জাতীয়
লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল
৭০০ কোটির সম্পদ ৩৫ কোটিতে আত্মসাতের অভিযোগ
NewsView

নিউজভিউ প্রতিবেদক
নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিরোধ এখন নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। মিলের ৫৩ জন শেয়ারহোল্ডারের অভিযোগ, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানোর পরও কোনো নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। এর পরদিনই মিলের কলোনিতে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে নারীসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) হামলার এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে রয়েছেন মিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৩টি শেয়ারহোল্ডার পরিবার। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা ও নির্যাতনের মাধ্যমে মিলের মালিকানা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে নিট কনসার্ন গ্রুপ।
তবে এত গুরুতর অভিযোগের পরও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী ও নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের নেতারা। তাদের প্রশ্ন, নিরাপত্তার আশঙ্কা জানিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কেন সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা দেওয়া হলো না এবং অভিযোগ পাওয়ার পরপরই কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নিরাপত্তা চাওয়ার পরই হামলার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের দাবি, হামলার আশঙ্কার বিষয়টি আগে থেকেই প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল। গত মঙ্গলবার ৫৩ জন শেয়ারহোল্ডার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে নিরাপত্তা চান। কিন্তু ওই রাতেই মিলের কলোনিতে জয়নাল-জাহাঙ্গীর বাহিনীর লাঠিয়ালরা সশস্ত্র হামলা চালায় বলে অভিযোগ তাদের।
হামলায় নারীসহ কয়েকজন আহত হন বলে জানান ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, হামলার সময় বিএনপির শফিকুল ইসলাম, হারুন ও তার ছেলে রিফাত, শাহাবুদ্দিন, হেলা ও তার ছেলে নিজাম, সেকান্দার, আলাউদ্দিন, রিফাতসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
হামলার শিকার সাইফুল নিউজভিউকে বলেন, ‘আমাদের মন্দির-মসজিদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে, পদে পদে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এসবের প্রতিবাদ করায় আমরা হামলার শিকার হয়েছি।’
ভুক্তভোগীরা বলেন, হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে প্রশাসনকে জানানোর পরও তাদের কোনো ধরনের পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় হামলার ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৫১০ শ্রমিক-কর্মচারী থেকে ৫৩ শেয়ারহোল্ডার
লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের মালিকানা ও শেয়ার নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত বহু বছর আগে। নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে মিলে কর্মরত ৫১০ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে শেয়ারহোল্ডার বানিয়ে সরকার মিলটি পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। ২০১২ সাল পর্যন্ত মিলটি বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা করে আয় করে।
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে নিট কনসার্ন গ্রুপের জয়নাল আবেদীন মোল্লা ও তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ভয়ভীতি দেখিয়ে মিলের অধিকাংশ শেয়ারহোল্ডারের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে শেয়ার কিনে নেন। বর্তমানে ৫৩ জন শেয়ারহোল্ডার ছাড়া অন্যদের শেয়ার বিভিন্নভাবে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা নেওয়া হয়নি।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কীভাবে সরকারের অনুমোদন ছাড়া হস্তান্তর হলো এবং এত বিপুল সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কীভাবে একটি বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে চলে গেল।
৭০০ কোটি টাকার সম্পদ ৩৫ কোটিতে?
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওসমান পরিবার ও তৎকালীন অসাধু সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে নিট কনসার্ন গ্রুপ লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের ১৮ দশমিক ৬৫ একর জমি মাত্র ৩৫ কোটি টাকায় আত্মসাৎ করেছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবার ও তাদের সহযোগিতায় একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে একটি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে মিলটি লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে। এতে অন্যতম অভিযুক্ত নিট কনসার্ন গ্রুপ।
তবে ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ ৩৫ কোটি টাকায় আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, জমির বর্তমান বাজারমূল্য এবং কথিত লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ অভিযোগের বিষয়ে নিট কনসার্ন গ্রুপের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
শেয়ার না বিক্রি করায় নিপীড়নের অভিযোগ
শেয়ার বিক্রি না করা ৫৩ জন শেয়ারহোল্ডার পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের পথ বেছে নেন। এরপর থেকেই তাদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতন শুরু হয় বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় মিলের অভ্যন্তরে বসবাসরত তাদের কলোনির বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। তাদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি দীর্ঘদিনের পুরোনো একটি মন্দিরও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওসমান পরিবারকে অর্থ দিয়ে ৫৩ জন নিরীহ শেয়ারহোল্ডারের ওপর নিট কনসার্ন গ্রুপ নির্যাতন চালিয়েছে। ওসমান পরিবার পালিয়ে যাওয়ার পর এখন বিএনপির কতিপয় নেতাকে অর্থ দিয়ে নিজেদের পক্ষে নিয়ে একই ধরনের নিপীড়ন অব্যাহত রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ সংগঠনটির।
এ ছাড়া প্রচার রয়েছে, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর জয়নাল আবেদীন মোল্লা ও তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ওসমান পরিবারের কতিপয় খুনিকে আশ্রয় দিয়ে রক্ষা করেছেন এবং পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা বিএনপি নেতাদের অর্থ দিয়ে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চেয়ারম্যান জেলা প্রশাসক, তবু কার্যকর ভূমিকা কোথায়?
লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৫ সালে হাইকোর্টের একটি আদেশের বলে মিলটির চেয়ারম্যান নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক। ফলে মিলটির সম্পদ, শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা থাকার কথা।
কিন্তু ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মিলটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও একাধিক মামলা চললেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। সর্বশেষ নিরাপত্তা চেয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও হামলা ঠেকানো যায়নি।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—মিলটির চেয়ারম্যান হিসেবে জেলা প্রশাসক কি পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন? যদি অবগত থাকেন, তাহলে নিরাপত্তা চাওয়ার পরও কেন শেয়ারহোল্ডারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলো না? আর যদি না জেনে থাকেন, তাহলে এতদিন ধরে চলা বিরোধ ও একাধিক মামলার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলো না কেন?
নাগরিক আন্দোলনের প্রশ্ন
হামলার পর রোববার নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বির নেতৃত্বে সংগঠনটির নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় ভুক্তভোগীরা তাদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানান।
রফিউর রাব্বি নিউজভিউকে বলেন, ‘গত মঙ্গলবারের হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছি। পাশাপাশি ভূমিদস্যু নিট কনসার্ন গ্রুপের জয়নাল আবেদীন মোল্লা ও তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে দুদকসহ সরকারের যথাযথ সংস্থার তদন্ত দাবি করছি।’
নিট কর্নসানের একাদি নাম্বারে ফোন দিলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
প্রশাসনের বক্তব্য
হামলার বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী নিউজভিউকে বলেন, ‘আমি আগে জানতে পারিনি। বিষয়টি নিয়ে মামলা হয়েছে, পরবর্তী পদক্ষেপ চলমান রয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির নিউজভিউকে বলেন, ‘গতকাল বিষয়টি জেনেছি। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি।’
পর্যালোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিট কনসার্ন গ্রুপ ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও জানা জরুরি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিট কনসার্ন গ্রুপের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিরোধ এখন নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। মিলের ৫৩ জন শেয়ারহোল্ডারের অভিযোগ, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানোর পরও কোনো নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। এর পরদিনই মিলের কলোনিতে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে নারীসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) হামলার এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে রয়েছেন মিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৩টি শেয়ারহোল্ডার পরিবার। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা ও নির্যাতনের মাধ্যমে মিলের মালিকানা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে নিট কনসার্ন গ্রুপ।
তবে এত গুরুতর অভিযোগের পরও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী ও নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের নেতারা। তাদের প্রশ্ন, নিরাপত্তার আশঙ্কা জানিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কেন সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা দেওয়া হলো না এবং অভিযোগ পাওয়ার পরপরই কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নিরাপত্তা চাওয়ার পরই হামলার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের দাবি, হামলার আশঙ্কার বিষয়টি আগে থেকেই প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল। গত মঙ্গলবার ৫৩ জন শেয়ারহোল্ডার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে নিরাপত্তা চান। কিন্তু ওই রাতেই মিলের কলোনিতে জয়নাল-জাহাঙ্গীর বাহিনীর লাঠিয়ালরা সশস্ত্র হামলা চালায় বলে অভিযোগ তাদের।
হামলায় নারীসহ কয়েকজন আহত হন বলে জানান ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, হামলার সময় বিএনপির শফিকুল ইসলাম, হারুন ও তার ছেলে রিফাত, শাহাবুদ্দিন, হেলা ও তার ছেলে নিজাম, সেকান্দার, আলাউদ্দিন, রিফাতসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
হামলার শিকার সাইফুল নিউজভিউকে বলেন, ‘আমাদের মন্দির-মসজিদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে, পদে পদে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এসবের প্রতিবাদ করায় আমরা হামলার শিকার হয়েছি।’
ভুক্তভোগীরা বলেন, হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে প্রশাসনকে জানানোর পরও তাদের কোনো ধরনের পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় হামলার ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৫১০ শ্রমিক-কর্মচারী থেকে ৫৩ শেয়ারহোল্ডার
লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের মালিকানা ও শেয়ার নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত বহু বছর আগে। নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে মিলে কর্মরত ৫১০ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে শেয়ারহোল্ডার বানিয়ে সরকার মিলটি পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। ২০১২ সাল পর্যন্ত মিলটি বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা করে আয় করে।
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে নিট কনসার্ন গ্রুপের জয়নাল আবেদীন মোল্লা ও তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ভয়ভীতি দেখিয়ে মিলের অধিকাংশ শেয়ারহোল্ডারের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে শেয়ার কিনে নেন। বর্তমানে ৫৩ জন শেয়ারহোল্ডার ছাড়া অন্যদের শেয়ার বিভিন্নভাবে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা নেওয়া হয়নি।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কীভাবে সরকারের অনুমোদন ছাড়া হস্তান্তর হলো এবং এত বিপুল সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কীভাবে একটি বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে চলে গেল।
৭০০ কোটি টাকার সম্পদ ৩৫ কোটিতে?
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওসমান পরিবার ও তৎকালীন অসাধু সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে নিট কনসার্ন গ্রুপ লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের ১৮ দশমিক ৬৫ একর জমি মাত্র ৩৫ কোটি টাকায় আত্মসাৎ করেছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবার ও তাদের সহযোগিতায় একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে একটি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে মিলটি লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে। এতে অন্যতম অভিযুক্ত নিট কনসার্ন গ্রুপ।
তবে ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ ৩৫ কোটি টাকায় আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, জমির বর্তমান বাজারমূল্য এবং কথিত লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ অভিযোগের বিষয়ে নিট কনসার্ন গ্রুপের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
শেয়ার না বিক্রি করায় নিপীড়নের অভিযোগ
শেয়ার বিক্রি না করা ৫৩ জন শেয়ারহোল্ডার পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের পথ বেছে নেন। এরপর থেকেই তাদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতন শুরু হয় বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় মিলের অভ্যন্তরে বসবাসরত তাদের কলোনির বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। তাদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি দীর্ঘদিনের পুরোনো একটি মন্দিরও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওসমান পরিবারকে অর্থ দিয়ে ৫৩ জন নিরীহ শেয়ারহোল্ডারের ওপর নিট কনসার্ন গ্রুপ নির্যাতন চালিয়েছে। ওসমান পরিবার পালিয়ে যাওয়ার পর এখন বিএনপির কতিপয় নেতাকে অর্থ দিয়ে নিজেদের পক্ষে নিয়ে একই ধরনের নিপীড়ন অব্যাহত রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ সংগঠনটির।
এ ছাড়া প্রচার রয়েছে, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর জয়নাল আবেদীন মোল্লা ও তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ওসমান পরিবারের কতিপয় খুনিকে আশ্রয় দিয়ে রক্ষা করেছেন এবং পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা বিএনপি নেতাদের অর্থ দিয়ে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চেয়ারম্যান জেলা প্রশাসক, তবু কার্যকর ভূমিকা কোথায়?
লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৫ সালে হাইকোর্টের একটি আদেশের বলে মিলটির চেয়ারম্যান নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক। ফলে মিলটির সম্পদ, শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা থাকার কথা।
কিন্তু ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মিলটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও একাধিক মামলা চললেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। সর্বশেষ নিরাপত্তা চেয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও হামলা ঠেকানো যায়নি।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—মিলটির চেয়ারম্যান হিসেবে জেলা প্রশাসক কি পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন? যদি অবগত থাকেন, তাহলে নিরাপত্তা চাওয়ার পরও কেন শেয়ারহোল্ডারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলো না? আর যদি না জেনে থাকেন, তাহলে এতদিন ধরে চলা বিরোধ ও একাধিক মামলার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলো না কেন?
নাগরিক আন্দোলনের প্রশ্ন
হামলার পর রোববার নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বির নেতৃত্বে সংগঠনটির নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় ভুক্তভোগীরা তাদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানান।
রফিউর রাব্বি নিউজভিউকে বলেন, ‘গত মঙ্গলবারের হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছি। পাশাপাশি ভূমিদস্যু নিট কনসার্ন গ্রুপের জয়নাল আবেদীন মোল্লা ও তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে দুদকসহ সরকারের যথাযথ সংস্থার তদন্ত দাবি করছি।’
নিট কর্নসানের একাদি নাম্বারে ফোন দিলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
প্রশাসনের বক্তব্য
হামলার বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী নিউজভিউকে বলেন, ‘আমি আগে জানতে পারিনি। বিষয়টি নিয়ে মামলা হয়েছে, পরবর্তী পদক্ষেপ চলমান রয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির নিউজভিউকে বলেন, ‘গতকাল বিষয়টি জেনেছি। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি।’
পর্যালোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিট কনসার্ন গ্রুপ ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও জানা জরুরি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিট কনসার্ন গ্রুপের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
লোড হচ্ছে...