বিশেষ
লক্ষ্যার জলে আগুন জ্বলে
NewsView

রফিউর রাব্বি
হিন্দু পুরাণে কথিত আছে, মহামুনি জমদগ্নির আদেশে পুত্র পরশুরাম মাতৃহত্যা করে মহাপাপ করেছিলেন। যে কুঠার দ্বারা তিনি মাতা রেণুকাকে বধ করেছিলেন সেই কুঠার তাঁর হাতে আটকে গিয়েছিলো। প্রাণপণ চেষ্টা করেও সে কুঠার তাঁর হাত থেকে ছাড়ানো যায়নি। অবশেষে তিনি গভীর দুঃখ ও অনুশোচনায় নিমজ্জিত হলেন এবং ধ্যান ও তপস্যায় দিন কাটাবার জন্যে পাহাড়-পর্বত বন-জঙ্গল ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি ব্রহ্মপুত্রের মাহাত্ম্যের কথা শুনতে পেয়ে আশায় বুক বেঁধে তার খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। ব্রহ্মপুত্র তখন একটি হৃদরূপে হিমালয় পর্বতে আত্মগোপন করেছিল। পরশুরাম বহু বছর ধরে হিমালয়ের জনহীন দুর্গম পথে নিষ্ফলা ঘুরতে থাকায় তাঁর চোখের সামনে থেকে এক অশুভ কুজ্বটিকা অপসৃত হল। দেখতে পেলেন নিম্নদেশে প্রসারিত এক হ্রদ। তিনি আনন্দে অধীর। দু’হাত তুলে তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন। ‘হে হ্রদরূপী দেবতা, তোমার পবিত্র জলে মরজগতের কোন জীবের পদার্পণ হয়নি। তোমার সকল অলৌকিক শক্তি মিলিত হয়ে আমার সকল পাপ ধৌত করে দিক এবং আমার প্রায়শ্চিত্তের অবসান হোক’- এই বলে তিনি ব্রহ্মপুত্রের জলে ঝাঁপ দিলেন। তিনি এবার দিব্য চক্ষু ফিরে পেলেন- তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর প্রায়শ্চিত্ত শেষ হয়েছে। মহাগুণসম্পন্ন সর্বপাপহরা এই পবিত্র জল মর্ত্যরে মানুষের নাগালে পৌঁছে দেবার মানসে পরশুরাম তাঁর কুঠার লাঙ্গলাবদ্ধ করলেন এবং পর্বতের মধ্য দিয়ে চালিত করলেন। যাতে সেই লাঙ্গলের ফলকে তৈরি পথ ধরে ব্রহ্মপুত্র সমভূমিতে প্রবাহিত হতে পারে। এইভাবে বহুদিন পর নারায়ণগঞ্জের বর্তমান লাঙ্গলবন্দে এসে লাঙ্গলটি আটকে গেল। পরশুরাম বুঝতে পারলেন তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। অতঃপর তিনি এই নদের মাহাত্ম্য প্রচারে ও তীর্থ যাত্রায় বের হলেন। কিন্তু যেখানে ব্রহ্মপুত্র থেমে গেলো, তার কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল যৌবনগর্বিতা চঞ্চলা অনিন্দ্য সুন্দরী নদী শীতলক্ষ্যা। বিশাল শক্তিশালী ব্রহ্মপুত্রের কাছে শীতলক্ষ্যার রূপ-যৌবনের কথা পৌঁছে গেল। ব্রহ্মপুত্র সুন্দরী শীতলক্ষ্যাকে দেখার জন্যে স্রোতের প্রচণ্ড আঘাতে দুকূল ভেঙ্গে ধাবিত হন সুন্দরী শীতলক্ষ্যার দিকে। বিশাল বপু ও প্রবল শক্তিশালী ব্রহ্মপুত্রকে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে শীতলক্ষ্যা তার সমস্ত রূপ লুকিয়ে ফেলে এক বৃদ্ধার রূপ ধারণ করে নিজেকে বুড়িগঙ্গা রূপে উপস্থাপিত করেন। ব্রহ্মপুত্র তার অবস্থা দেখে আশাহত হয়ে পড়ল এবং চিৎকার করে উঠেন- ‘হে বৃদ্ধা নারী, কোথায় সেই উদ্ভিন্ন-যৌবনা সুন্দরী শীতলক্ষ্যা?’ অবগুণ্ঠিতা লক্ষ্যা মৃদুভাবে জবাব দেন, ‘আমিই সেই লক্ষ্যা।’ ব্রহ্মপুত্র দ্রুত ধাবিত হয়ে তার অবগুণ্ঠন ছিঁড়ে ফেলেন। ব্রহ্মপুত্র সুন্দরী লক্ষ্যাকে দেখে মুগ্ধ হন। ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে যায়। পৌরাণিক এ কাহিনী ধরেই মহাগুণসম্পন্ন এ পবিত্র জল দ্বারা সর্বপাপ থেকে মুক্তির জন্যে আজো সহস্র হিন্দু নর-নারী লাঙ্গলবন্দ স্নানে মিলিত হন। যৌবনগর্বিতা চঞ্চলা অনিন্দ্য সুন্দরী নদী শীতলক্ষ্যা বিধৌত নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, জীবন চর্চা ও ধারা সবকিছুতেই এ শীতলক্ষ্যার বলিষ্ঠ প্রভাব। কিছুকাল আগেও শীতলক্ষ্যার উন্মত্ততা কমানোর জন্যে লোকে লবণ চিনি দান করেছেন নদীর জলে। খোয়াজ খিজিরের দোহাই দিয়ে মানত করেছেন ভেলা ভসিয়ে। এইসব ভেলায় দিয়েছেন বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য, পয়সা-কড়ি ও চেরাগ-বাতি। আবার এর বুকেই মানুষ তার তেজারতির নৌকা ভাসিয়েছেন। মসলিন, পাট-পাটজাতদ্রব্য, সুতা ও সুতিবস্ত্র, হোসিয়ারী এবং নারায়ণগঞ্জের যে সকল পণ্য এক সময় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে ব্যাপক সমাদৃত ছিল সে সকলই শীতলক্ষ্যাধৌত। প্রায় তিন হাজার বছর আগে এখানে বাণিজ্যবন্দর গড়ে উঠেছিল এবং তিন হাজার বছর আগে এখানকার মসলিনের খ্যাতি বিশ্বে ছড়িয়ে পরেছিল। রামায়ণে অবতারণ রামচন্দ্রের বিমাতা কৈকেয়ীর পরিচ্ছদের বর্ণনায় বাংলার মসলিনের উল্লেখ পাই। রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁয়ের মসলিন জাপান, আরব ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক বাজার তৈরি করেছিল। বিশ গজ মসলিন কাপড় একটি ম্যাচের বাক্সের পরিমাণ ছোট বাক্সে ধারণ করা যেত। এর বয়ন কৌশল ইউরোপ ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছিল বিস্ময়কর বিষয়। তিন হাজার বছর পূর্বে পিরামিডের মমি মসলিনে আচ্ছাদনের প্রমাণ পাওয়া যায়। রোমান রাজপোশাকে নারায়ণগঞ্জের মসলিনের বিশেষ কদর ছিল। অতি প্রাচীনকাল থেকেই সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে তথা এ বঙ্গদেশে শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্ন আবিষ্কারের ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বেও নারায়ণগঞ্জে জনপদ ছিল। উপমহাদেশে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী শিক্ষায়তনের সর্বপ্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল সোনারগাঁয়ে। শেখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা সোনারগাঁয়ে ত্রয়োদশ শতকের শেষদিকে এ উচ্চতর ইসলামিক শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা করেন। তখন এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণে সমবেত হতেন। পৌষ পার্বণে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে সম্মিলিতভাবেই এখানে হিন্দু-মুসলমান নিরলস সমাজ গড়ে তুলেছে। এখানে আবির্ভাব ঘটেছে বহু সুফি-সাধকের। ইব্রাহিম দানিশমন্দ, শেখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা, শরফুদ্দিন ইয়াহিয়া মানেরী, শেখ আলাউদ্দিন আলাউল হক, হাজী বাবা সালেহ, শাহলঙ্গর, পাঁচপীর, আকবর শাহ্, রূপচান শাহ্, আব্দুর রাজ্জাক শাহ্, সিরাজ শাহ, যোগীতাপস লোকনাথ ব্রহ্মচারী, বেণী মাধব, দিগি¦জয় সাধু, ললিত সাধু, সাধু নাগমহাশয় প্রভৃতি। এঁদের অনেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে বসতী গড়েছেন। ইমাম হুসাইন (আ:) ও বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (র:) এর বংশধর ইব্রাহিম দানিশমন্দ পারস্য থেকে আসেন, শেখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা আসেন এশিয়া মাইনরের বোখারা থেকে, ইয়েমেন থেকে আসেন হাজী বাবা সালেহ। শ্রীচৈতন্যের ভক্তি বিপ্লব আর ইসলামী সুফি প্রভাব এ দুইয়ে মিলে গড়ে এখানে উঠেছে মানস সংগঠন। মহররম, ঈদ, পূজা-পার্বণ, বিভিন্ন ফসলি উৎসবে- সবকিছুতেই এর প্রভাব। এসব উৎসব ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মেলা জমে উঠত, যার রূপটি ছিল সর্বজনীন। ড. দীনেশ চন্দ্র সেন ‘বৃহৎ বঙ্গ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘অতি প্রাচীন খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর প্রায় সমস্ত গহনাই এখনো বঙ্গের পল্লীর মহিলারা পরে থাকেন। মুসলমান মেয়েদের মধ্যে সেই প্রাচীন গহনার প্রচলন খুব বেশি। তাঁহারা প্রাচীন গহনা, বেশভূষা এখনো পর্যন্ত বজায় রাখিয়াছে। প্রাচীন ব্রহ্মাদেবের গলায় যে হার দেখা যায় উহার নাম হাঁশুলী, উহা বঙ্গের মুসলমান পাড়ায়ই সর্বত্র দৃষ্ট হয়। গৌরির কানর চেড়ি ও পূর্ববঙ্গের মুসলমান মেয়েদের কাঁকন এখনো পল্লীতে পাওয়া যায়।’ এখানে সংস্কৃতিকে ধর্মীয় গোঁড়ামীর চেয়ে বৃহৎ মানবিক মূল্যবোধই বেশি প্রভাবিত করেছে। এখনো নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন মেলার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। এ মেলার মধ্যে বারোই রবিউল আউয়ালে কদমরসূলের মেলা, লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ঊনিশে জৈষ্ঠ্যের মেলা, মণ্ডলপাড়ার মহররমের মেলা, দেওভোগ আখড়াসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলা, লাঙ্গলবন্দের স্নান উপলক্ষ্যে মেলা উল্লেখযোগ্য।
বৃটিশরা ভারতবর্ষ দখল করে নিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রোষানলে পড়ে মসলিন শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। মসলিনের পরে নারায়ণগঞ্জে লবণ প্রধান শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠে। মগ ও আরাকানিরা এখানে লবণ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৭৯১ সালে ইংরেজরা ‘বোর্ড অব ট্রেড’ গঠন করে পাটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাজ্যে গবেষণা শুরু করে। ১৮৩২ সালে যুক্তরাজ্যের ডান্ডি বেলফুর ও মেলড্রাম কোম্পানি পাট থেকে সুতা তৈরি করতে সক্ষম হলে শুরু হয় ডান্ডি শহরে পাটশিল্প গড়ে তোলার প্রতিযোগিতা। পরে ঊনিশ শতকের প্রায় মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম ও জাপানে পাট শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। এরও পরে ইতালি, হল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া ও স্পেনে পাট শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। এসকল বাজারের কাঁচামাল যোগানদাতা নারায়ণগঞ্জ। আবার বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা নারায়ণগঞ্জ এসে পাট শিল্প কারখানা গড়ে তোলেন। নারায়ণগঞ্জ প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নারায়ণগঞ্জের বাজার পৃথিবীর বহু পরিব্রাজককে আকৃষ্ট করে। ১৮৭৯ সালে নারায়ণগঞ্জ ফ্রি পোর্ট হিসেবে ঘোষিত হলে ইউরোপ ও বিভিন্ন দেশের বণিকদের সমাবেশ কেন্দ্র হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। ১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে যখন রেল সার্ভিস চালু হয় তখন নারায়ণগঞ্জ এই বঙ্গে সিংহদ্বারে পরিণত হয়। চীন, আরব, রাশিয়া, জাপান ও ইউরোপের বহু পরিব্রাজক এবং ইবনে বতুতা তৎকালীন সোনারগাঁয়ের উন্নতি ও প্রসারের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি সোনারগাঁকে উল্লেখ করেছেন সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য নগরী হিসেবে। ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ-কাহিনীতে শীতলক্ষ্যায় পাল তোলা বহু বাণিজ্য-জাহাজের কথা উল্লেখ করেছেন। জাভাগামী একপি জাহাজে মালামাল তোলার উল্লেখ করেছেন; যে মালামালের অন্যতম ছিল মসলিন, সাথে ছিল কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র, লবণ, রেশমি বস্ত্র, ডাল ইত্যাদি। গত এক হাজার বছরে সোনারগাঁ তিনশ বছর বাংলার রাজধানী হওয়ায় এতদঞ্চলে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ১৯০৬ সালে পরিব্রাজক এফ.বি. ব্রাউলি বার্ট তার লেখায় নারায়ণগঞ্জকে প্রাচ্যের রহস্য-নগরী বলে উল্লেখ করেছেন। ‘শীতলক্ষ্যার বুকে’ শিরোনামে তিনি লিখেছেন, ‘এই অঞ্চলে ব্যবসায়ের অন্যতম কেন্দ্র হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ। নদীর দু’পাড়ে লাল ইটের গাঁথুনি তার টিনের ছাদ দেওয়া বিরাট বিরাট গুদাম। এগুলোর পেছন দিকে বিরাট চিমনি, ক্রেন দিয়ে মাল উঠানো নামানো হচ্ছে। একটি বাণিজ্যকেন্দ্রের কর্ম কোলাহল ও কর্মব্যস্ততার সবগুলো লক্ষণই এখানে আছে।’ ১৯১০ সালে প্রকাশিত উর্দু গ্রন্থ ‘তাওয়ারিখ-ই-ঢাকা’র অনুবাদ করেছেন ড. আ.ম.ম. শরফুদ্দীন। তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকা শহর থেকে আট মাইল পূর্বে লক্ষ্যা নদীর পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ মহকুমা। বর্তমানে এ মহকুমা একটি শহরে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রাচীনকাল থেকে সব রকমের ব্যবসা ও লবণের কারবার চলত। এটি একটি বন্দর এবং প্রায়ই জাহাজের গমনাগমন হয়। সব রকমের তরকারী, তৈল, ঘি, চিনি, গুড়, সুপারি, নারিকেল, তামাক, পাট, তুলা, মসলা প্রচুর আমদানী ও রপ্তানী হত। নদীতে সবসময় অনেক জাহাজ ইস্টিমার, নৌকা এবং ছোট ছোট জাহাজ থাকত। প্রায়ই আরাকানী, চীন দেশীয় লোকেরা এখান থেকে সুপারি, চিনি, তামাক ইত্যাদি কিনে নিয়ে যায়। রেল ইস্টেশন হওয়ায় বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ আরো সুগম হয়েছে। ইংরেজ, আরমেনীয় ও গ্রীক প্রভৃতি নানা জাতের বণিক এখানে পাটের কারখানা স্থাপন করেছে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যতবার পূর্ববঙ্গের ঢাকা, মযমনসিংহ, কুমিল্লা এসেছেন তাঁর যাত্রা পথটি ছিল শীতলক্ষ্যা নদী। গোয়ালন্দ থেকে ষ্টিমারে শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে নারায়ণগঞ্জ। পরে রেল বা গাড়িতে গন্তব্যে। নজরুল ‘আমি পূরব দেশের পুরনারী’ গানটি শীতলক্ষ্যা নদীর ঘাটে বসে রচনা করেছেন। এ গানটি সম্পর্কে স্মৃতিচারণে নজরুল বলেছেন, গোয়ালন্দ থেকে ষ্টিমারটি এসে শীতলক্ষ্যা পৌঁছে ঘাটে না ভিরে কিছুটা দূরে থামলো। ষ্টিমার থেকে যাত্রীরা ছোট নৌকায় চড়ে ঘাটে গিয়ে নামছে। ষ্টিমার থেকে নৌকায় নামাটা ছিল ঝুকিপূর্ণ। অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন। সে সময় এক নারী লাফ দিয়ে ষ্টিমার থেকে নৌকায় নামলে নজরুল অবাক হয়ে তাকে দেখছিলেন। নৌকায় নেমে নারী নজরুলের দিকে তাকালেন। তার নামা ও ঘুরে তাকানো নজরুলকে বিস্মিত করে। তিনি ভাবেন, পূর্বদেশের নারীদের পক্ষেই এমনি সম্ভব। সে ঘাটে বসে তখনি তিনি এ কবিতাটি লিখেন। ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক মার্গারেট রুমার গডেন তাঁর ‘দ্য রিভার’ ও ‘টু আন্ডার দা ইন্ডিয়ান সান’ আত্মজৈবনীক উপন্যাস দুটি লিখেছিলেন শীতলক্ষ্যা নদী ও নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে। তবে টু আন্ডার দা ইন্ডিয়ান সান উপন্যাসটি তিনি এবং তাঁর দেড় বছরের বড় বোন উইনসাম রুথ কে গডেন যৌথ ভাবে লিখেন। তাঁদের বাবা আর্থার গডেন ব্রহ্মপুত্র স্টিম রিভার নেভিগেশন কোম্পানির নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে নারায়ণগঞ্জ আসেন ১৯১৩ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ১৯১৪ সালে রুমার ও তাঁর বোন রুথ নারায়ণগঞ্জ আসেন। ১৯২০ সাল পর্যন্ত তাঁরা নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলাপাড়ার অভ্যন্তরীণ জল-পরিবহন সংস্থার ভবনে থাকতেন। রুমার গডেন ৭০টির অধিক উপন্যাস, গল্প, কবিতা ও শিশুদের জন্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। রুমারের শৈশব, কৈশোর ও স্মৃতির বিশাল জায়গা জুড়ে রয়েছে শীতলক্ষ্যা নদী ও নারায়ণগঞ্জ। তাঁর প্রায় প্রতিটি লেখায় এর প্রতিফলন ঘটেছে। টু আন্ডার দা ইন্ডিয়ান সান গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন ১৯২০ সালে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে যখন তাঁরা লন্ডনে পৌঁছে প্যাাডিং স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি ভাড়া করেন, রুমার প্রশ্ন করেন আমরা কোথায় যাচ্ছি? মা জানান ‘বাড়ি, আমরা বাড়ি যাচ্ছি।’ শৈশব-কৈশোর হারানো রুমারের হৃদয় নিংড়ানো উচ্চারণ, ‘কিন্তু আমাদের বাড়িতো নারায়ণগঞ্জ।’ টু আন্ডার দা ইন্ডিয়ান সান গ্রন্থের শেষ বাক্যে এভাবেই উচ্চারিত হয়েছে রুমারের হাহাকার ও নারায়ণগঞ্জের প্রতি ভালোবাসা। দ্য রিভার এর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ফরাসি মাস্টার ফিল্মমেকার জ্যঁ রেনোয়া। দ্য রিভারে উঠে এসেছে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের নারায়ণগঞ্জ এবং শীতলক্ষ্যা নদী। উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জের মহরম, ঈদ, পূজা, হোলি, ক্রিস্টমাসের বিবরণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতি আবার উঠে এসেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নিষ্ঠুরতা। এখানকার শীতলক্ষ্যা নদী ও জনপথ হাজারো বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন জাতিকে আকৃষ্ট করে চলেছে। বঙ্গদেশ সম্পর্কে যে কথাটি পশ্চিমাদের মুখ একসময় বিশেষ প্রচারিত ছিল তা হচ্ছে, এখানে প্রবেশের অসংখ্য দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে কিন্তু বেরুবার একটি দ্বারও খোলা নেই। একথাটি নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রে সবিশেষ প্রযোজ্য ছিল। কালের বিবর্তনে আজ এর গৌরব ও ঐতিহ্য বিস্মৃতির অতলে নিমজ্জিত। শীতলক্ষ্যার যৌবনে ভাটা পড়েছে। আজ নানা বর্ণে সুশোভিত সুবেদারের শাহী বজরা উজানে পাল তোলে না। গয়নার ভিড় নেই। তেজারতির পানসি আর শীতলক্ষ্যায় ভিড়ে না। ধীবরের নৌকা শুধু জীবিকা খোঁজে। তবুও লাঙ্গলবন্দে বছরে একবার হাজারো পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে এবং শীতলক্ষ্যার বুক থেকে জলের শব্দের সাথে মাঝে মধ্যে ‘মনমাঝি তোর বৈঠা নেরে, আমি আর বাইতে পারলাম না’র বদলে ভেসে আসে বিষণ্ন ঢেউয়ের বিলাপ। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বৃহৎ অঞ্চলের সভ্যতাগুলো। নীলনদের অববাহিকায় মিশরীয় সভ্যতা, দজলা ও ফোরাতের অববাহিকায় মেসোপটেমীয় সভ্যতা, হুয়াংহো’র তীরে চীন সভ্যতা, সিন্ধু নদীর অববাহিকায় সিন্ধু সভ্যতা। এ সকল সভ্যতাই স্নাত হয়েছে নদীর শীতল সলিলে। মানুষ গড়েছে ভবিষ্যৎ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইমারত। শীতলক্ষ্যার দু’কূলব্যাপী বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে মানুষ গড়েছে বসতি। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায়, আয়োজনে-প্রয়োজনে শীতলক্ষ্যা মিলেমিশে একাকার হয়েছে। এখানে হোসিয়ারী ও পরবর্তীতে নিট গার্মেন্টস শিল্প গড়ে ওঠার মূল কারণ শীতলক্ষ্যার খাড়ি সমৃদ্ধ স্বচ্ছ জল। এর নাব্যতা বিশ্বের কয়েকটি নদীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। অথচ লোভাতুর শেণ্য দৃষ্টির আগ্রাসনে আজ চঞ্চলা উন্মত্তা শীতলক্ষ্যা জরাগ্রস্থ, আড়ষ্ট, সংকুচিত। লক্ষ্যচ্যুত লক্ষ্যার স্রোত ধ্বনিতে আজ অনুরণিত এক অশনি সংকেত। এক করুণ আর্তনাদ। ‘রেলগাড়ির ঘণ্টা বাজে, ইস্টিমারের শিঙা, নদীর জলে রোদের ঝিলিমিলি। দমকা হাওয়ায় ধূলো ওড়ে, ফোলে নৌকার পার, দোলে নৌকো ইস্টিমারের ঢেউয়ে বরফওলার হাঁকের সঙ্গে কুলির কিচির মিচির বাঙাল ভাসায় জাঙ্গাল ছেঁকে ধরে। নারায়ণগঞ্জের ইস্টিমারে দুপুর বেলায় তোমার মুখটি হারিয়ে গেল দূরে...’ কবি বুদ্ধদেব বসু শীতলক্ষ্যার পাড়ে বসে এ কবিতা লিখেছিলেন। বুদ্ধদেব বসুর স্বজন নিমজ্জনের মতো শীতলক্ষ্যা নদীও আজ আমাদের দৃষ্টি থেকে সরে ঠাঁই নিচ্ছে মগ্ন চৈতন্যে। বিত্ত-বেসাতির, তেজারতির জলযানের চিমনির হুঁইশেল আজ আর শোনা যায় না। কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যে বিষাক্ত গোটা লক্ষ্যার জল। বাতাসে ভেসে আসে নদী ও মাঝির সুরের বদলে দুর্গন্ধময় রাসায়নিক মৃত্যুর করুণ সংবাদ। গ্রিক পুরাণের সেই প্যান্ডোরার বাক্স খুলেছেন যেন সভ্যতা ও মানবতার বিপক্ষে কোন অপদেবতা। যা থেকে বেরুচ্ছে আজ মৃত্যু, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, যন্ত্রণা, হত্যা, লাশ, যুদ্ধ, হতাশা ও ক্লান্তি। যার চক্রান্ত থেকে আজ আর আমাদের কারোরই নিস্তার নেই। লক্ষ্যার বুকে আজ কেবলি আগুন জ্বলে; কেবলই হাহাকার। কিন্তু এ থেকে যে আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে, পেতেই হবে।
রফিউর রাব্বি : লেখক, গবেষক, সংস্কৃতি ও সমাজকর্মী
হিন্দু পুরাণে কথিত আছে, মহামুনি জমদগ্নির আদেশে পুত্র পরশুরাম মাতৃহত্যা করে মহাপাপ করেছিলেন। যে কুঠার দ্বারা তিনি মাতা রেণুকাকে বধ করেছিলেন সেই কুঠার তাঁর হাতে আটকে গিয়েছিলো। প্রাণপণ চেষ্টা করেও সে কুঠার তাঁর হাত থেকে ছাড়ানো যায়নি। অবশেষে তিনি গভীর দুঃখ ও অনুশোচনায় নিমজ্জিত হলেন এবং ধ্যান ও তপস্যায় দিন কাটাবার জন্যে পাহাড়-পর্বত বন-জঙ্গল ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি ব্রহ্মপুত্রের মাহাত্ম্যের কথা শুনতে পেয়ে আশায় বুক বেঁধে তার খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। ব্রহ্মপুত্র তখন একটি হৃদরূপে হিমালয় পর্বতে আত্মগোপন করেছিল। পরশুরাম বহু বছর ধরে হিমালয়ের জনহীন দুর্গম পথে নিষ্ফলা ঘুরতে থাকায় তাঁর চোখের সামনে থেকে এক অশুভ কুজ্বটিকা অপসৃত হল। দেখতে পেলেন নিম্নদেশে প্রসারিত এক হ্রদ। তিনি আনন্দে অধীর। দু’হাত তুলে তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন। ‘হে হ্রদরূপী দেবতা, তোমার পবিত্র জলে মরজগতের কোন জীবের পদার্পণ হয়নি। তোমার সকল অলৌকিক শক্তি মিলিত হয়ে আমার সকল পাপ ধৌত করে দিক এবং আমার প্রায়শ্চিত্তের অবসান হোক’- এই বলে তিনি ব্রহ্মপুত্রের জলে ঝাঁপ দিলেন। তিনি এবার দিব্য চক্ষু ফিরে পেলেন- তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর প্রায়শ্চিত্ত শেষ হয়েছে। মহাগুণসম্পন্ন সর্বপাপহরা এই পবিত্র জল মর্ত্যরে মানুষের নাগালে পৌঁছে দেবার মানসে পরশুরাম তাঁর কুঠার লাঙ্গলাবদ্ধ করলেন এবং পর্বতের মধ্য দিয়ে চালিত করলেন। যাতে সেই লাঙ্গলের ফলকে তৈরি পথ ধরে ব্রহ্মপুত্র সমভূমিতে প্রবাহিত হতে পারে। এইভাবে বহুদিন পর নারায়ণগঞ্জের বর্তমান লাঙ্গলবন্দে এসে লাঙ্গলটি আটকে গেল। পরশুরাম বুঝতে পারলেন তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। অতঃপর তিনি এই নদের মাহাত্ম্য প্রচারে ও তীর্থ যাত্রায় বের হলেন। কিন্তু যেখানে ব্রহ্মপুত্র থেমে গেলো, তার কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল যৌবনগর্বিতা চঞ্চলা অনিন্দ্য সুন্দরী নদী শীতলক্ষ্যা। বিশাল শক্তিশালী ব্রহ্মপুত্রের কাছে শীতলক্ষ্যার রূপ-যৌবনের কথা পৌঁছে গেল। ব্রহ্মপুত্র সুন্দরী শীতলক্ষ্যাকে দেখার জন্যে স্রোতের প্রচণ্ড আঘাতে দুকূল ভেঙ্গে ধাবিত হন সুন্দরী শীতলক্ষ্যার দিকে। বিশাল বপু ও প্রবল শক্তিশালী ব্রহ্মপুত্রকে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে শীতলক্ষ্যা তার সমস্ত রূপ লুকিয়ে ফেলে এক বৃদ্ধার রূপ ধারণ করে নিজেকে বুড়িগঙ্গা রূপে উপস্থাপিত করেন। ব্রহ্মপুত্র তার অবস্থা দেখে আশাহত হয়ে পড়ল এবং চিৎকার করে উঠেন- ‘হে বৃদ্ধা নারী, কোথায় সেই উদ্ভিন্ন-যৌবনা সুন্দরী শীতলক্ষ্যা?’ অবগুণ্ঠিতা লক্ষ্যা মৃদুভাবে জবাব দেন, ‘আমিই সেই লক্ষ্যা।’ ব্রহ্মপুত্র দ্রুত ধাবিত হয়ে তার অবগুণ্ঠন ছিঁড়ে ফেলেন। ব্রহ্মপুত্র সুন্দরী লক্ষ্যাকে দেখে মুগ্ধ হন। ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে যায়। পৌরাণিক এ কাহিনী ধরেই মহাগুণসম্পন্ন এ পবিত্র জল দ্বারা সর্বপাপ থেকে মুক্তির জন্যে আজো সহস্র হিন্দু নর-নারী লাঙ্গলবন্দ স্নানে মিলিত হন। যৌবনগর্বিতা চঞ্চলা অনিন্দ্য সুন্দরী নদী শীতলক্ষ্যা বিধৌত নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, জীবন চর্চা ও ধারা সবকিছুতেই এ শীতলক্ষ্যার বলিষ্ঠ প্রভাব। কিছুকাল আগেও শীতলক্ষ্যার উন্মত্ততা কমানোর জন্যে লোকে লবণ চিনি দান করেছেন নদীর জলে। খোয়াজ খিজিরের দোহাই দিয়ে মানত করেছেন ভেলা ভসিয়ে। এইসব ভেলায় দিয়েছেন বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য, পয়সা-কড়ি ও চেরাগ-বাতি। আবার এর বুকেই মানুষ তার তেজারতির নৌকা ভাসিয়েছেন। মসলিন, পাট-পাটজাতদ্রব্য, সুতা ও সুতিবস্ত্র, হোসিয়ারী এবং নারায়ণগঞ্জের যে সকল পণ্য এক সময় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে ব্যাপক সমাদৃত ছিল সে সকলই শীতলক্ষ্যাধৌত। প্রায় তিন হাজার বছর আগে এখানে বাণিজ্যবন্দর গড়ে উঠেছিল এবং তিন হাজার বছর আগে এখানকার মসলিনের খ্যাতি বিশ্বে ছড়িয়ে পরেছিল। রামায়ণে অবতারণ রামচন্দ্রের বিমাতা কৈকেয়ীর পরিচ্ছদের বর্ণনায় বাংলার মসলিনের উল্লেখ পাই। রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁয়ের মসলিন জাপান, আরব ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক বাজার তৈরি করেছিল। বিশ গজ মসলিন কাপড় একটি ম্যাচের বাক্সের পরিমাণ ছোট বাক্সে ধারণ করা যেত। এর বয়ন কৌশল ইউরোপ ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছিল বিস্ময়কর বিষয়। তিন হাজার বছর পূর্বে পিরামিডের মমি মসলিনে আচ্ছাদনের প্রমাণ পাওয়া যায়। রোমান রাজপোশাকে নারায়ণগঞ্জের মসলিনের বিশেষ কদর ছিল। অতি প্রাচীনকাল থেকেই সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে তথা এ বঙ্গদেশে শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্ন আবিষ্কারের ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বেও নারায়ণগঞ্জে জনপদ ছিল। উপমহাদেশে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী শিক্ষায়তনের সর্বপ্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল সোনারগাঁয়ে। শেখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা সোনারগাঁয়ে ত্রয়োদশ শতকের শেষদিকে এ উচ্চতর ইসলামিক শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা করেন। তখন এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণে সমবেত হতেন। পৌষ পার্বণে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে সম্মিলিতভাবেই এখানে হিন্দু-মুসলমান নিরলস সমাজ গড়ে তুলেছে। এখানে আবির্ভাব ঘটেছে বহু সুফি-সাধকের। ইব্রাহিম দানিশমন্দ, শেখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা, শরফুদ্দিন ইয়াহিয়া মানেরী, শেখ আলাউদ্দিন আলাউল হক, হাজী বাবা সালেহ, শাহলঙ্গর, পাঁচপীর, আকবর শাহ্, রূপচান শাহ্, আব্দুর রাজ্জাক শাহ্, সিরাজ শাহ, যোগীতাপস লোকনাথ ব্রহ্মচারী, বেণী মাধব, দিগি¦জয় সাধু, ললিত সাধু, সাধু নাগমহাশয় প্রভৃতি। এঁদের অনেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে বসতী গড়েছেন। ইমাম হুসাইন (আ:) ও বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (র:) এর বংশধর ইব্রাহিম দানিশমন্দ পারস্য থেকে আসেন, শেখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা আসেন এশিয়া মাইনরের বোখারা থেকে, ইয়েমেন থেকে আসেন হাজী বাবা সালেহ। শ্রীচৈতন্যের ভক্তি বিপ্লব আর ইসলামী সুফি প্রভাব এ দুইয়ে মিলে গড়ে এখানে উঠেছে মানস সংগঠন। মহররম, ঈদ, পূজা-পার্বণ, বিভিন্ন ফসলি উৎসবে- সবকিছুতেই এর প্রভাব। এসব উৎসব ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মেলা জমে উঠত, যার রূপটি ছিল সর্বজনীন। ড. দীনেশ চন্দ্র সেন ‘বৃহৎ বঙ্গ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘অতি প্রাচীন খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর প্রায় সমস্ত গহনাই এখনো বঙ্গের পল্লীর মহিলারা পরে থাকেন। মুসলমান মেয়েদের মধ্যে সেই প্রাচীন গহনার প্রচলন খুব বেশি। তাঁহারা প্রাচীন গহনা, বেশভূষা এখনো পর্যন্ত বজায় রাখিয়াছে। প্রাচীন ব্রহ্মাদেবের গলায় যে হার দেখা যায় উহার নাম হাঁশুলী, উহা বঙ্গের মুসলমান পাড়ায়ই সর্বত্র দৃষ্ট হয়। গৌরির কানর চেড়ি ও পূর্ববঙ্গের মুসলমান মেয়েদের কাঁকন এখনো পল্লীতে পাওয়া যায়।’ এখানে সংস্কৃতিকে ধর্মীয় গোঁড়ামীর চেয়ে বৃহৎ মানবিক মূল্যবোধই বেশি প্রভাবিত করেছে। এখনো নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন মেলার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। এ মেলার মধ্যে বারোই রবিউল আউয়ালে কদমরসূলের মেলা, লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ঊনিশে জৈষ্ঠ্যের মেলা, মণ্ডলপাড়ার মহররমের মেলা, দেওভোগ আখড়াসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলা, লাঙ্গলবন্দের স্নান উপলক্ষ্যে মেলা উল্লেখযোগ্য।
বৃটিশরা ভারতবর্ষ দখল করে নিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রোষানলে পড়ে মসলিন শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। মসলিনের পরে নারায়ণগঞ্জে লবণ প্রধান শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠে। মগ ও আরাকানিরা এখানে লবণ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৭৯১ সালে ইংরেজরা ‘বোর্ড অব ট্রেড’ গঠন করে পাটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাজ্যে গবেষণা শুরু করে। ১৮৩২ সালে যুক্তরাজ্যের ডান্ডি বেলফুর ও মেলড্রাম কোম্পানি পাট থেকে সুতা তৈরি করতে সক্ষম হলে শুরু হয় ডান্ডি শহরে পাটশিল্প গড়ে তোলার প্রতিযোগিতা। পরে ঊনিশ শতকের প্রায় মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম ও জাপানে পাট শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। এরও পরে ইতালি, হল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া ও স্পেনে পাট শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। এসকল বাজারের কাঁচামাল যোগানদাতা নারায়ণগঞ্জ। আবার বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা নারায়ণগঞ্জ এসে পাট শিল্প কারখানা গড়ে তোলেন। নারায়ণগঞ্জ প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নারায়ণগঞ্জের বাজার পৃথিবীর বহু পরিব্রাজককে আকৃষ্ট করে। ১৮৭৯ সালে নারায়ণগঞ্জ ফ্রি পোর্ট হিসেবে ঘোষিত হলে ইউরোপ ও বিভিন্ন দেশের বণিকদের সমাবেশ কেন্দ্র হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। ১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে যখন রেল সার্ভিস চালু হয় তখন নারায়ণগঞ্জ এই বঙ্গে সিংহদ্বারে পরিণত হয়। চীন, আরব, রাশিয়া, জাপান ও ইউরোপের বহু পরিব্রাজক এবং ইবনে বতুতা তৎকালীন সোনারগাঁয়ের উন্নতি ও প্রসারের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি সোনারগাঁকে উল্লেখ করেছেন সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য নগরী হিসেবে। ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ-কাহিনীতে শীতলক্ষ্যায় পাল তোলা বহু বাণিজ্য-জাহাজের কথা উল্লেখ করেছেন। জাভাগামী একপি জাহাজে মালামাল তোলার উল্লেখ করেছেন; যে মালামালের অন্যতম ছিল মসলিন, সাথে ছিল কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র, লবণ, রেশমি বস্ত্র, ডাল ইত্যাদি। গত এক হাজার বছরে সোনারগাঁ তিনশ বছর বাংলার রাজধানী হওয়ায় এতদঞ্চলে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ১৯০৬ সালে পরিব্রাজক এফ.বি. ব্রাউলি বার্ট তার লেখায় নারায়ণগঞ্জকে প্রাচ্যের রহস্য-নগরী বলে উল্লেখ করেছেন। ‘শীতলক্ষ্যার বুকে’ শিরোনামে তিনি লিখেছেন, ‘এই অঞ্চলে ব্যবসায়ের অন্যতম কেন্দ্র হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ। নদীর দু’পাড়ে লাল ইটের গাঁথুনি তার টিনের ছাদ দেওয়া বিরাট বিরাট গুদাম। এগুলোর পেছন দিকে বিরাট চিমনি, ক্রেন দিয়ে মাল উঠানো নামানো হচ্ছে। একটি বাণিজ্যকেন্দ্রের কর্ম কোলাহল ও কর্মব্যস্ততার সবগুলো লক্ষণই এখানে আছে।’ ১৯১০ সালে প্রকাশিত উর্দু গ্রন্থ ‘তাওয়ারিখ-ই-ঢাকা’র অনুবাদ করেছেন ড. আ.ম.ম. শরফুদ্দীন। তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকা শহর থেকে আট মাইল পূর্বে লক্ষ্যা নদীর পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ মহকুমা। বর্তমানে এ মহকুমা একটি শহরে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রাচীনকাল থেকে সব রকমের ব্যবসা ও লবণের কারবার চলত। এটি একটি বন্দর এবং প্রায়ই জাহাজের গমনাগমন হয়। সব রকমের তরকারী, তৈল, ঘি, চিনি, গুড়, সুপারি, নারিকেল, তামাক, পাট, তুলা, মসলা প্রচুর আমদানী ও রপ্তানী হত। নদীতে সবসময় অনেক জাহাজ ইস্টিমার, নৌকা এবং ছোট ছোট জাহাজ থাকত। প্রায়ই আরাকানী, চীন দেশীয় লোকেরা এখান থেকে সুপারি, চিনি, তামাক ইত্যাদি কিনে নিয়ে যায়। রেল ইস্টেশন হওয়ায় বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ আরো সুগম হয়েছে। ইংরেজ, আরমেনীয় ও গ্রীক প্রভৃতি নানা জাতের বণিক এখানে পাটের কারখানা স্থাপন করেছে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যতবার পূর্ববঙ্গের ঢাকা, মযমনসিংহ, কুমিল্লা এসেছেন তাঁর যাত্রা পথটি ছিল শীতলক্ষ্যা নদী। গোয়ালন্দ থেকে ষ্টিমারে শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে নারায়ণগঞ্জ। পরে রেল বা গাড়িতে গন্তব্যে। নজরুল ‘আমি পূরব দেশের পুরনারী’ গানটি শীতলক্ষ্যা নদীর ঘাটে বসে রচনা করেছেন। এ গানটি সম্পর্কে স্মৃতিচারণে নজরুল বলেছেন, গোয়ালন্দ থেকে ষ্টিমারটি এসে শীতলক্ষ্যা পৌঁছে ঘাটে না ভিরে কিছুটা দূরে থামলো। ষ্টিমার থেকে যাত্রীরা ছোট নৌকায় চড়ে ঘাটে গিয়ে নামছে। ষ্টিমার থেকে নৌকায় নামাটা ছিল ঝুকিপূর্ণ। অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন। সে সময় এক নারী লাফ দিয়ে ষ্টিমার থেকে নৌকায় নামলে নজরুল অবাক হয়ে তাকে দেখছিলেন। নৌকায় নেমে নারী নজরুলের দিকে তাকালেন। তার নামা ও ঘুরে তাকানো নজরুলকে বিস্মিত করে। তিনি ভাবেন, পূর্বদেশের নারীদের পক্ষেই এমনি সম্ভব। সে ঘাটে বসে তখনি তিনি এ কবিতাটি লিখেন। ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক মার্গারেট রুমার গডেন তাঁর ‘দ্য রিভার’ ও ‘টু আন্ডার দা ইন্ডিয়ান সান’ আত্মজৈবনীক উপন্যাস দুটি লিখেছিলেন শীতলক্ষ্যা নদী ও নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে। তবে টু আন্ডার দা ইন্ডিয়ান সান উপন্যাসটি তিনি এবং তাঁর দেড় বছরের বড় বোন উইনসাম রুথ কে গডেন যৌথ ভাবে লিখেন। তাঁদের বাবা আর্থার গডেন ব্রহ্মপুত্র স্টিম রিভার নেভিগেশন কোম্পানির নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে নারায়ণগঞ্জ আসেন ১৯১৩ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ১৯১৪ সালে রুমার ও তাঁর বোন রুথ নারায়ণগঞ্জ আসেন। ১৯২০ সাল পর্যন্ত তাঁরা নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলাপাড়ার অভ্যন্তরীণ জল-পরিবহন সংস্থার ভবনে থাকতেন। রুমার গডেন ৭০টির অধিক উপন্যাস, গল্প, কবিতা ও শিশুদের জন্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। রুমারের শৈশব, কৈশোর ও স্মৃতির বিশাল জায়গা জুড়ে রয়েছে শীতলক্ষ্যা নদী ও নারায়ণগঞ্জ। তাঁর প্রায় প্রতিটি লেখায় এর প্রতিফলন ঘটেছে। টু আন্ডার দা ইন্ডিয়ান সান গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন ১৯২০ সালে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে যখন তাঁরা লন্ডনে পৌঁছে প্যাাডিং স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি ভাড়া করেন, রুমার প্রশ্ন করেন আমরা কোথায় যাচ্ছি? মা জানান ‘বাড়ি, আমরা বাড়ি যাচ্ছি।’ শৈশব-কৈশোর হারানো রুমারের হৃদয় নিংড়ানো উচ্চারণ, ‘কিন্তু আমাদের বাড়িতো নারায়ণগঞ্জ।’ টু আন্ডার দা ইন্ডিয়ান সান গ্রন্থের শেষ বাক্যে এভাবেই উচ্চারিত হয়েছে রুমারের হাহাকার ও নারায়ণগঞ্জের প্রতি ভালোবাসা। দ্য রিভার এর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ফরাসি মাস্টার ফিল্মমেকার জ্যঁ রেনোয়া। দ্য রিভারে উঠে এসেছে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের নারায়ণগঞ্জ এবং শীতলক্ষ্যা নদী। উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জের মহরম, ঈদ, পূজা, হোলি, ক্রিস্টমাসের বিবরণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতি আবার উঠে এসেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নিষ্ঠুরতা। এখানকার শীতলক্ষ্যা নদী ও জনপথ হাজারো বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন জাতিকে আকৃষ্ট করে চলেছে। বঙ্গদেশ সম্পর্কে যে কথাটি পশ্চিমাদের মুখ একসময় বিশেষ প্রচারিত ছিল তা হচ্ছে, এখানে প্রবেশের অসংখ্য দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে কিন্তু বেরুবার একটি দ্বারও খোলা নেই। একথাটি নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রে সবিশেষ প্রযোজ্য ছিল। কালের বিবর্তনে আজ এর গৌরব ও ঐতিহ্য বিস্মৃতির অতলে নিমজ্জিত। শীতলক্ষ্যার যৌবনে ভাটা পড়েছে। আজ নানা বর্ণে সুশোভিত সুবেদারের শাহী বজরা উজানে পাল তোলে না। গয়নার ভিড় নেই। তেজারতির পানসি আর শীতলক্ষ্যায় ভিড়ে না। ধীবরের নৌকা শুধু জীবিকা খোঁজে। তবুও লাঙ্গলবন্দে বছরে একবার হাজারো পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে এবং শীতলক্ষ্যার বুক থেকে জলের শব্দের সাথে মাঝে মধ্যে ‘মনমাঝি তোর বৈঠা নেরে, আমি আর বাইতে পারলাম না’র বদলে ভেসে আসে বিষণ্ন ঢেউয়ের বিলাপ। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বৃহৎ অঞ্চলের সভ্যতাগুলো। নীলনদের অববাহিকায় মিশরীয় সভ্যতা, দজলা ও ফোরাতের অববাহিকায় মেসোপটেমীয় সভ্যতা, হুয়াংহো’র তীরে চীন সভ্যতা, সিন্ধু নদীর অববাহিকায় সিন্ধু সভ্যতা। এ সকল সভ্যতাই স্নাত হয়েছে নদীর শীতল সলিলে। মানুষ গড়েছে ভবিষ্যৎ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইমারত। শীতলক্ষ্যার দু’কূলব্যাপী বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে মানুষ গড়েছে বসতি। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায়, আয়োজনে-প্রয়োজনে শীতলক্ষ্যা মিলেমিশে একাকার হয়েছে। এখানে হোসিয়ারী ও পরবর্তীতে নিট গার্মেন্টস শিল্প গড়ে ওঠার মূল কারণ শীতলক্ষ্যার খাড়ি সমৃদ্ধ স্বচ্ছ জল। এর নাব্যতা বিশ্বের কয়েকটি নদীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। অথচ লোভাতুর শেণ্য দৃষ্টির আগ্রাসনে আজ চঞ্চলা উন্মত্তা শীতলক্ষ্যা জরাগ্রস্থ, আড়ষ্ট, সংকুচিত। লক্ষ্যচ্যুত লক্ষ্যার স্রোত ধ্বনিতে আজ অনুরণিত এক অশনি সংকেত। এক করুণ আর্তনাদ। ‘রেলগাড়ির ঘণ্টা বাজে, ইস্টিমারের শিঙা, নদীর জলে রোদের ঝিলিমিলি। দমকা হাওয়ায় ধূলো ওড়ে, ফোলে নৌকার পার, দোলে নৌকো ইস্টিমারের ঢেউয়ে বরফওলার হাঁকের সঙ্গে কুলির কিচির মিচির বাঙাল ভাসায় জাঙ্গাল ছেঁকে ধরে। নারায়ণগঞ্জের ইস্টিমারে দুপুর বেলায় তোমার মুখটি হারিয়ে গেল দূরে...’ কবি বুদ্ধদেব বসু শীতলক্ষ্যার পাড়ে বসে এ কবিতা লিখেছিলেন। বুদ্ধদেব বসুর স্বজন নিমজ্জনের মতো শীতলক্ষ্যা নদীও আজ আমাদের দৃষ্টি থেকে সরে ঠাঁই নিচ্ছে মগ্ন চৈতন্যে। বিত্ত-বেসাতির, তেজারতির জলযানের চিমনির হুঁইশেল আজ আর শোনা যায় না। কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যে বিষাক্ত গোটা লক্ষ্যার জল। বাতাসে ভেসে আসে নদী ও মাঝির সুরের বদলে দুর্গন্ধময় রাসায়নিক মৃত্যুর করুণ সংবাদ। গ্রিক পুরাণের সেই প্যান্ডোরার বাক্স খুলেছেন যেন সভ্যতা ও মানবতার বিপক্ষে কোন অপদেবতা। যা থেকে বেরুচ্ছে আজ মৃত্যু, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, যন্ত্রণা, হত্যা, লাশ, যুদ্ধ, হতাশা ও ক্লান্তি। যার চক্রান্ত থেকে আজ আর আমাদের কারোরই নিস্তার নেই। লক্ষ্যার বুকে আজ কেবলি আগুন জ্বলে; কেবলই হাহাকার। কিন্তু এ থেকে যে আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে, পেতেই হবে।
রফিউর রাব্বি : লেখক, গবেষক, সংস্কৃতি ও সমাজকর্মী
লোড হচ্ছে...