জাতীয়
ক্ষমতার বিকার ও এনসিপির বিচ্যুতি
NewsView

রহমান সিদ্দিক
একটি রাজনৈতিক দলের মূল লক্ষ্য কি শুধুই ক্ষমতায় যাওয়া? ক্ষমতা একটি উপলক্ষ মাত্র। একটি রাজনৈতিক দল মূলত একটি সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ। ক্ষমতায় গেলে তারা সরকারি দল। তার বাইরে নাগরিক সমাজ। একটি দেশের নাগরিক সমাজ যত বেশি শক্তিশালী, সেই দেশের সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও তত উন্নত। পাশ্চাত্য দেশের সিভিল সোসাইটি আমাদের দেশে এসে রূপ নিয়েছে ‘সুশীল সমাজ’। সমস্যাটা বেঁধেছে এই শব্দবন্ধনে। এর মধ্য দিয়ে সিভিল সোসাইটি তার আসল চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোও যে একেকটি সিভিল সোসাইটি, বাংলাদেশে এইটা এখন আর কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।
কাউকে আকাশের তারা গুনতে দিলে তিনি হয়তো রাজি হবেন, কিন্তু বাংলাদেশে কতটি রাজনৈতিক দল আছে, সেটা গুনতে তিনি সাহস করবেন না। বাংলাদেশে এত এত রাজনৈতিক দলের বহরে দেশে গণতন্ত্রের নহর বয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেটি হয়নি। কেন হলো না, সেই প্রশ্ন সামনে আনা জরুরি। মার্কিন দেশের একটি উদাহরণ দিই।
১৭৮৭-১৭৮৮ সালে আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন, জেমস ম্যাডিসন ও জন জে— এই তিনজন মিলে ৮৫টি প্রবন্ধের একটি সিরিজ প্রকাশ করেন। যেটি ‘ফেডারেলিস্ট পেপারস’ নামে পরিচিত। নতুন সংবিধান কেন জরুরি এবং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেন ভালো হবে তা ব্যাখ্যা করার জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধগুলো লিখেছিলেন তারা। তাদের একজন জেমস ম্যাডিসন। তিনি দেশটিতে বহু সংখ্যক রাজনৈতিক দল থাকা নিয়েও যুক্তি দিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘একটি বড় প্রজাতন্ত্রে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী দল থাকা যে কোনো একটি দলের প্রভাবশালী হয়ে ওঠা ঠেকাবে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্যকর।’
ম্যাডিসনের এমন বক্তব্য ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট ভূখণ্ড বাংলাদেশের জন্য বোধকরি মানানসই নয়। এই দেশে অনেক দল আছে। অতীতে দেখেছি, ছোট ছোট অনেক দল একটি বা দুইটি বড় দলকে আরও শক্তিশালী, আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতে রসদ জুগিয়েছে। সেখানে দলগুলোর আদর্শ বলতে কিছুই নেই। এই কারণে গণতন্ত্রের নহর বয়ে যাওয়ার পরিবর্তে দেশে দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা জেঁকে বসেছিল। এর মূল কারণ কী। কারণটা হলো সবাই ক্ষমতার ভাগিদার হতে চায়। ছোট দলগুলো ক্ষমতার কিছু ‘উচ্ছৃষ্ট’ ভোগের জন্য বড় দলগুলোতে ভিড়ে। সত্যিকার অর্থে জনআকাঙ্ক্ষার কোনো প্রতিফলই দলগুলোর মধ্যে নেই।
আবারও মার্কিন দেশ। দুটি বড় দল যুক্তরাষ্ট্রে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এলেও তারা আসলে একটিই রাজনৈতিক দল। যেটির নাম আগ্রাসী পুঁজিবাদ। এই আগ্রাসী পুঁজিবাদেরই দুই শাখা রিপাবলিক ও ডেমক্রেট। ব্যতিক্রমও আছে। ছোট, কিন্তু একটি ভালো রাজনৈতিক দলের ভালো উদাহরণ দেশটির গ্রিন পার্টি। দল গঠনের পর থেকে তারা তাদের লক্ষ্য, আদর্শ, অঙ্গীকার থেকে একচুল নড়েনি। গ্রিনরা পরিবেশবাদ, অহিংসা, সামাজিক ন্যায়বিচার, অভিবাসী এবং বর্ণবাদ নিয়ে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি সাজিয়েছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এই নীতি-আদর্শ তারা ধরে রেখেছে। কর্পোরেট দাতাদের সমর্থন ছাড়া আক্ষরিক অর্থেই দেশটির গণতন্ত্রকে, নাগরিক অধিকারকে এগিয়ে নিতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মার্কিন নির্বাচনে বিদ্যমান যে বাস্তবতা, তাতে তাদের জয়লাভের আশা একেবারেই অসম্ভব। তারপরেও গ্রিন পার্টি তাদের লক্ষ্যে অটুট রয়েছে। ২০০০ সালে ডেমক্রেটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আল গোরের পরাজয়ের কারণ হয়েছিলেন গ্রিন পার্টির প্রার্থী রালফ নাদের। একইভাবে ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের পরাজয়ের কারণ হন গ্রিন পার্টির আরেক প্রার্থী জিল স্টেইন। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও জিল স্টেইনকে ডেমক্রেট কমলা হ্যারিসকে সমর্থদানের আহ্বান জানানো হয়েছিল। জিল রাজি হননি। এবারও ডোনাল্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পেছনে অন্য অনেক কারণের মধ্যে ফিলিস্তিন আগ্রাসনবিরোধী অনেক ভোটার জিল স্টেইনকে সমর্থন ও ভোট দেওয়া।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের বিদ্যমান দলগুলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের যে অঙ্গীকার-- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার, এর কোনোটিই রক্ষা করতে পারেনি। চুয়ান্ন বছরেও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। সেটা যে হয়নি, গ্রিন পার্টির মতো আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল না থাকার কারণে। যারা ক্ষমতার ভাগিদার হতে নয়, সত্যিকার অর্থেই জনআকাঙ্ক্ষার রাজনীতি করবে। ছোট, কিন্তু আদর্শে অবিচল এমন রাজনৈতিক দল না থাকাতেই মাঝখানে কয়েকটি বছর বাদ দিলে সামরিক স্বৈর শাসন ও গণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ দেশের জনআকাঙ্ক্ষাকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। বিগত পনেরটি বছর এক নেতার ‘আমিই রাষ্ট্র’ হয়ে ওঠার বাসনা দেশটাকে নিয়ে গেছে সেই সামন্ত যুগে। অবশেষে গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিপুল সংখ্যক মানুষের রক্ত ঝরিয়ে সেই ব্যবস্থার আপাত উচ্ছেদ করা গেছে, কিন্তু শেকড়টা রয়ে গেছে।
ফ্যাসিবাদের এই শেকড় উৎপাটনে গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বে গঠন হলো নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একটি নতুন বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি দলটির আত্মপ্রকাশ করল। অথচ, দল গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত একটি আদর্শ রাজনৈতিক দলের কোনো চরিত্রই ধারণ করতে পারল না এনসিপি। শুরুতে যা বলেছিলাম, একটি রাজনৈতিক দলকে প্রথমকে হয়ে উঠতে হয় সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ। এনসিপির প্রথম বিচ্যুতি ঘটে এই জায়গাতেই। শুরু থেকেই দলটির শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা এমন সব বক্তব্য দিয়ে আসছেন বা আচরণ করছেন, তাতে তাঁদের কোনোভাবেই একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি বলা যায় না। এসব বক্তব্য বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের নেতারা অহরহ দিয়ে দেশের মানুষকে বিরক্তের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে এনসিপি নেতাদেরও পুরোনো ধারার এমন বক্তব্য ও রাজনৈতিক চর্চা জাতির সঙ্গে তামাশা ছাড়া কিছুই নয়।
অন্য অনেক নেতার বক্তব্য শিষ্টাচারের সীমা ছাড়িয়ে গেলেও সবচেয়ে অরাজনৈতিক বক্তব্যটি দিয়েছেন খোদ দলটির প্রধান কান্ডারি নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, আগামী দশ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় যেতে না পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। জনগণের সঙ্গে কী নির্মম পরিহাস। শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই তারা এতগুলো শহীদের পবিত্র রক্তের মূল্য চোকাতে রাজনীতিতে এসেছেন; সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য তাদের আর কোনো কাজ নেই?
এনসিপি তাদের খসড়া গঠনতন্ত্রে দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। সব ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ এবং রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগের কথাও রয়েছে। দলটি দশ মাস অতিক্রম করতে চলেছে, এই সময়ের মধ্যে দেশে ভিন্নমতের ওপর আক্রমণ, মাজার ভাঙচুর, বাউল শিল্পীদের ওপর হামলা, নারীদের হেনস্তাসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। ব্যক্তিগতভাবে এ নিয়ে কেউ কেউ প্রতিবাদ করলেও দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কেনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি; ভিন্নমত ও গোষ্ঠীর এসব মানুষের পক্ষ নিয়ে রাজপথেও তাদের অবস্থান চোখে পড়েনি। এই নীরবতার নাম যদি হয় নয়া বন্দোবস্ত হয়, তাহলে পুরোনো বন্দোবস্তের দোষটা কোথায়?
এনসিপি জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করেছে। এই নিয়ে খুব শোরগোল। অনেকের প্রশ্ন— এনসিপি একটি মধ্যপন্থি দল, জামায়াত দক্ষিণপন্থি, তারা কিভাবে জামায়াতের সঙ্গে জোট করতে পারল? উত্তর খুব সোজা। মধ্যপন্থার এই এক সুবিধা। তারা ডানেও যেতে পারে, বামেও হেলতে পারে। এনসিপি তা-ই করেছে।
কাউকে আকাশের তারা গুনতে দিলে তিনি হয়তো রাজি হবেন, কিন্তু বাংলাদেশে কতটি রাজনৈতিক দল আছে, সেটা গুনতে তিনি সাহস করবেন না। বাংলাদেশে এত এত রাজনৈতিক দলের বহরে দেশে গণতন্ত্রের নহর বয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেটি হয়নি। কেন হলো না, সেই প্রশ্ন সামনে আনা জরুরি। মার্কিন দেশের একটি উদাহরণ দিই।
১৭৮৭-১৭৮৮ সালে আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন, জেমস ম্যাডিসন ও জন জে— এই তিনজন মিলে ৮৫টি প্রবন্ধের একটি সিরিজ প্রকাশ করেন। যেটি ‘ফেডারেলিস্ট পেপারস’ নামে পরিচিত। নতুন সংবিধান কেন জরুরি এবং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেন ভালো হবে তা ব্যাখ্যা করার জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধগুলো লিখেছিলেন তারা। তাদের একজন জেমস ম্যাডিসন। তিনি দেশটিতে বহু সংখ্যক রাজনৈতিক দল থাকা নিয়েও যুক্তি দিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘একটি বড় প্রজাতন্ত্রে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী দল থাকা যে কোনো একটি দলের প্রভাবশালী হয়ে ওঠা ঠেকাবে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্যকর।’
ম্যাডিসনের এমন বক্তব্য ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট ভূখণ্ড বাংলাদেশের জন্য বোধকরি মানানসই নয়। এই দেশে অনেক দল আছে। অতীতে দেখেছি, ছোট ছোট অনেক দল একটি বা দুইটি বড় দলকে আরও শক্তিশালী, আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতে রসদ জুগিয়েছে। সেখানে দলগুলোর আদর্শ বলতে কিছুই নেই। এই কারণে গণতন্ত্রের নহর বয়ে যাওয়ার পরিবর্তে দেশে দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা জেঁকে বসেছিল। এর মূল কারণ কী। কারণটা হলো সবাই ক্ষমতার ভাগিদার হতে চায়। ছোট দলগুলো ক্ষমতার কিছু ‘উচ্ছৃষ্ট’ ভোগের জন্য বড় দলগুলোতে ভিড়ে। সত্যিকার অর্থে জনআকাঙ্ক্ষার কোনো প্রতিফলই দলগুলোর মধ্যে নেই।
আবারও মার্কিন দেশ। দুটি বড় দল যুক্তরাষ্ট্রে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এলেও তারা আসলে একটিই রাজনৈতিক দল। যেটির নাম আগ্রাসী পুঁজিবাদ। এই আগ্রাসী পুঁজিবাদেরই দুই শাখা রিপাবলিক ও ডেমক্রেট। ব্যতিক্রমও আছে। ছোট, কিন্তু একটি ভালো রাজনৈতিক দলের ভালো উদাহরণ দেশটির গ্রিন পার্টি। দল গঠনের পর থেকে তারা তাদের লক্ষ্য, আদর্শ, অঙ্গীকার থেকে একচুল নড়েনি। গ্রিনরা পরিবেশবাদ, অহিংসা, সামাজিক ন্যায়বিচার, অভিবাসী এবং বর্ণবাদ নিয়ে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি সাজিয়েছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এই নীতি-আদর্শ তারা ধরে রেখেছে। কর্পোরেট দাতাদের সমর্থন ছাড়া আক্ষরিক অর্থেই দেশটির গণতন্ত্রকে, নাগরিক অধিকারকে এগিয়ে নিতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মার্কিন নির্বাচনে বিদ্যমান যে বাস্তবতা, তাতে তাদের জয়লাভের আশা একেবারেই অসম্ভব। তারপরেও গ্রিন পার্টি তাদের লক্ষ্যে অটুট রয়েছে। ২০০০ সালে ডেমক্রেটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আল গোরের পরাজয়ের কারণ হয়েছিলেন গ্রিন পার্টির প্রার্থী রালফ নাদের। একইভাবে ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের পরাজয়ের কারণ হন গ্রিন পার্টির আরেক প্রার্থী জিল স্টেইন। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও জিল স্টেইনকে ডেমক্রেট কমলা হ্যারিসকে সমর্থদানের আহ্বান জানানো হয়েছিল। জিল রাজি হননি। এবারও ডোনাল্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পেছনে অন্য অনেক কারণের মধ্যে ফিলিস্তিন আগ্রাসনবিরোধী অনেক ভোটার জিল স্টেইনকে সমর্থন ও ভোট দেওয়া।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের বিদ্যমান দলগুলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের যে অঙ্গীকার-- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার, এর কোনোটিই রক্ষা করতে পারেনি। চুয়ান্ন বছরেও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। সেটা যে হয়নি, গ্রিন পার্টির মতো আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল না থাকার কারণে। যারা ক্ষমতার ভাগিদার হতে নয়, সত্যিকার অর্থেই জনআকাঙ্ক্ষার রাজনীতি করবে। ছোট, কিন্তু আদর্শে অবিচল এমন রাজনৈতিক দল না থাকাতেই মাঝখানে কয়েকটি বছর বাদ দিলে সামরিক স্বৈর শাসন ও গণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ দেশের জনআকাঙ্ক্ষাকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। বিগত পনেরটি বছর এক নেতার ‘আমিই রাষ্ট্র’ হয়ে ওঠার বাসনা দেশটাকে নিয়ে গেছে সেই সামন্ত যুগে। অবশেষে গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিপুল সংখ্যক মানুষের রক্ত ঝরিয়ে সেই ব্যবস্থার আপাত উচ্ছেদ করা গেছে, কিন্তু শেকড়টা রয়ে গেছে।
ফ্যাসিবাদের এই শেকড় উৎপাটনে গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বে গঠন হলো নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একটি নতুন বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি দলটির আত্মপ্রকাশ করল। অথচ, দল গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত একটি আদর্শ রাজনৈতিক দলের কোনো চরিত্রই ধারণ করতে পারল না এনসিপি। শুরুতে যা বলেছিলাম, একটি রাজনৈতিক দলকে প্রথমকে হয়ে উঠতে হয় সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ। এনসিপির প্রথম বিচ্যুতি ঘটে এই জায়গাতেই। শুরু থেকেই দলটির শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা এমন সব বক্তব্য দিয়ে আসছেন বা আচরণ করছেন, তাতে তাঁদের কোনোভাবেই একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি বলা যায় না। এসব বক্তব্য বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের নেতারা অহরহ দিয়ে দেশের মানুষকে বিরক্তের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে এনসিপি নেতাদেরও পুরোনো ধারার এমন বক্তব্য ও রাজনৈতিক চর্চা জাতির সঙ্গে তামাশা ছাড়া কিছুই নয়।
অন্য অনেক নেতার বক্তব্য শিষ্টাচারের সীমা ছাড়িয়ে গেলেও সবচেয়ে অরাজনৈতিক বক্তব্যটি দিয়েছেন খোদ দলটির প্রধান কান্ডারি নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, আগামী দশ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় যেতে না পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। জনগণের সঙ্গে কী নির্মম পরিহাস। শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই তারা এতগুলো শহীদের পবিত্র রক্তের মূল্য চোকাতে রাজনীতিতে এসেছেন; সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য তাদের আর কোনো কাজ নেই?
এনসিপি তাদের খসড়া গঠনতন্ত্রে দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। সব ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ এবং রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগের কথাও রয়েছে। দলটি দশ মাস অতিক্রম করতে চলেছে, এই সময়ের মধ্যে দেশে ভিন্নমতের ওপর আক্রমণ, মাজার ভাঙচুর, বাউল শিল্পীদের ওপর হামলা, নারীদের হেনস্তাসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। ব্যক্তিগতভাবে এ নিয়ে কেউ কেউ প্রতিবাদ করলেও দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কেনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি; ভিন্নমত ও গোষ্ঠীর এসব মানুষের পক্ষ নিয়ে রাজপথেও তাদের অবস্থান চোখে পড়েনি। এই নীরবতার নাম যদি হয় নয়া বন্দোবস্ত হয়, তাহলে পুরোনো বন্দোবস্তের দোষটা কোথায়?
এনসিপি জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করেছে। এই নিয়ে খুব শোরগোল। অনেকের প্রশ্ন— এনসিপি একটি মধ্যপন্থি দল, জামায়াত দক্ষিণপন্থি, তারা কিভাবে জামায়াতের সঙ্গে জোট করতে পারল? উত্তর খুব সোজা। মধ্যপন্থার এই এক সুবিধা। তারা ডানেও যেতে পারে, বামেও হেলতে পারে। এনসিপি তা-ই করেছে।
লোড হচ্ছে...