মতামত
নারী ছাড়া সভ্যতার কোনো ইতিহাস নেই
NewsView

লেখক: ঘুঘঘুম মজুরদার
আমাদের সমাজে নাড়ি ছেঁড়ার পর থেকেই নারীর শেকলপরা শুরু। এরপর একে একে সামাজি পারিবারিক সব অক্টোপাস তাকে পুরুষতান্ত্রিক সার্কাসে পরিণত করে। এটি বর্তমান বাস্তবতা। অথচ নারী ছাড়া সভ্যতার কোনো ইতিহাস নেই। কিন্তু অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে নারী বঞ্চনার বাস্তবতায় আটকে আছে। অগ্রগতির অহংকারের আড়ালে লুকিয়ে আছে পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্য।
মানবসভ্যতা নিজেকে উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক বলে দাবি করে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিকতার নানা সূচক তার ভিত্তি। কিন্তু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সভ্যতা কি সত্যিই তার অর্ধেক মানুষকে সমান মর্যাদা দিতে পেরেছে? উত্তরের সত্য জবাব—না। সব অগ্রগতি এখানে এসে দগদগে ঘা হয়ে যায়।
নারী অধিকার নিয়ে সমাজে অনেক কথা হয়, নানা দিবস পালিত হয়, স্লোগান ওঠে। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ালে দেখা যায়, ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো এখনো মূলত পুরুষের নিয়ন্ত্রণেই রয়ে গেছে। পরিবারে সিদ্ধান্ত, কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ—সব জায়গাতেই নারীকে এখনো সংগ্রাম করেই জায়গা করে নিতে হয়।
লিঙ্গবৈষম্য কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার নাম নয়; এটি একটি সুসংগঠিত সামাজিক কাঠামো। এই কাঠামো নারীর স্বাধীনতাকে সীমিত করে, তার শ্রমকে অদৃশ্য করে এবং তার কণ্ঠস্বরকে অনেক সময় গুরুত্বহীন করে তোলে। সমাজ নারীকে প্রশংসা করতে জানে—মা হিসেবে, ত্যাগী স্ত্রী হিসেবে, সংসারের নিরলস কর্মী হিসেবে। কিন্তু একই সমাজ নারীর স্বাধীনতা বা ক্ষমতাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি দেখা যায় শ্রমের ক্ষেত্রে। বিশ্বজুড়ে নারীরা বিপুল পরিমাণ কাজ করেন—কৃষিতে, শিল্পে, সেবাখাতে, আবার ঘরের ভেতরেও। কিন্তু এই শ্রমের বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। ঘরের কাজকে কাজ বলা হয় না, যত্নকে শ্রম বলা হয় না, দায়িত্বকে অর্থনৈতিক অবদান হিসেবে ধরা হয় না। ফলে যে সমাজ নারীর শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই সমাজই তার মূল্য দিতে কুণ্ঠাবোধ করে।
আধুনিক বিশ্ব অবশ্য নারীর অগ্রগতির গল্পও দেখেছে। নারী রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বাংলাদেশেও নারীর অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান—শিক্ষা বিস্তার, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা শক্ত উপস্থিতি তৈরি করেছেন।
কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেই একটি নির্মম সত্য রয়ে গেছে। একই সমাজে একদিকে নারী নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়, অন্যদিকে নারী এখনও সহিংসতা, বৈষম্য ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের শিকার হন। অর্থাৎ নারীকে আমরা সম্মান করি—তবে শর্তসাপেক্ষে; তাকে এগোতে দিই—তবে নির্ধারিত সীমার ভেতরে।
এই মনোভাব কেবল নারীর প্রতি অন্যায় নয়; এটি সমাজ নিজের সম্ভাবনাকেও সীমাবদ্ধ করে। যে সমাজ তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীর শক্তি ও প্রতিভাকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে না, সেই সমাজ কখনোই পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে না।
নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি ন্যায্যতার দাবি, গণতন্ত্রের শর্ত এবং মানবিক সভ্যতার অপরিহার্য ভিত্তি। এই সত্য মেনে নিতে আমাদের যত দেরি, তত বেদনা। নারীকে সমান অধিকার না দিয়ে কোনো সমাজই প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত একটি সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। নারীকে সীমাবদ্ধ রেখে কোনো সভ্যতা সভ্য হতে পারে না। অর্ধেক মানুষকে অধিকার বঞ্চিত করে যে গল্প লেখা হচ্ছে, এটি অসম ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। প্রশ্নটি তাই স্পষ্ট— এ সমাজ-রাষ্ট্র কি সত্যিই সমতার সমাজ গড়তে চায়, নাকি কেবল সমতার ভাষণ শুনিয়ে বৈষম্যের বাস্তবতা উসকে দিতে চায়?
আমাদের সমাজে নাড়ি ছেঁড়ার পর থেকেই নারীর শেকলপরা শুরু। এরপর একে একে সামাজি পারিবারিক সব অক্টোপাস তাকে পুরুষতান্ত্রিক সার্কাসে পরিণত করে। এটি বর্তমান বাস্তবতা। অথচ নারী ছাড়া সভ্যতার কোনো ইতিহাস নেই। কিন্তু অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে নারী বঞ্চনার বাস্তবতায় আটকে আছে। অগ্রগতির অহংকারের আড়ালে লুকিয়ে আছে পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্য।
মানবসভ্যতা নিজেকে উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক বলে দাবি করে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিকতার নানা সূচক তার ভিত্তি। কিন্তু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সভ্যতা কি সত্যিই তার অর্ধেক মানুষকে সমান মর্যাদা দিতে পেরেছে? উত্তরের সত্য জবাব—না। সব অগ্রগতি এখানে এসে দগদগে ঘা হয়ে যায়।
নারী অধিকার নিয়ে সমাজে অনেক কথা হয়, নানা দিবস পালিত হয়, স্লোগান ওঠে। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ালে দেখা যায়, ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো এখনো মূলত পুরুষের নিয়ন্ত্রণেই রয়ে গেছে। পরিবারে সিদ্ধান্ত, কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ—সব জায়গাতেই নারীকে এখনো সংগ্রাম করেই জায়গা করে নিতে হয়।
লিঙ্গবৈষম্য কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার নাম নয়; এটি একটি সুসংগঠিত সামাজিক কাঠামো। এই কাঠামো নারীর স্বাধীনতাকে সীমিত করে, তার শ্রমকে অদৃশ্য করে এবং তার কণ্ঠস্বরকে অনেক সময় গুরুত্বহীন করে তোলে। সমাজ নারীকে প্রশংসা করতে জানে—মা হিসেবে, ত্যাগী স্ত্রী হিসেবে, সংসারের নিরলস কর্মী হিসেবে। কিন্তু একই সমাজ নারীর স্বাধীনতা বা ক্ষমতাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি দেখা যায় শ্রমের ক্ষেত্রে। বিশ্বজুড়ে নারীরা বিপুল পরিমাণ কাজ করেন—কৃষিতে, শিল্পে, সেবাখাতে, আবার ঘরের ভেতরেও। কিন্তু এই শ্রমের বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। ঘরের কাজকে কাজ বলা হয় না, যত্নকে শ্রম বলা হয় না, দায়িত্বকে অর্থনৈতিক অবদান হিসেবে ধরা হয় না। ফলে যে সমাজ নারীর শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই সমাজই তার মূল্য দিতে কুণ্ঠাবোধ করে।
আধুনিক বিশ্ব অবশ্য নারীর অগ্রগতির গল্পও দেখেছে। নারী রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বাংলাদেশেও নারীর অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান—শিক্ষা বিস্তার, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা শক্ত উপস্থিতি তৈরি করেছেন।
কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেই একটি নির্মম সত্য রয়ে গেছে। একই সমাজে একদিকে নারী নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়, অন্যদিকে নারী এখনও সহিংসতা, বৈষম্য ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের শিকার হন। অর্থাৎ নারীকে আমরা সম্মান করি—তবে শর্তসাপেক্ষে; তাকে এগোতে দিই—তবে নির্ধারিত সীমার ভেতরে।
এই মনোভাব কেবল নারীর প্রতি অন্যায় নয়; এটি সমাজ নিজের সম্ভাবনাকেও সীমাবদ্ধ করে। যে সমাজ তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীর শক্তি ও প্রতিভাকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে না, সেই সমাজ কখনোই পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে না।
নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি ন্যায্যতার দাবি, গণতন্ত্রের শর্ত এবং মানবিক সভ্যতার অপরিহার্য ভিত্তি। এই সত্য মেনে নিতে আমাদের যত দেরি, তত বেদনা। নারীকে সমান অধিকার না দিয়ে কোনো সমাজই প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত একটি সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। নারীকে সীমাবদ্ধ রেখে কোনো সভ্যতা সভ্য হতে পারে না। অর্ধেক মানুষকে অধিকার বঞ্চিত করে যে গল্প লেখা হচ্ছে, এটি অসম ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। প্রশ্নটি তাই স্পষ্ট— এ সমাজ-রাষ্ট্র কি সত্যিই সমতার সমাজ গড়তে চায়, নাকি কেবল সমতার ভাষণ শুনিয়ে বৈষম্যের বাস্তবতা উসকে দিতে চায়?
লোড হচ্ছে...