিকোর মন্টেরেতে বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে (২০০৪) সন্ত্রাসবাদ ও সংগঠিত অপরাধ দমনে বহুমাত্রিক নিরাপত্তার ধারণা সামনে আসে। এরপর পোর্ট অব স্পেনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলনে (২০০৯) সহযোগিতা আরও জোরদার করা হয়।
অন্তর্ভুক্তিমূলকতা ছিল সেসব ধারাবাহিক উদ্যোগগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আর শীর্ষ সম্মেলনগুলোকে এমন একটি মঞ্চ হিসেবে ভাবা হয়েছিল, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও গোলার্ধের সব দেশ একসঙ্গে বসে যেকোনো নীতি নিয়ে আলোচনা ও সমন্বয় করতে পারত।
তবে সাম্প্রতিক ডোরাল ঘোষণা (২০২৬) একটি নতুন পরিবর্তনের আভাস দেয়। এখানে সব দেশকে জড়ো করা হচ্ছে না; বরং নির্দিষ্ট কিছু দেশকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ফলে সহযোগিতা বাছাইভিত্তিক। এতে কার্যকারিতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সর্বজনীন অন্তর্ভুক্তির ধারণা সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাছাই করা দেশগুলোর জোট
বহু বছর ধরে গণ্ডিবদ্ধ সহযোগিতার ধারা গড়ে উঠেছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন-লাতিন আমেরিকা সম্পর্ক মূলত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত ছিল। সেই দেশগুলোর সঙ্গে এরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যারা ওয়াশিংটনের নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে রাজি ছিল। এমন একটি উদাহরণ হলো ‘গ্রোথ ইন দ্য আমেরিকাস’ (২০১৯) উদ্যোগ। এ মঞ্চে মার্কিন ঘেঁষা সরকারগুলো অংশগ্রহণ করত। মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।
বাইডেন প্রশাসন ২০২২ সালের লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ‘সামিট অফ দ্য আমেরিকাস’-এ কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং নিকারাগুয়াকে আমন্ত্রণ না জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এতে স্পষ্ট হয় গোলার্ধীয় উদ্যোগের গণ্ডিবদ্ধ প্রকৃতি।
বর্তমানে ‘শিল্ড অব দ্যা আমেরিকাস’ উদ্যোগটি নিরাপত্তা খাতে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রায়োগিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। ঘোষণাপত্রে আঞ্চলিক সমন্বয়ের জন্য কোনো স্থায়ী কাঠামো, তহবিল বা সুস্পষ্ট কর্মপদ্ধতি নেই। ফলে প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের স্বাক্ষরিত এই উদ্যোগটি মোটাদাগে একটি সংকীর্ণ প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করে।
বিস্তৃত পরিভাষার মাধ্যমে কিছু রাজনৈতিক নমনীয়তা দেওয়া হলেও নির্দিষ্ট নীতির প্রবণতা উদ্যোগটির কার্যকারিতা হ্রাস করে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের জোট প্রায়ই দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও অনিশ্চিত ফলাফলের কারণে অতীতের মতো ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। সর্ব-আমেরিকান সহযোগিতার আদর্শ থেকে ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার নীতি। ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও যা প্রতিফলিত হয়েছে।
ডোরালে দেওয়া বিবৃতিতে মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ উল্লেখ করেন, বহিরাগত শক্তিগুলো এই অঞ্চলকে নতুনভাবে গড়ে তুলার চেষ্টা করছে—‘এক ধরনের নতুন বৈশ্বিক দক্ষিণ তৈরির মাধ্যমে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিকে বাইরে রাখা হবে, কিন্তু অ-পশ্চিমা শক্তি ও প্রতিপক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
বৈশ্বিক দক্ষিণে চীনের ক্রমবর্ধমান সক্রিয় উপস্থিতি গোটা গোলার্ধের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বহিঃআঞ্চলিক শক্তির প্রভাব মোকাবিলায় ‘বৃহত্তর উত্তর আমেরিকা’ ধারণার মাধ্যমে নিরাপত্তা বলয় সুসংহত করার চিন্তা উঠে এসেছে—এটাই পেন্টাগনের মূল দৃষ্টিভঙ্গি।
চীনের নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রস্তাব
বিগত দুই দশকে শুধু বাণিজ্য খাতই নয়; অন্যান্য আর্থিক, প্রযুক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং এমনকি অভিবাসন খাতেও বেইজিং এবং লাতিন আমেরিকার সম্পৃক্ততা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সম্পৃক্ততা এখন নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রসারিত হচ্ছে। ২০২২ সালের গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই), ২০২৫ সালের চতুর্থ চায়না-সেলাক ফোরাম (সিসিএফ) এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান বিষয়ক চীনের নীতিপত্র (তৃতীয় শ্বেতপত্র, ২০২৫ সালের শেষের দিকে) একটি ধারাবাহিক অগ্রগতি তুলে ধরে।
জিএসআই মতাদর্শগত কাঠামো হিসেবে কাজ করে। যা সার্বভৌমত্ব, হস্তক্ষেপ পরিহার এবং সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় হুমকি মোকাবিলার ভিত্তি। যদিও মাদক পাচারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবুও এতে বৃহত্তর আন্তঃরাষ্ট্রীয় কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করে চতুর্থ সিসিএফ বৈঠকে চীন এবং লাতিন আমেরিকার মধ্যে পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অধীনে “মাদকের উৎপাদন, ব্যবহার এবং পাচার মোকাবিলায় সহযোগিতার পদ্ধতি অন্বেষণ” করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় শ্বেতপত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে শুধু “অনুসন্ধান” নয়, বরং “আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের মতো অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকিগুলো যৌথভাবে মোকাবিলা” এবং “মাদকবিরোধী সহযোগিতা গভীরতর করা ও যৌথভাবে মাদক চোরাচালান মোকাবিলা” করার পরামর্শ দিয়েছে।
তবে এসব প্রস্তাবের কিছু সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে, এবং আন্তঃ-আমেরিকান ব্যবস্থার সমতুল্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। গোলার্ধব্যাপী সুসংহত কাঠামো, অভিজ্ঞতা এবং পরিচালন নেটওয়ার্কের অভাবও লক্ষ্য করা যায়। তবুও সম্পর্কের দ্রুত অগ্রগতি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে বেইজিং লাতিন আমেরিকার নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ডোমিনিকায় ‘সামিট অব দ্য আমেরিকাস’ বাতিল হওয়ায় ডোরাল বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি ওয়াশিংটনের উদ্যোগে লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রথম বহুপাক্ষিক বৈঠক।
অপূর্ণ অতীত, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আগেকার ব্যর্থ PROSUR উদ্যোগটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও তাৎক্ষণিক লক্ষ্য মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র ঘেঁষা সরকারগুলোকে জড়ো করেছিল। মনে হয়, সেই ধারাকে ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ গোলার্ধীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত করছে। যা টেকসই আঞ্চলিক কাঠামোর বদলে একটি আদর্শভিত্তিক মঞ্চের আভাস দেয়।
ট্রাম্পের ঘোষণায় ‘জরুরি হুমকিগুলো নির্মূলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে’ একটি ‘কাউন্টার কার্টেল কোয়ালিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে এতে কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো, নীতি বা সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নেই। যা লাতিন আমেরিকার জটিল প্রেক্ষাপটে উদ্যোগটিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উদ্যোগটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ থাকার চাপ তৈরি করছে। এমনকি চীনের সঙ্গে সহযোগিতা সীমিত করার নির্দেশও দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের আচরণ উদ্যোগের বাইরে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে বিভেদকে ত্বরান্বিত করবে।
লেখক পরিচিতি
ড্যানিয়েল মোরালেস রুভালকাবা একজন লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ। তিনি চীনের সান ইয়াৎ সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জাতীয় শক্তি ও বিশ্বায়নের গতিপ্রকৃতির বিশ্লেষণ।
লোড হচ্ছে...